ফরমালিনে নীরব গণহত্যা!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

‘খুন করলে যদি ফাঁসি হয় তাহলে খাদ্যে ফরমালিনসহ যাবতীয় ভেজাল মিশ্রণের দায়ে জড়িতদের কেন ফাঁসি হবে না এবং তাদেরও ফাঁসি দিতে হবে’— সম্প্রতি এমন জোরালো দাবি করেছেন র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহম্মেদ। তার এমন বক্তব্যের যৌক্তিকতা খুঁজতে জনসাধারণের (ভোক্তা) সঙ্গে কথা বলে র্যাব মহাপরিচালকের বক্তব্য যথার্থই বলে জানা যায়। ফরমালিনের প্রভাবে নিজের অজান্তেই অকালে মৃত্যুর কবলে পতিত হতে হচ্ছে এমনটা উল্লেখ করেই অধিকাংশ ভোক্তা সাধারণই র্যাব মহাপরিচালকের সঙ্গে একাত্মতাও প্রকাশ করেছেন।

খুনের দায়ে যদি ফাঁসি হতে পারে তবে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মিশিয়ে নীরব হত্যায় জড়িতদেরও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির বিধান রাখার জোরালো দাবিও করেন অনেকে। যদিও গত বছর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এ তথ্যের বিপরীতে বক্তব্য দিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ফরমালিনে ইথোফেন দিয়ে পাকানো ফল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। যে কথা সে কাজ— এখনো পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ফরমালিন তথা খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থানই গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। তবে তাদের হাঁকডাক রয়েছে ঠিকই।

খাদ্যে ভেজালকারী ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য থামাতে কার্যত আদৌ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নেয়নি কোনো ব্যবস্থা। এছাড়া বলার মতো বিশেষ কোনো ভূমিকাও রাখতে পারেনি সরকারের কোনো সংস্থা। যে কারণে নিরাপদ খাদ্য আজ জাতির জন্য স্বপ্ন। খাদ্য নিরাপদ করতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান ভূমিকার সম্পর্কে জানতে চেয়ে চেয়ারম্যান মাহফুজুল হকের মুঠোফোনে ফোন করা হলেও তিনি কোনো কথা না বলেই ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

প্রবাদ রয়েছে- মাছে ভাতে বাঙালি। অথচ সে মাছেই আজ ফরমালিন নামক বিষ আর ভাতের চালে মিশছে প্রাণঘাতী ক্যাডমিয়াম! মাছ-ভাতের বাঙালি আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও হতে পারেনি নিরাপদ খাদ্যের অধিকারী। এমন কোনো খাদ্য নেই বর্তমান সময়ে নিরাপদ বলা যাবে! প্রায় সব খাবারই ভেজালে ভরা, ফরমালিনে জড়ানো সব খাবারেই যেন বিষের ছড়াছড়ি! নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে প্রায় ডজন খানেক বৈধ কর্তৃপক্ষ থাকলেও প্রশ্ন উঠছে— আদৌ কী স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতির খাদ্য নিরাপদ করতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ?

তবে খাদ্য নিরাপদ করার লক্ষ্যে সরকারের নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-র নিমিত্তে ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সংস্থা গঠনে আশার সঞ্চার হলেও কার্যত সূচনার পর থেকে খাদ্যে ভেজালরোধে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় থেকে নিজেদের প্রচারেই সীমাবদ্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মাঠপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপদ খাদ্য আইনের বাস্তব প্রয়োগ না করায় ভেজাল খাদ্য কমানো সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করছেন অনেকেই। পিওর ফুড অর্ডিনেন্স নামে ১৯৫৯ সালের আইনকে রহিত করে যুগোপযোগী করেই নিরাপদ খাদ্য আইন করা হয়।

যে আইনের নিয়ন্ত্রক বানানো হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক উপকরণ পাওয়া গেলে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ২ বছর থেকে ৭ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি গুরুতর অপরাধ বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডেরও বিধান রয়েছে ওই আইনে। অথচ প্রণয়ণেই সীমাবদ্ধ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইন প্রয়োগহীনতায় খাদ্যে ফরমালিন তথা বিষযোগ বেড়েই চলেছে। আর এতে বেড়েই চলেছে নীরব গণহত্যা!

ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার সুরক্ষিত রাখার দায় সরকারের রয়েছে বলেই আইন পাস করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করলেও বিদ্যমান আইনের তোয়াক্কা না করেই লোকদেখানো কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকছে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। তার মধ্যে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) একটি। খাদ্যে ভেজাল ঠেকাতে বিএসটিআই জনস্বার্থের একটি গ্রুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু এ সংস্থার কার্যক্রমও আশাহত করছে জনসাধারণকে। ভেজাল ও অননুমোদিত খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বিক্রির দায়ে বিএসটিআই মাঝে-মধ্যে কতিপয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আদায় করে লাখ লাখ টাকা জরিমানাও। কার্যত এ কর্মকাণ্ড অনেকটাই লোকদেখানোর মতো।

ভেজালের দায়ে অভিযুক্ত বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই জরিমানা পরিশোধের পর সবাইকে ম্যানেজ করে আবারো একই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। যে কারণে ভুক্তভোগীরা বিএসটিআইকেই দায়ী করছেন। নিধিরাম সর্দারের মতো শুধু মামলা দায়ের ও জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা। ফলে ভেজালের কারবারিরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

তাই মাছে মিলছে বিষাক্ত ফরমালিন, ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম (পিপিটি) পাউডার, বিস্কুটসহ বেকারি দ্রব্যে রয়েছে বিষ সমতুল্য রং আর মুড়িতে মেশানো হচ্ছে কৃষিকাজে ব্যবহূত ইউরিয়া সার। এর বাইরেও রয়েছে নানা রাসায়নিক সংমিশ্রণের কারসাজি।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষল অধিদপ্তর। এ সংস্থাও নিয়োজিত রয়েছে ভোক্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজের দায়িত্বে। অথচ এ সংস্থার দায়-দায়িত্ব মাঠপর্যায়ে চোখে পড়ার মতো নয় বলে দাবি করছে বিভিন্ন মহল। সাধারণ ভোক্তাদের অধিকাংশই জানেন না, কীভাবে এ সংস্থার কাছ থেকে অধিকার আদায়ের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করানো যায়।

তবে কোনো ভোক্তা যদি প্রতারিত হয় তাহলে অভিযোগের প্রেক্ষিতেই অভিযান চালায় এ সংস্থা। কিন্তু নিজ উদ্যোগে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ ঘটাতে দেখা যায় না সাধারণত। এছাড়াও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে রয়েছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ প্রায় ২৩টি সংস্থা। সবকটি সংস্থার সমন্বয় করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলেও খাদ্য নিরাপদ করতে আদৌ দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেনি সংস্থাটি।

সর্বোপরি আজ প্রশ্ন উঠেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সরকারের প্রায় ২৩টি সংস্থার পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসন, আইন-আদালত থাকা সত্ত্বেও খাদ্যে ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না। ভেজালকারীদের দাপটের মূলে কারা? খাদ্যে ভেজালের অপরাধে শাস্তিযোগ্য আইন থাকা সত্ত্বেও নেই কার্যকারিতা। আইনের প্রয়োগহীনতাই ভেজালকারীদের উৎসাহিত করছে বলে বলছেন অনেকেই। জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা প্রদর্শনের কোনো সুযোগ না থাকলেও কার্যত অসংখ্য সংস্থার নেতৃত্ব দেওয়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে তার সহযোগী সংস্থাগুলো নিয়ে।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, সরকার দ্রুত ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’-এর প্রয়োগে সচেষ্ট না হলে ভেজাল থেকে মুক্তি মিলবে না বরং নীরব গণহত্যা বাড়তেই থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বিভাগের সচিব বেগম শামীমা ইয়াছমিনের কাছে জানতে চাইলে, বর্তমানে ফরমালিন আমদানির বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি তিনি। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে তথ্য দিতে হবে বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি বিএসটিআইর অনুমোদনহীন কসমেটিকস, জুস ও শিশুখাদ্য বিক্রি অপরাধে আলমাস সুপার শপসহ ২১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রেক্ষিতে বিস্ময় প্রকাশ করে আদালত বলেন, দেশে ভোক্তা অধিকার আইন থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদের (হাইকোর্টে) কাছে আসতে হবে? সেখানে কেন যাওয়া হয় না?

এ নিয়ে ভোক্তা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিরাপদ খাদ্য আইন আছে ঠিকই কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে আইনের বাস্তবায়ন করছে না। যে কারণে আজও খাদ্য নিরাপদ করা সম্ভব হয়নি এবং এসব সংস্থার প্রতি আস্থাও নেই জনসাধারণের।

‌আস/এসআইসু

Facebook Comments