প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে কেন বারবার অঘটন?

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভিভিআইপি (অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) ফ্লাইটে নানা কঠোরতার মধ্যেও একের পর এক অঘটন ঘটছে। উড়োজাহাজে যান্ত্রিক ত্রুটি, অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু ওঠানো, মদ্যপ অবস্থায় ক্রু ওঠার চেষ্টা, কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তিকে ভিভিআইপি ফ্লাইটে পাঠানো, পাসপোর্ট ছাড়াই পাইলটের দোহা গমনের ঘটনায় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বাস্তবায়নে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। ভিভিআইপি ফ্লাইট সংক্রান্ত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা নির্দেশনা কখনো কখনো উপেক্ষিত হচ্ছে। দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির ঘটনায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর ত্রিদেশীয় সফরের ফ্লাইটে গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তির কারণে যেতে দেওয়া হয়নি বিমানের গ্রাহকসেবা পরিচালক আতিক সোবহানকে। কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েক বছর ধরেই ভিভিআইপি ফ্লাইট ও মুভমেন্টে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তাজনিত আপত্তির তালিকায় ছিলেন আতিক সোবহানসহ বিমানের কয়েকজন কর্মকর্তা। এর পরও আতিক সোবহানকে ২৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রিদেশীয় সফরের ফ্লাইটের জন্য মনোনীত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা সংস্থার আপত্তির কারণে যেতে পারেননি তিনি।

ভিভিআইপি ফ্লাইটের এসওপি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে সফরসঙ্গী হন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তবে কোনো কারণে তিনি নিজে যেতে না পারলে তাঁর মনোনীত প্রতিনিধিকে ভিভিআইপি ফ্লাইটে পাঠানো হয়। সাধারণত পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা প্রতিনিধি মনোনীত হন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বিমানের গ্রাহকসেবা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আতিক সোবহানকে নিজের প্রতিনিধি মনোনীত করেছিলেন বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ক্যাপ্টেন ফারহাত হোসেন জামিল।

আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ নিয়ে পাসপোর্ট ছাড়াই কাতার চলে যান পাইলট ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ। বুধবার রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বোয়িং ৭৮৭ মডেলের একটি ড্রিমলাইনার নিয়ে তিনি দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদ দাবি করেছেন ‘মনের ভুলে’ তিনি পাসপোর্ট রেখে চলে যান। তিনি দোহা এয়ারপোর্টের একটি হোটেলে অবস্থান করেন এবং পরে ঢাকা থেকে তাঁর পাসপোর্ট পাঠানো হয়। এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়, তদন্তের জন্য একাধিক কমিটিও কাজ করছে। ফজল মাহমুদের ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করার পাশাপাশি তাঁর জায়গায় ভিভিআইপি ফ্লাইটটি দোহা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন ক্যাপ্টেন আমিনুল ইসলাম।

বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ফেরত আসার পর ক্যাপ্টেন ফজল মাহমুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাসপোর্ট ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়ায় বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনও তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। কিভাবে তিনি পাসপোর্ট ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেছেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীকে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনার ফ্লাইট থেকে একজন ক্যাপ্টেনকে ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এর আগের বছর প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ‘নিরাপত্তা সিলগালা’ ছাড়া সরবরাহকৃত খাবার আটকে গিয়েছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়। শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়েতে ধাতব বস্তু পড়ে থাকার কারণে ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ল্যান্ডিং বিলম্বিত হয়েছিল।

বারবার এ ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে? জানতে চাইলে ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ, বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার হাসান মাসুদ গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনার সুনির্দিষ্ট এসওপি আছে, সেটা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এমন ঘটনা ঘটার সুযোগ নেই। এই ফ্লাইটে কারো না কারো দায়িত্ব ছিল সব ডকুমেন্ট পরীক্ষা করার। একজন পাইলট যখন ফ্লাই করতে যান তাঁর লাইসেন্স, এনড্রসমেন্ট, সিমুলেটরসহ সব ডকুমেন্ট ককপিটে থাকতে হবে। এগুলো ছিল, কিন্তু পাসপোর্ট কেন থাকবে না? ইমিগ্রেশনের আগেই এটা চেক হয়ে যাওয়ার কথা। এটা না হওয়াতেই বোঝা যায় এসওপি অসুসরণ করা হয়নি।’ তিনি বলেন, ফ্লাইট অপারেশনের পরিচালক হওয়ার কারণে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন ফারহাত হোসেন জামিলের নখদর্পণে থাকার কথা কারা গোয়েন্দা সংস্থার কালো তালিকাভুক্ত, কারা নয়।

জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত এমডি ক্যাপ্টেন ফারহাত হোসেন জামিল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি ভিভিআইপি ফ্লাইটের জন্য প্রত্যেকের আলাদা ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। আতিক সোবহানের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার সিদ্ধান্ত ছিল, এটা আমাদের জানা ছিল না।’ তিনি বলেন, পাইলটের পাসপোর্ট রেখে যাওয়া কোনো সিস্টেম ফল্ট নয়, একজন ব্যক্তির নিজস্ব ভুল। এই ভুলটা হয়েছে, তিনি করে ফেলেছেন।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক বলেন, ‘ভিভিআইপি ফ্লাইটে নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। এসওপি মেনেই সব কিছু করা হয়।’ গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যখনই একটা ভিভিআইপি ফ্লাইট যায়, প্রতিবারই গোয়েন্দা সংস্থার ক্লিয়ারেন্স নেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে দুটি সংস্থার একটি সংস্থা ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে, আরেকটি ক্লিয়ারেন্স দেয়নি। ক্লিয়ারেন্স যেহেতু দেয়নি, তাই আতিক সোবহান ফ্লাইটে যাননি। পাসপোর্ট না নেওয়া এটা পাইলটের একান্ত ব্যক্তিগত ভুল।’

বিমান বাংলাদেশের সাবেক এমডি ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ড. এম এ মোমেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন ক্যাপ্টেনকে ভিভিআইপি ফ্লাইটে ঢুকতে হয় এক থেকে চার ঘণ্টা আগে। এসওপি অনুযায়ী পাইলট ইন কমান্ড লিস্ট ধরে ধরে সব কিছু ঠিক আছে কি না তা দেখেন। কিন্তু পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি চলে গেলেন কিভাবে তা বোধগম্য নয়। এটা অবশ্যই থাকতে হবে। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই বিমানে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। এসওপিও যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।’

এদিকে বিমান বাংলাদেশের ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনায় অভিজ্ঞ একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে যে কটি ঘটনা ঘটল তার সব কটিই এসওপি ভায়োলেশনের কারণেই হয়েছে। এসওপি মেনে না চললে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতেই থাকবে। যাঁরা এসওপি মানছেন না তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এসওপি অব ভিভিআইপি ফ্লাইট অনুসারে ফ্লাইটের জন্য আরো একটি উড়োজাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়। ফ্লাইটের এক দিন আগে থেকেই উড়োজাহাজগুলোর এসওপি অনুযায়ী সার্ভিসিং, চেকিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ফিরতি ফ্লাইটেও একই প্রক্রিয়ায় এসওপি অনুসরণ করা হয়।

এ ঘটনায় বিমানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিমান বাংলাদেশের সাবেক বোর্ড সদস্য ও ‘বাংলাদেশ মনিটর’ সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা যখন দুর্বল হয় তখন সব দিকেই তার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। বিমানের সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাপনার ব্যাপক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কেউ কারো দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। সেটা দেখারও কারো কর্তৃত্ব নেই। এভাবে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। পতাকাবাহী এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের শুধু নিরাপত্তা নয়, বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি জড়িত। একে নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।’

ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘লন্ডনে এক কর্মকর্তা দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার টিকিট বিক্রি করে দিলেন, কার্গোর কয়েক শ কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেল—এসব শর্ষের মধ্যে ভূত না থাকলে ঘটা সম্ভব নয়। বিমানের নিজস্ব অডিট শক্তিশালী না করলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box