প্রশংসা পাচ্ছে পুলিশ নিয়োগে স্বচ্ছতা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাংলাদেশ পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই নেতিবাচক সমালোচনা ও অভিযোগের শেষ ছিলো না। প্রতিবারই দায়িত্বশীলদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলে এই কনস্টেবল নিয়োগে দুর্নীতির কলঙ্ক কালিমা লেপে গিয়েছিল।

ফলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পাশাপাশি নীতিহীনতার মূলোৎপাটনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সরকারপ্রধানের কঠোর নির্দেশে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগকে ঘিরে দুর্নীতির লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বিপিএম (বার)।

পুলিশের আইজির কঠোর তৎপরতায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় গত ২২ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ৬৪ জেলায় রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) হিসেবে ৯ হাজার ৬৮০ জন কনস্টেবলকে মনোনীত করা হয়েছে।

নজিরবিহীন ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত কনস্টেবল নিয়োগের খবর এখন দেশের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। অর্থ বা তদবির নয়, মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে কতটুকু স্বচ্ছ ও নির্ভেজাল নিয়োগ উপহার দিতে পারেন এ নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতা শুরু হয় দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) মধ্যে। যদিও দু’-একটি জেলায় অভিযোগ উঠেছিল।

পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধ জেগে উঠায় দুর্নীতিবাজদের নিয়োগবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। আর দুর্নীতি দমনে সময়োপযোগী এমন পদক্ষেপে বিরল ও অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হয় প্রধানমন্ত্রীর উজ্জ্বল ভাবমূর্তিও।

সাধারণ জনমুখে আলোচনা হচ্ছে, টিমওয়ার্কের মাধ্যমেই কনস্টেবল নিয়োগে পুলিশের চিরায়ত ভাবমূর্তি সংকটই কাটিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করতে সক্ষম হয়েছেন পুলিশ প্রধান।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর নিজের সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে শুরু থেকেই কঠোর ছিলেন ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।

গত ১২ জুন পুলিশ সদর দপ্তরের ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায় এ বিষয়ে ডিআইজি ও এসপিদের কঠোর নির্দেশনা দেন। আর এই নিয়োগ শুরুর দুই দিন আগেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রত্যেক জেলার এসপিদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

আর তার সেই নির্দেশনার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে স্রোতের প্রতিকূলের এ যুদ্ধ জয়ের জন্য নানা কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশের এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা।

নিয়োগের শুরুতেই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৬৪ জেলায় উচ্চপর্যায়ের টিম পাঠানো হয়। মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিট ছাড়াও রেঞ্জ ডিআইজির নজরদারি কমিটি।

পুলিশ সদরদপ্তর থেকে একজন পুলিশ সুপার (এসপি) ও একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে বিশেষ টিম ও সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার মনিটরিং এবং সংশ্লিষ্ট জেলায় গঠন করা কমিটিও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া উপহারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা হয়।

আর সার্বক্ষণিক মনিটরিং করেন অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম), ডিআইজি (এইচআরএম) ও এআইজি (আরএন্ডসিপি-২)। সৎ নিষ্ঠাবান একাধিক পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে সব সময়ই পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

চলতি বছর পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন পুলিশ প্রধানকে। কনস্টেবল নিয়োগ শুরুর আগেও পুলিশপ্রধানকে ডেকে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দেন তিনি।

শুধু কনস্টেবল নিয়োগের দুর্নীতিই নয়, দেশের মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষণা দিয়ে আগেই অ্যাকশন শুরু করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক। জঙ্গি নির্মূলের মতো মাদক ব্যবসায়ীদেরও সমূলে উৎপাটনের লক্ষ্যে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে তার নেতৃত্বাধীন পুলিশ বাহিনী।

দুর্নীতির বিরুদ্ধেও দিনবদলের পালায় পুলিশকে তিনি ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সততার শক্তিতেই পুলিশ প্রধান এ স্বপ্ন সফলভাবে বাস্তবায়নও করেন। এবার তার নির্দেশেই জেলায় জেলায় এসপিরা কনস্টেবল নিয়োগে বাড়তি কোনো টাকার প্রয়োজন পড়ে না, দালালদের কাছে প্রতারিত হবেন না, এমন ব্যাপক ভিত্তিক প্রচারণা চালায়।

এতে উৎসাহিত হয়েই এসএসসি পরীক্ষার আদলে এ নিয়োগ পরীক্ষায় এক লাখ ৩০ হাজার ৪০৩ জন প্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। এতে গত বছরের চেয়ে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৫৫ হাজার ৪০৩ জন।

শুধু তাই নয়, এবার প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে চাকরির জন্য মনোনীত প্রার্থীদের মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করেছেন।

দারিদ্র্যের অন্ধকার ঘর থেকে উঠা আসা আলোকিত এসব মেধাবী তরুণ-তরুণীরা নিজেরাও গর্বের সঙ্গেই উচ্চারণ করেছেন প্রায় বিনাপয়সায় পুলিশে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি।

আবার চাকরিদাতা সেই সৎ পুলিশ কর্মকর্তারা নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে ফুল ও মিষ্টিও বিতরণ করছেন।

তাদের সঙ্গে তাদের সৌভাগ্যবান অভিভাবকরাও ছিলেন। সবার চোখ থেকেই ঝরেছে আনন্দাশ্রু। চাকরি জীবনে নিজেরা ঘুষ বর্জনের যেমন অঙ্গীকার করেছেন, তেমনি দেশের সেবায় জীবন উৎসর্গ করার কথাও বলেছেন।

পুলিশের সেই প্রথাবিরোধী এমন দৃষ্টান্ত দেশের গণমাধ্যমগুলোতেও গুরুত্ব দিয়েই প্রচারিত হচ্ছে। সূত্র মতে, পুলিশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে বর্তমান আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

পুলিশ প্রধানের গতিশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বেই ক্রমশ মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। মানুষকে বিপদগ্রস্ত বা জিম্মি করে অর্থ উপার্জনের জঘন্য মানসিকতার অধিকারী পুলিশকে আর দেখতে চান না আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী।

সূত্র জানায়, ঘুষ লেনদেনের চেষ্টাসহ নানা অভিযোগে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, কুষ্টিয়া, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলায় করা ১৮টি মামলায় ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর ২৯টির অধিক মোবাইল কোর্ট বসিয়ে সাজা ও জরিমানা করা হয়।

জরিমানার পরিমাণ অনধিক পাঁচ হাজার টাকা। আর ১০০ জনের অধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তথা তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া জেলায় পাঁচটি মামলা করা হয়। খুলনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে হয়েছে দু’টি করে মামলা।

অন্য জেলায় একটি করে মামলা করা হয়েছে। এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কুড়িগ্রাম জেলার এডিশনার এসপিসহ পুলিশ সদস্য ও কর্মরত সিভিল স্টাফদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ২১ জুন টাঙ্গাইলে কনস্টেবল পদে চাকরি দেয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগে পুলিশের এসআই মোহাম্মদ আলী এবং কথিত সাংবাদিকের স্ত্রী শাহানাতুল আরেফিন সুমিকে গ্রেপ্তারের মধ্যে দিয়ে কনস্টেবল নিয়োগে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিরোধ অ্যাকশন শুরু হয়।

এবারের এই কনস্টেবল নিয়োগ-বাণিজ্যের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে। তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বদলি করা হয়। টাঙ্গাইলের পর মাদারীপুরের পুলিশ সুপারের দিকে অভিযোগের তীর উঠে।

সেখানে প্রায় ৭২ লাখ ঘুষের টাকা উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় কনস্টেবল নিয়োগের ‘নিয়োগকর্তা’ পুলিশ সুপার (এসপি) সুব্রত কুমার হালদারও রেহাই পাননি। গত ২৪ জুন তার দেহরক্ষী কনস্টেবল নুরুজ্জামান সুমনকে ঘুষ গ্রহণের নগদ টাকাসহ আটক করে পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ টিম।

সেখানকার পুলিশ লাইনের মেস ম্যানেজার জাহিদ হোসেন, টিএসআই গোলাম রহমান ও পুলিশ হাসপাতালের স্বাস্থ্য সহকারী পিয়াস বালার কাছ থেকেও ঘুষের ৭২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এসপির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায় কনস্টেবল নিয়োগে নজরদারি চালানো পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ টিম।

সূত্র জানায়, এবার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে ঘুষ লেনদেন ঠেকাতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মুঠোফোনে আড়াপাতা হয়েছিল। আর সেই আড়িপাতার মাধ্যমেই বগুড়ায় পুলিশের দুই সহকারী উপ-পরিদর্শককে (এএসআই) স্ট্যান্ড রিলিজ (তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার) করা হয়েছে।

এবারের পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে স্বচ্ছতার বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পুলিশ সুপার (মিডিয়া এন্ড পিআর) মো. কামরুজ্জামান বলেন, পুলিশ সদরদপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিটের নজরদারি কমিটি ও সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার মনিটরিং কমিটিও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments