প্রিন্ট মিডিয়ার চোখে বাজেট

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট গত বৃহস্পতিবার পেশ করা হয়েছে। এরপর থেকে দেশের আমজনতার আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বাজেটের খুঁটিনাটি। নতুন বাজেটে জীবনযাত্রায় কি প্রভাব পড়বে তাই নিয়েই সবার ভাবনা। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, গৃহিণী, উদ্যোক্তা যুবক, শিক্ষার্থী, কৃষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যার যার মতো করে হিসাব করছেন। এদিকে দেশের পত্রিকাগুলো বাজেট সংক্রান্ত খবরে সয়লাব।গতকাল প্রকাশিত সব পত্রিকাই তাদের প্রথম পাতা, পেছনের পাতাসহ অধিকাংশ পাতাতেই বাজেট সংক্রান্ত খবর ও নানামাত্রিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।

দৈনিক প্রথম আলো শিরোনাম করেছে ‘নতুন কিছু নেই প্রথম ইনিংসে’। এখানে বাজেটের মূল সারাংশ তুলে ধরে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে ব্যয় বেশি আয় কম, হতাশ মধ্যবিত্ত। সংকটে ব্যাংক। এ ছাড়া বলা হয়েছে কৃষকের ধানের দাম পাওয়া নিয়ে কিছু বলা হয়নি বাজেটে। এবং কালো টাকার মালিক যারা তারা সুবিধা পাবে। প্রথম আলো তাদের বাজেট সংক্রান্ত খবরে চলমান বিশ্বকাপ ক্রিকেটের হাওয়া জুড়ে দিয়েছে। ব্যাট ও বলের লোগো দিয়ে তারা বিভিন্ন উপাত্ত ও পয়েন্টগুলো জুড়ে দিয়েছে। যুগান্তর প্রধান শিরোনাম করেছে ‘করের জালে বড় স্বপ্নের বাজেট’। নিউ এজ হেডলাইন করেছে ‘বিশাল ঘাটতি পূরণের দিক-নির্দেশনাহীন বড় বাজেট’। তবে সবচেয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে বাজেট নিউজ উপস্থাপন করেছে দ্য ডেইলি স্টার।

পত্রিকাটি প্রথম পাতার পুরোটা জুড়ে কার্টুনচিত্রের মাধ্যমে বাজেটচিত্র তুলে ধরেছে। বাজেটে কার জন্য কি রয়েছে, কার লাভ-কার মাথায় হাত তা উঠে এসেছে। কার্টুনের মাধ্যমে তুলে ধরা গল্পে বলা হয়েছে, কালো টাকা কার কাছে, দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জন্য কতটা সুযোগ রাখা হয়েছে। আদৌ তারা সুবিধা পাবেন কি না ইত্যাদি সব বিষয়। প্রথম পাতায় কোনো খবর তারা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করেনি। সবটাই কার্টুনচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। তবে ভেতরের পাতায় পত্রিকাটি একটি শিরোনাম করেছে ‘কৃষকের জন্য সুখবরের কোনো আভাস এই বাজেটে নেই’।

এই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, উৎপাদক তথা কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যাতে তারা আরও বেশি যন্ত্রনির্ভর হয়ে ওঠেন। কারণ এবার বোরো মৌসুমে ধানকাটা শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরির কারণে কৃষকরা লাভবান হতে পারেনি। তবে এ ভর্তুকির উদ্যোগেও কৃষকরা প্রকৃত লাভবান হবে না। কৃষিযন্ত্রের বিক্রেতারা কৃষকের লাভের টাকা ঘরে নিয়ে যাবে।

দৈনিক সংবাদ তাদের খবরে বলেছে, ‘৪৮ বছরে বাজেট বেড়েছ ৬৬৬ গুণ’। দৈনিক খোলা কাগজ শিরোনাম করেছে ‘বাস্তবায়ন ঝুঁকির বিলাসী বাজেট’। পত্রিকাটি অধিকাংশ পাতায় বাজেটের যাবতীয় খুঁটিনাটি ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতও খোলা কাগজ গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে। সমকাল শিরোনাম করেছে ‘বাজেটে চাপে পড়বে মধ্যবিত্ত’।

পত্রিকাটি বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, আগামীতে মধ্যবিত্তের জীবন কঠিন হয়ে যাবে। পত্রিকাটি ভাগ ভাগ করে দেখানোর চেষ্টা করেছে মধ্যবিত্তরা কোথায় কতখানি চাপে পড়তে পারে। কালের কণ্ঠের প্রধান খবর ‘দেশি শিল্প ও রপ্তানিতে উৎসাহ’। পত্রিকাটি লিখেছে, বাজেটে মধ্যবিত্ত ও কৃষকদের জন্য কিছু নেই। সঞ্চয়পত্রে গ্রাহকদের লাভ কমবে। কারণ এখানে উৎসেকর দ্বিগুণ করা হয়েছে। তবে এটা মোটেও বিবেচক সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য মানুষ এখানে যায়। এদিকে বাংলাদেশ প্রতিদিনের শিরোনাম ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট’।

ইত্তেফাক হেডলাইন করেছে ‘প্রত্যাশা যৌক্তিক : রাজস্ব আদায়ে কঠোরতার ইঙ্গিত’। আমাদের সময়ের শিরোনাম ‘বিলাসী স্বপ্ন সামর্থ্য কম’। বণিকবার্তা তাদের শিরোনামে রেখেছে ‘হ্যারি পটারিয়ান বাজেটের যাত্রা’। বিশ্লেষণে তারা বলেছে, ব্যাংক, শেয়ারবাজারসহ দেশের অর্থনৈতিক যে পরিস্থিতি সেখানে এ বাজেট হ্যারি পটারের রূপকথার গল্পের মতো।

অর্থমন্ত্রী অসুস্থ থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাজেট বক্তৃতার বড় একটা অংশ পড়ে দিয়েছেন। এটি সব পত্রিকাই গুরুত্ব দিয়ে একটি খবর প্রকাশ করেছে। খোলা কাগজ এ বিষয়ে শিরোনাম করেছে ‘প্রধানমন্ত্রীর নয়া ইতিহাস’। ‘অর্থমন্ত্রী অসুস্থ তাই বাজেট বক্তৃতা পড়লেন প্রধানমন্ত্রী’- দৈনিক প্রথম আলো এ শিরোনাম করেছে।

এ ছাড়া মোটামুটি সব পত্রিকাই তাদের খবরে যেসব পণ্যের দাম বাড়বে ও কমবে তার উল্লেখ করেছে। স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ব্যয়, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ, কর্মসংস্থানসহ কোন খাতে কত বিনিয়োগ, কোন খাত থেকে কত আদায়, কোথায় কত ভর্তুকি ইত্যাদি বিষয় ছক করে তুলে ধরেছে গণমাধ্যমগুলো। কোন কোন পত্রিকা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দিক-নির্দেশনার অভাবের কথা বলেছে। আবার অনেক পত্রিকা ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছে। কারণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ও এই প্রবণতা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও পদক্ষেপের কথা বাজেটে নেই। খেলাপি ঋণ নিয়ে অধিকাংশ পত্রিকা প্রচুর নিউজ ছেপেছে।

এ ছাড়া বেশির ভাগ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বাজেটের বিষয়ে বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে বিশ্লেষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এদিকে বাজেট ঘোষণার পরপরই সিপিডি তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানায়, বাজেটে সচ্ছলরা সুবিধা পাবে। তবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সুবিধা হবে না।

এদিকে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন পত্রিকায় তাদের বাজেট মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তাদের মতামত ছাপা হয়েছে। দৈনিক খোলা কাগজে চারজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের মতামত ও বিশ্লেষণ ছাপা হয়েছে। তারা হলেন-পিকেএসএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, অধ্যাপক আবু আহমেদ ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত। অন্যান্য পত্রিকাগুলোও অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box