প্রভাবশালীদের চাপে মিন্নিদের পরিবার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেপ্তার নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির পরিবার প্রভাবশালী মহলের চাপে আছে। হামলার ভয়ে রাতে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। নিরাপত্তা শঙ্কায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে মিন্নির ছোট দুই ভাইবোনের। রাত-দুপুরে মিন্নিদের বাড়ির আশপাশে টের পাওয়া যায় বখাটেদের আনাগোনা। আর মোটরসাইকেল মহড়া তো রয়েছেই-এমন ভাষ্য মিন্নির বাবা ও তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের।

ওরা কারা? এমন প্রশ্নে অবশ্য মুখে কুলুপ এঁটে আছেন তিনি। এদিকে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষের তরফে মিন্নিকে গ্রেপ্তার করার কারণ হিসেবে ওই সময় বলা হয়েছিল-রিফাত হত্যাকাণ্ডে তিনি জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশের সর্বশেষ ভাষ্য-মিন্নি

এ হত্যাকাণ্ডে পরিকল্পনায়ও জড়িত। রিফাত হত্যা মামলার ৩ নম্বর আসামি মো. রাশিদুল হাসান রিশান ওরফে রিশান ফরাজীকে (২০) গ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বরগুনার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন বলেন, রিফাত হত্যার পরিকল্পনাতেও মিন্নি জড়িত বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, রিফাত হত্যাকাণ্ড মাদকের কারণে ঘটেনি; ঘটেছে ব্যক্তিগত জিঘাংসার জেরে। এ মামলায় বাদী যাদের হত্যাকারী হিসেবে দাবি করছেন, তাদের প্রায় সবাইকেই ধরা হয়েছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ৮ জন। এ সময় তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, এ মামলা নিয়ে পুলিশের ওপর রাজনৈতিক কোনো চাপ নেই।

গতরাতে রিফাত হত্যামামলা প্রসঙ্গে বরগুনার পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা হয় আমাদের সময়ের। এ সময়ও তিনি বলেন, হত্যাকা-ের পর আসামিদের গ্রেপ্তার, পারিপার্শ্বিক অবস্থা-এসব দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে মিন্নি পরিকল্পনাতেও জড়িত থাকতে পারে। সবেমাত্র রিমান্ড শুরু হলো। আমরা এখনো জিজ্ঞাসাবাদের পর্যায়ে আছি। রিমান্ড শেষ হলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাবে।

ওদিকে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর গতরাতে আমাদের সময়কে বলেন, ‘আসামিদের শনাক্ত করার নাম করে আমার মেয়েকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর পর তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। এখন মিন্নিকে দিয়ে হয়তো জোরপূর্বক

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদায় করা হতে পারে। আমরা এই আশঙ্কা করছি। কারণ খুনিদের পক্ষে প্রভাবশালী একটি গ্রুপ রয়েছে।’ তবে প্রভাবশালী গ্রুপ কারা তা বলতে রাজি হননি তিনি। মোজাম্মেল হোসেন বলেন, পুলিশের কাছে অভিযোগ দেব; কিন্তু পুলিশ তাদের সঙ্গে।

মিন্নির বাবা আরও বলেন, আমার মেয়ের জামাইকে হত্যার পর আমাদের বাড়ির আশপাশে ঘুরছে কিছু অপরিচিত মানুষ। পাশের বাড়িতে ঢুকে খোঁজখবর নিচ্ছে। ভয়ে আমার দুই ছেলে ও মেয়েকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছি। রাতের আঁধারে কে বা কারা আমাকে কখন মেরে ফেলে সেই ভয়ে আছি। আমার পাশে কেউ নেই। আইনজীবীরা ভয়ে দাঁড়াতে পারছেন না। যে কারণে মেয়েটিতে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হল। এখনো আইনজীবী পাইনি। এদিকে মোটরসাইকেল নিয়েও মহড়া দিচ্ছে কিছু ছেলে।

রাব্বী ও আরিয়ানের জবানবন্দি

রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি রাব্বী আকন ও সন্দেহভাজন আসামি আরিয়ান শ্রাবণ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয় বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক হুমায়ুন কবির। এ নিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করে ১২ জন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল সকালে পুলিশ মামলার ৩ নম্বর আসামি রিশান ফরাজীকে গ্রেপ্তার করে; কিন্তু কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা জানায়নি পুলিশ। পুলিশের এই লুকোচুরি নিয়েও কথা উঠেছে।

বরগুনায় মিন্নির রিমান্ড বাতিল আবেদনে সাড়া দেননি হাইকোর্ট

বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির রিমান্ড বাতিলে করা আবেদনে সাড়া দেননি হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, এই মামলায় মিন্নিকে এখন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে এখন অভিযুক্ত হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে আমরা হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আপনাদের অন্য ফোরামে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নিম্ন আদালতেই আবেদনের সুযোগ রয়েছে। আপনারা সেখানে যান। আদালত পরিবর্তনের আবেদনও করতে পারেন। এমনকি ফৌজদারি কার্যবিধিতে হাইকোর্টে বিচার করার আবেদনের সুযোগও রয়েছে।

জাতীয় একটি দৈনিকে ‘মিন্নির রিমান্ড, পাশে কেউ নেই’ মর্মে প্রকাশিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ফারুক হোসেন মিন্নির রিমান্ড বাতিলের আবেদন জানান। তখন বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান এবং বিচারপতি কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এসব কথা বলেন।

আইনজীবী ফারুক হোসেন হাইকোর্টকে বলেন, এ মামলার প্রধান সাক্ষী ছিল আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। আস্থাভাজন হওয়ায় তাকে প্রধান সাক্ষী করা হয়। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের ৫ জন (৪ জন) এখনো গ্রেপ্তারে প্রশাসন বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। প্রধান সাক্ষী আয়শা ছিদ্দিকা মিন্নি স্বামী শোকে এ মুহূর্তে কাতর। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে টর্চারিং করে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এর পর আবার রিমান্ডে নেওয়া হয়। এটি অমানবিক। এ ঘটনার মূল হোতাদের আড়াল করতে মামলার প্রধান সাক্ষীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ সাক্ষী মিন্নি তো সব সময় মামলার পাশে থাকবে; তাকে পরেও গ্রেপ্তার করা যেত। আমরা আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির রিমান্ড বাতিল ও মামলা সঠিক পথে পরিচালনার নির্দেশনা চাই। এ সময় আদালত বলেন, এ মুহূর্তে আমরা হস্তক্ষেপ করব না।

মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেবে ফারুক অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট

বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি হয়ে রিমান্ডে যাওয়া আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেবে অ্যাডভোকেট ফারুক আহাম্মদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট। গতকাল তিনি তার ফেসবুক আইডিতে এ আসামিকে আইনি সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে দুটি পোস্ট দিয়েছেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির এ আইনজীবী এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক এ বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ সম্পর্কে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ ও সংবাদমাধ্যমে দেখলাম আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির পাশে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। একজন মানুষ দোষী কি নির্দোষ তা বিচারে নির্ধারণ হয়। তার আগে তার আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি-মিন্নির পক্ষে আইনি সহায়তা দেব।

এ বিষয়ে আমার অ্যাসোসিয়েট অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম খলিল মিন্নির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনিও আইনি সহায়তা নিতে রাজি হয়েছেন। তাই আগামী মঙ্গলবার মিন্নিকে রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করার দিন আমরা বরগুনার আদালতে যাব আইনি সহায়তা দিতে।

গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেন মিন্নি। হত্যাকাণ্ডের পরের দিন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এ ছাড়া সন্দেহভাজন অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়। এ মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments