ফিরে দেখা, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ১১ আসর

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ক্রিকেটের উৎপত্তি কবে কোথায় কিভাবে হয়েছিল, সেই রহস্য ভেদ করা সম্ভয় হয়নি। ধারণা করা হয়, ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ড, ব্যাট-বলের এই লড়াইয়ের শুরু মধ্যযুগে। তবে সেই আদিম ক্রিকেট আর আধুনিক ক্রিকেটের ব্যবধান যোজন যোজন। যুগে যুগে নানা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তৈরি আজকের ক্রিকেটের কাঠামো। একটা সময় এটি অভিজাতে মহলেই সীমিত ছিল। উনবিংশ শতকের শেষভাগে সমাজ পরিবর্তনের হাওয়ায় সামন্তযুগের অবসানকালে ক্রিকেট আভিজাত্যের দেওয়াল ভেঙে জনতার ভিড়ে মিশে যায়। আজকের বিশ্বে যেসব অঞ্চলে ব্রিটিশ সম্রাজ্যের ঝান্ডা উড়েছিল, সেসব দেশেই ক্রিকেট বিকশিত হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যাণ্ডে শুরু হলেও অষ্টাদশ শতাব্দিতে এটি দেশটির জাতীয় খেলারূপে গণ্য হয় এবং ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ক্রিকেট বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ভাঙাগড়ার ওই মৌসুমে ক্রিকেট ছিল কেবল দ্বিপাক্ষিক লড়াইয়ের প্লাটফর্ম।১৮৭৭ সালে টেস্ট ক্রিকেটের আবির্ভাবের পর থেকে ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হিসেবে ১৯১২ সালে ত্রি-দেশীয় প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রথম প্রচেষ্টা চালানো হয়। ঐ সময়ে টেস্টভুক্ত ৩টি দেশ – ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে টেস্ট ক্রিকেট প্রতিযোগিতাটি প্রতিকূল আবহাওয়া ও দর্শকদের অনাগ্রহের কারণে ভণ্ডুল হয়ে যায়। পরীক্ষামূলকভাবে পরবর্তীতে আর চেষ্টা চালানো হয়নি। তারপর থেকেই আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট অঙ্গনে সংশ্লিষ্ট এ দলগুলো দ্বি-পক্ষীয় সিরিজে পরিণত হয় ও প্রতিযোগিতার বিপক্ষে অথবা দুই দেশের বাইরে লীগের বিরোধিতা করে।

১৯৬০-এর দশকের শুরুতে কাউন্টি ক্রিকেটে ইংরেজ দলগুলো ক্রিকেটের স্বল্প সংস্করণে জড়িয়ে পড়ে যা কেবলমাত্র একদিন সময়ের ছিল। ১৯৬২ সালে ৪-দল নিয়ে গড়া মিডল্যান্ডস নক-আউট কাপ ও ১৯৬৩ সালে জিলেট কাপের প্রচলন শুরু হয়। ক্রমে একদিনের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ১৯৬৯ সালে সানডে লীগ নামে একটি জাতীয় লীগের আয়োজন করা হয়। ১৯৭১ সালে মেলবোর্নে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার টেস্ট খেলাটি বৃষ্টির কারণে চারদিন খেলার অনুপযুক্ত ছিল। নির্ধারিত চূড়ান্ত ও পঞ্চম দিনে প্রথমবারের মতো একদিনের আন্তর্জাতিক খেলা আয়োজন করা হয়। উত্তেজিত দর্শকদের সামলাতে কর্তৃপক্ষ চল্লিশ ওভারের খেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ৮-বলে এক ওভার গণ্য করা হতো।

এ সফলতা ও জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে ঘরোয়াভিত্তিতে একদিনের প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকেন। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৭৫ সালে বিশ্বকাপ প্রথমবারের মতো মাঠে গড়ায়। এরপর একে একে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর জমেছে ১১ বার। এটি হবে দ্বাদশ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর।

চলুন বিশ্বকাপ িক্রিকেটে নানা উত্থান-পতন ও ঘটন-অঘটনে চোখ রাখি।

ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রথম বিশ্বকাপের আসর বসে ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে৷ ক্রিকেট বিশ্বে তখন ছিল ক্যারিবিয়ান যুগ৷ আর তাই প্রথম বিশ্বকাপের শিরোপাটিও যায় ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বাধীন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে৷ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথম ফাইনালে ওঠে অস্ট্রেলিয়া৷ অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডকে সহজেই হারিয়ে আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ৷ তখন ওয়ানডে খেলা হতো ৬০ ওভার করে৷ যাই হোক, ফাইনালে লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে প্রথম ব্যাটিং করতে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ৷ অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েডের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ২৯১ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায় ক্যারিবীয়রা৷ লয়েডের ১০২ রানের ইনিংসে ছিল মোট ১২টি বাউন্ডারি এবং দুইটি ওভার বাউন্ডারি৷ জবাবে ব্যাট করতে নেমে ভিভ রিচার্ডসের দুর্দান্ত ফিল্ডিং এর সম্মুখীন হয় অসিরা৷ ২৩৩ রান তুলতেই নয় উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া৷ এর মধ্যে চারটিই ছিল রান আউট৷ শেষ উইকেট জুটিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন দুই অসি পেসার জেফ থমসন এবং ডেনিস লিলি৷ তবে ২৭৩ রানের মাথায় আরও একটি রান আউটের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ৷

বিশ্বক্রিকেটে ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বে প্রায় দুই দশক দাপট দেখানো ক্যারিবীয় দল ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডকে বিধ্বস্থ করে দ্বিতীয় বিশ্বকাপও নিজেদের করে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত ইংলিশ ছিল দুর্ধর্ষ। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে যায় তারা। আর পাকিস্তানকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ৷ ফাইনালে প্রথম ব্যাট করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ৷ ভিভ রিচার্ডসের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে খেলায় আধিপত্য ছিল ক্যারিবীয়দের৷ তবে রিচার্ডস ছাড়াও কোলিস কিং এর ইনিংসটিও ছিল মনে রাখার মতো৷ মাত্র ৬৬ বলে ৮৬ রান করে ইংলিশ বোলিং লাইন ধসিয়ে দেন কিং৷ তাঁর ইনিংসে ছিল ১০টি চার এবং তিনটি ছক্কা৷ নয় উইকেটে ২৮৬ রান তোলে ক্যারিবীয় দল৷জবাবে ইংলিশদের ওপেনিং জুটি টিঁকেছিল ১২৯ রানে৷ কিন্তু তারা এত ধীরে রান তোলে যে পরের ব্যাটসম্যানদের ওপর ভীষণ চাপ পড়ে যায়৷ এই অবস্থাতে ক্যারিবীয় বোলার জোয়েল গার্নার ভয়াবহ বোলিং শুরু করেন৷ মাত্র ৩৮ রানে ইংল্যান্ডের পাঁচ ব্যাটসম্যানকে আউট করেন তিনি৷ ফলে দুই উইকেটের ১৮৩ রান থেকে ইংল্যান্ড অল আউট হয়ে যায় মাত্র ১৯৪ রানে।

ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের একচেটিয়া দাপট অবসানের সূচনা করে ভারত। ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপের সময় ভারতীয় দলের অনেক সদস্য বোধহয় ভাবতে পারেননি তারা বিশ্বকাপ জিততে চলেছেন৷ সেমিফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে ফাইনাল খেলার আশা হারায় পাকিস্তান৷ অন্য ম্যাচে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে হারিয়ে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে ফাইনালে জায়গা করে নেয় টুর্নামেন্টের ডার্ক হর্স ভারত৷ ফাইনালের শুরুটাও তেমন ভালো হয়নি কপিল দেবের দলের৷ মাত্র ১৮৩ রান করতেই ক্যারিবীয় বোলারদের সামনে গুটিয়ে যায় তারা৷ সবাই মনে করছিল, এবারের বিশ্বকাপ ট্রফিটি বুঝি আবারও দেখা যাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ শিবিরে৷ ভিভ রিচার্ডসের নেতৃত্বে ক্যারিবীয়রা এক পর্যায়ে এক উইকেটে ৫০ রান তুলে ফেলে৷ ঠিক এই সময়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মদন লাল এবং মহিন্দর অমরনাথ৷ তাদের ঘূর্ণিতে একে একে পরাস্ত হতে থাকেন প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা৷ দুইজনেই তিনটি করে উইকেট দখল করেন৷ মাত্র ১৪০ রানে যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অল আউট গোটা লর্ডস যেন ভেঙ্গে পড়ে ভারতীয় দর্শকদের উল্লাসে৷

এই প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন হয় ইংল্যান্ডের বাইরে, যৌথ আয়োজক হয় ভারত এবং পাকিস্তান৷ অন্যদিকে ম্যাচ ৬০ ওভারের বদলে ৫০ ওভারে নামিয়ে আনা হয়, প্রথমবারের মত ম্যাচ পরিচালনা করেন নিরপেক্ষ আম্পায়ার৷ সেমিফাইনালে ভারত এবং পাকিস্তান ওঠায় অনেকেই আশা করেছিলেন ফাইনালে হয়তো দেখা যাবে চির প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশকে৷ কিন্তু ভারত ফেভারিট ইংল্যান্ডের কাছে এবং পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে গেলে সমর্থকদের সেই আশা নিভে যায়৷ অন্যদিকে এই প্রথমবারের মতো ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফাইনাল তো দূরের কথা সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়৷ ফাইনাল ম্যাচে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করে অসিরা৷ ডেভিড বুনের ৭৫ রানের কল্যাণে অস্ট্রেলিয়া সংগ্রহ করে ২৫৩ রান৷ তবে এই সংগ্রহ যে খুব বড় ছিল তা নয়৷ বিশেষ করে মাইক গ্যাটিং এর নেতৃত্বে ইংলিশ ব্যাটিং লাইন আপ ছিল বেশ শক্তিশালী৷ কিন্তু একটি রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে উইকেট কিপার গ্রেগ ডায়ারের হাতে ধরা পড়েন গ্যাটিং৷ এরপর থেকে আর খেলায় ফিরে আসতে পারেনি ইংলিশরা৷ শেষ ওভারে তাদের দরকার ছিল ১৭ রান৷ কিন্তু ২৪৬ রানেই থেমে যায় ইংল্যন্ডের ইনিংস৷ ফলে প্রথমবারের মত বিশ্ব ক্রিকেটে সেরার আসন পায় অস্ট্রেলিয়া৷ আর শুরু হয় বিশ্ব ক্রিকেটে অসিদের উত্থানপর্ব৷

ওয়ানডে ক্রিকেটের পঞ্চম বিশ্বকাপে এসে রংয়ের ছোঁয়া পায় ক্রিকেট৷ প্রথমবারের মত যোগ হয় রঙ্গীন পোশাক, ফ্লাড লাইট এবং সাদা বল৷ এছাড়া আসে বহু বিতর্কিত ডার্ক ওয়ার্থ লুইস বা বৃষ্টি আইন, যার ফলশ্রুতিতে কপাল পোড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার৷ মোট নয়টি দলের অংশ গ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে পাকিস্তান এবং অন্যতম ফেভারিট ইংল্যান্ড৷ তবে পাকিস্তানের ফাইনালে ওঠাটা ছিল বড় ধরনের অঘটন৷ কিন্তু ইমরান খানের নেতৃত্বে একঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড় সব হিসাব নিকাশ বদলে দিতে সমর্থ হয়৷ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে পাকিস্তান সংগ্রহ করে ছয় উইকেটে ২৪৯ রান যার মধ্যে সর্বোচ্চ আসে অধিনায়ক ইমরানের ব্যাট থেকে ৭২ রান৷ জবাবে ৬৯ রান তুলতেই চার উইকেট হারায় ইংল্যান্ড যার মধ্যে ছিল ইয়ান বোথামের উইকেটটিও৷ পাকিস্তানি পেসার ওয়াসিম আকরামের বলে কট বিহাইন্ড হয়ে যান এই ডেঞ্জারম্যান যদিও আজ পর্যন্ত তিনি স্বীকার করেননি বলটি তার ব্যাটে লেগেছিল৷ এরপর নেইল ফেয়ারব্রাদার এবং অ্যালান ল্যাম্ব ইংল্যান্ডকে খেলায় ফিরিয়ে আনেন৷ কিন্তু ওয়াসিমের দুর্দান্ত দুটি ডেলিভারি পাকিস্তানের বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে দেয়৷ পরপর দুই বলে আউট হন ল্যাম্ব এবং অলরাউন্ডার লুইস৷ শেষ পর্যন্ত ২২ রানে জয়ী পাকিস্তান৷ আর ট্রফি তুলে নেন সর্বকালের অন্যতম সেরা অধিনায়ক ইমরান খান৷

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে উপমহাদেশের আধিপত্য এই বিশ্বকাপেও দেখা যায়৷ সহ আয়োজক দেশ শ্রীলংকা ফাইনালে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের শক্তির আগমনী বার্তা ঘোষণা করে৷ অন্যদিকে পিঞ্চ হিটিং এর মাধ্যমে ব্যাটিং এ নতুন ধারা চালু করে লংকানরা৷ বিশ্বকাপ আয়োজিত হয় ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলংকায়৷ নিরাপত্তার কারণে শ্রীলংকায় খেলতে অস্বীকার করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অস্ট্রেলিয়া৷ ইডেন গার্ডেনে ঘটনাবহুল সেমিফাইনালে ভারতকে হারায় অর্জুনা রানাতুঙ্গার দল৷ আর অন্য ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে৷ ফাইনালটি ছিল লংকান তারকা অরবিন্দ ডি সিলভার একক ম্যাচ৷ কি বোলিং, কি ব্যাটিং এমনকি ফিল্ডিং এও যে দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখান ডি সিলভা তা এক কথায় অনবদ্য৷ মার্ক টেইলরের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া প্রথমে ব্যাট করে তোলে ২৪১ রান৷ কিন্তু সেই রানকে কখনই খুব বেশি মনে হয়নি ডি সিলভার কারণে৷ তাঁর অনবদ্য অপরাজিত ১০৭ রানের কল্যাণে মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে ম্যাচটি জিতে নেয় লংকানরা৷ বোলিং এ তিনটি উইকেট নেন ডি সিলভা, পাশাপাশি দুইটি ক্যাচও ধরেন তিনি৷ এই বিশ্বকাপে শ্রীলংকার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হন সানাথ জয়াসুরিয়া৷ প্রথম ১৫ ওভারের ফিল্ডিং বাধ্যবাধকতার সুযোগ নিয়ে পিঞ্চ হিটিং এর ধারা চালু করেন তিনি৷

এই বিশ্বকাপ থেকেই ক্রিকেটে নতুন সম্রাজ্য গড়ে তোলা শুরু হয় অসিদের। বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ ছিল এটি। অস্ট্রেলিয়া । ক্রিকেটপ্রেমিরা এ টুর্নামেন্টে দেখতে পায় সর্বকালের সেরা ওয়ানডে ম্যাচ। সেমিফাইনালের সেই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। মূলত এই সেমিফাইনাল জয়ের পর অসি দলে যে উজ্জীবনী শক্তির সৃষ্টি হয় তা ঠেকানোর মত সাধ্য পাকিস্তান দলের ছিল না৷ যদিও পাকিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম সেরা দল ছিল ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের দলটি৷ ওয়াসিম আকরামের নেতৃত্বে একঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নেয় তারা এবং যোগ্যতর দল হিসেবেই তারা ফাইনালে ওঠে৷ অন্যদিকে টুর্নামেন্ট শুরু থেকে ধুঁকতে থাকা অস্ট্রেলিয়া নিজেকে যেন খুঁজে পায় সেমিফাইনালে হ্যান্সি ক্রোনিয়ের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে৷ ফলে ফাইনালটি হয়ে পড়ে অনেকটা একতরফা৷ ব্যাটিং’এ নেমে অসি বোলারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানরা৷ মাত্র ৩৯ ওভারে ১৩২ রানে অল আউট হয় তারা৷ জবাবে মাত্র ২০ ওভারেই খেলা শেষ করে দেন অসি ব্যাটসম্যানরা৷ আর অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ তুলে নেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ৷ এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমান পর্যায়ে নিয়ে আসে অসিরা৷

এই বিশ্বকাপটিও দুর্দান্তভাবে জিতে নেয় অস্ট্রেলিয়া৷ টেস্ট এবং ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়া দলের তখন জয়যাত্রা অব্যাহত৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেও তার ব্যত্যয় ঘটলো না৷ তবে শেন ওয়ার্নের মাদক কেলেংকারি বিশ্বকাপের কপালে কালি লাগিয়ে দেয়৷ ফাইনালে সেরা দুটি দলই খেলেছিলো একে অপরের বিরুদ্ধে৷ কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার জয়রথ থামানোর সাধ্য তখন গাঙ্গুলির নেতৃত্বাধীন ভারতের ছিল না৷ এর প্রমাণও মেলে, ‘৯৯ বিশ্বকাপের ফাইনালের মত একতরফাভাবে বিজয় ছিনিয়ে নেয় অসিরা৷ ফাইনালে অধিনায়ক পন্টিং এর ১২১ বলে ১৪০ রানের পর খেলায় আসলে ফেরার মত অবস্থা ছিল না ভারতীয়দের৷ অসিদের সংগ্রহ ছিল দুই উইকেটে ৩৫৯ রান, যা বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ৷ জবাবে অসিদের মতই মারকাট ব্যাটিং শুরু করে গাঙ্গুলির দল৷ কিন্তু ৩৯ ওভারেই ২৩৪ রানে থেমে যায় তারা৷ অস্ট্রেলিয়া জেতে ১২৫ রানের বিশাল ব্যবধানে৷ আর ওয়ানডে ক্যাপ্টেন হিসেবে বিশ্বকাপ তুলে নেন এবার রিকি পন্টিং৷ বিশ্বকাপের সাফল্যে অস্ট্রেলিয়া চলে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ছাড়িয়ে আরও ওপরে৷ এছাড়া আফ্রিকা মহাদেশে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ আয়োজনও ছিল সেবারের বিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য ব্যাপার৷

অষ্টম বিশ্বকাপটি নানা অঘটন ও কেলেংকারির কারণে বেশ সমালোচিত হয়৷ অন্ধকারের মধ্যেও ফাইনাল খেলা চালিয়ে যাওয়ার আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা ওঠে৷ এছাড়া এই বিশ্বকাপ চলাকালে পাকিস্তান দলের কোচ বব উলমারের রহস্যজনক মৃত্যু হয়৷ তবে ফাইনাল দলে অবশ্য যোগ্য দল হিসেবেই ওঠে অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলংকা৷ উপমহাদেশের দুই শক্তিশালী দল ভারত ও পাকিস্তান যখন প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেন, তখন ভরসা ছিল একমাত্র শ্রীলংকা৷ তবে ফাইনালে অসি আধিপত্যে কোনরকম আঁচ তা’তে ফেলতে পারেনি শ্রীলংকা৷ বৃষ্টির কারণে খেলা কমিয়ে আনা হয়েছিল ৩৮ ওভারে৷ কিন্তু তার মধ্যেই অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ১০৪ বলে ১৪৯ রানের দানবীয় ইনিংসের কল্যাণে অসিরা দাঁড় করায় চার উইকেটে ২৮১ রানে ইনিংস৷ মূলত তখনই বোঝা যাচ্ছিল টানা তিনবারের মত শিরোপা নিতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া৷ তবে জয়াসুরিয়া এবং সাঙ্গাকারার ব্যাটে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে লংকানরা৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক দূরেই তাদের থাকতে হয়৷ এর মধ্যে আলো কমে আসায় আম্পায়াররা খেলা বন্ধ করে দেন এবং অসি খেলোয়াড়রা তাদের বিজয়োল্লাস শুরু করেন৷ কিন্তু একটু পর আবারও খেলা শুরু হলে সবাই অবাক হয়ে যান৷ শেষ পর্যন্ত অন্ধকারের মধ্যেই খেলা শেষ হয়৷ এই ঘটনায় প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হন আয়োজক দেশের কর্মকর্তারা৷

বিশ্বকাপ আয়োজনের কথা ছিল উপমহাদেশের চারটি দেশে। কিন্তু লাহোরে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের উপর বোমা হামলার জের ধরে পাকিস্তান হারায় তাদের আয়োজক হওয়া যোগ্যতা। তাদের যে ১৪ টি ম্যাচ আয়োজনের কথা ছিল সেসব পরে ভাগাভাগি হয়ে যায় বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে। মনোরম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পর্দা উঠে বিশ্বকাপে। উদ্বোধনী ম্যাচে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশকে ৮৭ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ভাবে দাপট দেখিয়ে যায় ভারত। শেষ পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর এবার ওয়ানডে বিশ্বকাপও জিতে নেয় ভারত। ফাইনালে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে প্রথমবারের মত স্বাগতিক কোন দেশ নিজেদের সমর্থকদের সামনে তুলে ধরে বিশ্বকাপ। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেয় ছয় উইকেটের ব্যবধানে। ব্যাট-বলের অনন্য পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স দেখান যুবরাজ সিং। টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার তার হাতে। বিদায় বেলায় থাকা ব্যাটিং কিংবদন্তী শচীন টেন্ডুলকারও গোটা ক্যারিয়ারের একমাত্র অপ্রাপ্তি মুছে ফেলেন। বাংলাদেশের জন্য টুর্নামেন্টটা হয়ে আছে হতাশার এক ইতিহাস হয়ে। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ছয়টি ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জিতেছিল সাকিব আল হাসানের দল। সমান ম্যাচ জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজও। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যথাক্রমে ৫৮ ও ৭৮ রানে অল আউট হওয়ার স্মৃতি। নেট রান রেটে এগিয়ে থেকে শেষ আটে চলে যায় ক্যারিবিয়রা।

২০১৫ সালের অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড আসরেই সর্বোচ্চ মাফল্য পায়। আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের নকআউট পর্বে উত্তীর্ণ হয় টাইগাররা। কিন্তু সেখানে প্রতিপক্ষ ভারতের সাথে খেলার সময় আম্পায়ারের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ফলে লড়াই হতে ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ। শেষ চারে পৌছাতে না পারার স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি বাংলাদেশের মানুষ। বিশ্বকাপের এ আসরে অস্ট্রেলিয়া ফের তাদের হারানো ট্রফি ফিরে পায়। বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই আয়োজক দেশ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নামে নিউজিল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের তোপের মুখে পড়ে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে কিউইরা। শেষ পর্যন্ত গ্র্যান্ট ইলিওটের ৮৩ রানের সুবাদে ১৮৩ রানের মামুলি পুঁজি পায় নিউজিলান্ড। জবাবে ব্যাট করতে নেমে মাইকেল ক্লার্কের ৭৪ রানের ইনিংসের উপর ভর করে নির্ধারিত ওভারের অনেক আগেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়া।

আস/এসআইসু

Facebook Comments