ফেরিতে তিতাসের মৃত্যু, নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেন জেলা প্রশাসক

আলোকিত সকাল ডেস্ক

তিতাসের মৃত্যু জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে একজন বালকের পরিবার অপেক্ষার প্রহর গুনেছে, অথচ ভিআইপি আসবে বলে ফেরি ছাড়া হয়নি। এটি মৃত্যু, নাকি অবহেলা জনিত হত্যা?

যে ভিআইপির ফেরি আটকে রাখার অনুরোধ করেছেন এবং যারা তার অনুরোধে সাড়া দিয়েছেন, তারা সকলেই সমান অপরাধী বলে জানান ব্লগার ও সাংবাদিক আরিফ জেবতিক।

তিনি বলেন, ফেরি আটকে রাখা বাংলাদেশে ফ্যাশন হয়ে গেছে। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শিশু বাচ্চাটা যদি না মারা যেত তবে হয়তো দেশবাসী এ ব্যাপারে জানতেই পারতেন না।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গতকাল সোমবার (২৯ জুলাই) ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বলেছেন, যদি ফেরি ছাড়ায় বিলম্বিত হওয়ার জন্য তিতাসের মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে সে যত বড়ই ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও সরকারের উচ্চ পর্যয়ের কর্মকর্তা হোক না কেন তাকে শাস্তি পেতে হবে।

এ ব্যাপারে তিতাসের মামা বিজয় ঘোষ অভিযোগ করে বলেন, ভিআইপি আসার জন্য প্রায় তিন ঘণ্টা ঘাটেই বসেছিল ফেরিটি। আমার বোন এবং ভাগ্নে ফেরির সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অবস্থানরত পুলিশের হাতে-পায়ে ধরেছে, কিন্তু তাদের কারও মন গলেনি। তারা আমার বোন, ভাগ্নেকে বলেছে যদি তারা ফেরি ছাড়ে তাহলে তাদের চাকরি থাকবে না। ভিআইপি যাবে তাই ফেরি ছাড়া সম্ভব না। তখন আমার বোন বলে, যে ভিআইপি আপনাদের ফোন দিয়েছে ( ডিসি, সচিব ও মন্ত্রী, যিনি ফোন করেন) তার নম্বর দেন আমি তার সাথে কথা বলব। আমার ছেলের প্রাণ ভিক্ষা চাইব। কান্নাকাটি করে একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আমার বোন। এরপরেও তাদের মন গেলেনি। এরপর ৯৯৯ ফোন করেছে আমার ভাগ্নি। তারা বলে, আমরা দেখছি। এরপর তাদের আর কোন খোঁজ নেই। রাত ৮টার ফেরি ছাড়ল রাত ১১টায়। ততক্ষণে মৃত্যু হয় আমার ভাগ্নের। তিতাস মারা যাওয়ায় ঢাকার দিকে না গিয়ে শিমুলিয়া ঘাট থেকে বাড়ির দিকে অ্যাম্বুলেন্স ঘুরিয়ে দেয়া হয়। এই মৃত্যুর জন্য ওই ভিআইপি ও বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা দায়ী। আমরা বিচার চাই।

ওই দিন ভিআইপি যাবে বলে ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক সালামকে বার্তা পাঠান জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। তাই ফেরি ছাড়েনি।

এ বিষয়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডল পিরোজপুর থেকে ঢাকা যাচ্ছিলেন। তিনি কাঁঠালবাড়ি ঘাটে যাওয়ার আগে আমার কাছে ফেরিতে যাওয়ার বিষয়টি জানান। পরে আমি ঘাটের ব্যবস্থাপক সালামকে ভিআইপি ফেরিতে ওঠার বিষয়ে বার্তা পাঠাই। কিন্তু ওই ঘাটে অ্যাম্বুলেন্সে একজন গুরুতর আহত রোগী আছে, তা আমি জানতাম না। আমি সালাম সাহেবকে শুধু বলেছি স্যারকে সহযোগিতা করার জন্য। ফেরি আটকে রাখার কথা বলিনি। সালাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করুন। আমি সত্যি বলছি না মিথ্যা বলছি।

এ সময় উপস্থাপক মিথিলা ফরাজানা জেলা প্রশাসকের কাছে প্রশ্ন করেন, তবে তারা কি ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরি আটকে রেখেছিল?

এর উত্তরে জেলা প্রশাসক বলেন, আমি সালাম সাহেবকে যুগ্ম সচিবকে সহযোগিতা করার কথা বলেছি। ফেরি আটকে রাখার কথা বলেনি। সালাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করুন। আমি ফেরি আটকে রাখার বলিনি। যারা ফেরি আটকে রেখেছেন তারাই রোগীর মৃত্যুর জন্য দায়ী। এখানে আমাকে অযথা দোষারোপ করা হচ্ছে। আমার অধিক্ষেত্র এলাকায় থাকলেও তারা কিন্তু আমার কর্মচারী নয়। তবে আমি তাদেরকে কখনও বলিনি ভিআইপিদের জন্য ফেরি আটকে রাখার।

অনুষ্ঠানে মাসুদ কামাল প্রশ্ন করেন, দিনে কতবার ফেরি পারাপারে সহযোগিতা করার কথা বলেন?

উত্তরে জেলা প্রশাসক বলেন, আমরা ভিআইপিদের সহযোগিতা করার কথা বলি, কিন্তু কখনও ফেরি আটকে রাখতে বলিনি। সর্বদা এই নির্দেশনা দেওয়া হয়, অসুস্থ রোগীর গাড়ি ফেরি পারাপারের ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার। এর বাইরে কোন নির্দেশনা দেওয়া হয় না। ভিআইপিদের ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলা হয়।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ১নং ফেরিঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত স্কুলছাত্র তিতাসকে বহনকারী একটি অ্যাম্বুলেন্স। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর রাত ১১টার দিকে ফেরিতে ওঠে অ্যাম্বুলেন্সটি। কিন্তু ততক্ষণে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় ওই স্কুলছাত্র। নিহত তিতাস ঘোষ (১২) নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পৌর এলাকার মৃত তাপস ঘোষের ছেলে। কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিল তিতাস।

সোমবার (২৯ জুলাই) একটি বেসরকারি টেলিভিশন টকশো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এসব কথা বলেন জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম।

আস/এসআইসু

Facebook Comments