প্রত্যাশা নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঈদকে সামনে রেখে ঘরে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। প্রতি বছরই ঈদে সড়ক, নৌ এবং রেলপথে ঘরে ফিরতে গিয়ে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পরিবহন সংকট, ভাঙাচোরা রাস্তা, সড়ক দুর্ঘটনা ও দীর্ঘ যানজটের মতো ঘটনা লেগেই থাকে সড়কে। নৌপথে ফেরি সঙ্কটে দৌলতদিয়া, পাটুরিয়া এবং শিমুলিয়া ঘাটে ভয়াবহ যানজটের কবলে পড়ে হাজার হাজার যানবাহন।

আর রেলপথে ইতোমধ্যে অগ্রিম টিকিট কাটতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়েছে। রেলের অ্যাপ ‘রেলসেবা’র কাজ না করায় অনলাইনে বহু মানুষ টিকিট সংগ্রহ করতে পারেননি। যারা দিনরাত লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট পেয়েছেন তারা নিরাপদে বাড়ি যেতে পারবেন এমন প্রত্যাশার মুখে গতকালও কয়েকটি ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। যদিও অন্যান্যবারের তুলনায় এবার রেলের সব ধরণের প্রস্তুতিই ভালো। রেলমন্ত্রীর একান্ত প্রচেষ্টায় রেলকে দুর্নীতি ও অনিয়মমুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। যা ইতোমধ্যে সাধারণ যাত্রীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। সড়কপথে ভোগান্তি কমিয়ে আনতে ৩২ পদক্ষেপ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘœ করা যাবে। সে অনুযায়ি মহাসড়কগুলোতে শেষ মুহূর্তে চলছে সংস্কারের কাজ। সবকিছুর পরে মানুষের প্রত্যাশা নির্বিঘেœ ঘরে ফেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার খুবই ভালো অবস্থায় রয়েছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত এ মহাসড়কের বিষফোঁড়া ছিল তিনটি সেতু- কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী। কয়েকদিন আগে দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু উদ্বোধনের পর খুলে দেয়া হয়েছে। গত মার্চে খুলে দেয়া হয়েছে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু। আজ খুলছে কাঁচপুর ফ্লাইওভার। এর আগে ভুলতা ফ্লাইওভারের একটি অংশ খুলে দেয়া হয়েছে। নতুন করে তিনটি সেতু চালু হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত কয়েকদিন ধরেই কোনো যানজট নেই। অনায়াসে মাত্র চার ঘণ্টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসা-যাওয়া করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন ঈদেই এবার এ মহাসড়কের যাত্রীদের কোনো ভোগান্তি পোহাতে হবে না। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভুলতা অংশে যানজট আছে। তবে এ যানজটের জন্য অব্যবস্থাপনাই দায়ী। পুলিশ একটু সক্রিয় হলেই এ যানজট উপেক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আজ কাঁচপুর ফ্লাইওভার যান চলাচলের জন্য খলে দেয়া হলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা অংশের যানজট অনেকটাই কমে যাবে।

দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ঈদযাত্রায় শঙ্কা

আমাদের ফরিদপুর জেলা সংবাদদাতা জানান, আসন্ন ঈদে সড়ক পথে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের বাড়ি ফেরা এবারও খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ৬ লেন উন্নয়নের কাজ চলায় বিড়ম্বনায় পড়তে হবে যাত্রীদের। আর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে দীর্ঘ পথে সড়কের পাশের মাটি সরে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে এই দুই মহাসড়কে কয়েকগুণ অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম বেড়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ঢাকার বাবুবাজার থেকে শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ঘাট হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৬ কিলোমিটার মহাসড়ক ২ লেন থেকে ৬ লেনের কাজ চলছে দ্রæত গতিতে। মহাসড়কের কাজে বিপুল সংখ্যক গাড়ি ও মালামাল লোড-আনলোড করায় এবারের ঈদে যাত্রীদের ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের সেতু ও কালভার্টগুলো ভেঙে ডাইভারশন তৈরি করায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। রয়েছে কর্দমাক্ত পরিবেশও। এছাড়া মালিগ্রাম, পুলিয়া ও বগাইল এলাকায় এখনও সড়কের কাজ চলছে।
এদিকে জরাজীর্ণ ও ভাঙ্গাচুরার কারণে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে গত কয়েক বছরের ঈদসহ সারা বছরই দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহালেও এবার অনেকটাই স্বস্তি রয়েছে। মহাসড়কটির টেকেরহাট থেকে মোস্তফাপুর পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার অংশ সংস্কার করায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বড়ইতলা থেকে টেকেরহাট পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার অংশ এবং মোস্তফাপুর থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার অংশ আগেই সংস্কার হওয়ায় পরিস্থিতি মোটামুটি সহনীয়।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মালিগ্রাম ও পুলিয়া, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বড়ইতলা, ভুরঘাটাসহ কয়েকটি স্থানে অস্থায়ী বাজার রয়েছে। দুই লেনের সরু অতি ব্যস্ত মহাসড়কজুড়েই পাশের এজিনের মাটি সরে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। রয়েছে অবৈধ যানবাহনের ছড়াছড়িও।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মাহফুজার রহমান বলেন, ঈদের সময় মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়বে। তাই যাতে কোথাও কোনো যানজট সৃষ্টি না হয় তার জন্য ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হবে। মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। আর অস্থায়ী হাট-বাজার যেন কোথাও না বসতে পারে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ছে

আতাউর রহমান আজাদ, টাঙ্গাইল থেকে জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে তবে বিকেলে পর থেকে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে একাধিক স্থানে যানজটের আশঙ্কা করছেন পরিবহন শ্রমিরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও এলেঙ্গা ও বঙ্গবন্ধু সেুত এলাকায় মাঝে মাঝে যানবাহন চলছে ধীর গতিতে। সেতু এলাকায় টুল দিয়ে যানবাহন পার হতে সেখানে কিছুটা সময় লাগছে। এদিকে মহাসড়কে আরও যানবাহনে চাপ বৃদ্ধি পেলে কোথাও কোথাও যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে একাধিক দলে ভাগ হয়ে সার্বক্ষনিক কাজ করছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের গাজীপুর ভোগড়া থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার সড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। যা প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এছাড়া যান চলাচল শুরু হয়েছে তিনটি নবনির্মিত আন্ডারপাস দিয়ে। ৬০ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে মহাসড়কের দুইদিকের বর্ধিত অংশের কাজও। সড়ক উন্নতিকরণের পাশাপাশি ঈদে যাত্রীদের চলাচল নির্বিঘœ করতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে।

জানা যায়, উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলা ও ময়মনসিংহের ২৬টি জেলার অন্তত ৯০টি সড়কের যানবাহন চলাচল করে এই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে।
যান চলাচল নির্বিঘœ করার লক্ষ্যে সরকার ২০১৩ সালে দুই লেনের এই মহাসড়কটি চার লেনে উন্নিতকরণ প্রকল্প হাতে নেয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০১৯ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে। কিন্তু প্রকল্পটিতে ১৪টি আন্ডারপাস, ২৯টি নতুন ব্রিজ, দুটি সার্ভিস লেন ও চারটি ফ্লাইওভারের কাজ সংযুক্ত হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ হয়নি বলে জানায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, এই মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশের করটিয়া আন্ডারপাস ও রাবনা ফ্লাইওভার মেরামতের কাজ অব্যহত রয়েছে। এছাড়া বাঐখোলা ও জামুর্কি বাজার এলাকার প্রায় চারশ মিটার সড়কে রয়েছে ছোট ছোট গর্ত। এর ফলে কিছুটা যানজটের শঙ্কা রয়েছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এদিকে ১১টি আন্ডারপাসের মধ্যে মাত্র তিনটি খোলা হয়েছে যান চলাচলের জন্য।

করটিয়া, বাঐখোলা ও তারটিয়া আন্ডারপাস নির্মাণের দায়িত্বে থাকা সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মীর আখতার লিমিটেডের প্রধান প্রকৌশলী এহসান আহমেদ রাজু বলেন, আসন্ন ঈদ উপলক্ষ্যে আন্ডারপাস তিনটির দুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরা যাত্রীদের যান চলাচলের জন্য এবং অন্যটি ঢাকায় আসা যানবাহনের জন্য খোলা রাখা হয়েছে। যেহেতু আন্ডারপাসগুলো পুরোপুরি নির্মাণ হয়নি, তাই কিছুটা অসুবিধা হতে পারে যান চলাচলে। তবে বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি হবে না বলে আশা করেন করেন তিনি।

ঢাকা-টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক চারলেন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক অমিত কুমার চক্রবর্তী বলেন, বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচলের যে চিত্র দেখা যায়, তাতে ঈদে যানজট সৃষ্টির তেমন কোন শঙ্কা নেই। এছাড়া দুই-একদিনের মধ্যে মহাসড়কের ছোট খাটো সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে বলেও জানা তিনি।

বিবিএ তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজার সফটওয়্যার সিস্টেম সচল রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দায়িত্বরত প্রকৌশলীরা তাদের দায়িত্ব ২৪ ঘণ্টা পালন করেবেন। তাই ঈদে সেতুর পূর্ব প্রান্তে যানজট সৃষ্টির তেমন কোন আশঙ্কা নেই।
টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিমুল এহ্সান বলেন, ধীরগতির যান চলাচলের জন্য সড়ক তৈরিতে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং অধিগ্রহণকৃত জমিতে পিডিবির ইলেকট্রিক পিলার সরানোর কাজে দেরি হওয়ায় সড়ক নির্মাণের কাজের গতি বাড়ানো যাচ্ছে না। তবে মহাসড়কের তিনটি আন্ডারপাস খুলে দেওয়ায় যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা নেই।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, এবারের ঈদে মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য সড়কে নিয়োজিত থাকবে সাত শতাধিক পুলিশ। একইসঙ্গে আনসার সদস্যরাও কাজ করবে মহাসড়ককে যানজটমুক্ত রাখতে। এছাড়া অজ্ঞান পার্টি ও ছিনতাইকারীর হাত থেকে যাত্রীদের রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের ৪০টি ভ্রাম্যমাণ দল ও র‌্যাব কাজ করবে।

প্রস্তুত আরিচা-পাটুরিয়ায় ফেরি সেক্টর

আরিচা সংবাদদাতা জানান, দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ টি জেলার প্রবেশদ্বার পাটুরিয়া – দৌলতদিয়ায় ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিআইডবিøউটিসি ওই রুটে ১৮ টি ফেরি প্রস্তুত রেখেছে। এর মধ্যে ১০ টি রো রো, ১টি মিডিয়াম এবং ৭টি ইউটিলিটি ফেরি রয়েছে। আরো ১টি রো রো এবং ১টি কে-টাইপ ফেরি দু› একদিনের মধ্যে ফেরি বহরে যুক্ত হবে। পাটুরিয়া ৪টি ঘাট ও দৌলতদিয়া ৬টি ঘাটের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হবে বলে বিয়াইডবিøউটিসির ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম জানান। মোট ২০টি ফেরি ঈদ উপলক্ষে পারাপারে নিয়োজিত থাকবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments