প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গতিহীন আমলারা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সরকারের অংশ কিন্তু অনির্বাচিত- আমলারাই নীতিনির্ধারক। ঐতিহাসিকভাবে আমলারাই সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকেন।

বর্তমান বিশ্বে আমলাদের মাধ্যমেই বিভিন্ন দেশের সরকারের বিভিন্ন কর্মককাণ্ডের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়। একইভাবে বাংলাদেশেও আমলাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড।

এরমধ্যে দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার গঠনের পূর্বে দেয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন কাজও হচ্ছে আমলাদের মাধ্যমেই।

তবে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও আমলাদের বাস্তবায়ন বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে- দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি বিদ্যমান। বর্তমান সরকার গঠনের পূর্বে ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এজন্য সারা দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে আগামী পাঁচ বছর মেয়াদকালের মধ্যে ব্যবস্থা নিতেও চলতি বছরের শুরুতেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থিত মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

যে প্রতিশ্রুতি সর্বশেষ নির্বাচিত হওয়ার আগের ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে দিয়েছিলেন সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের আগামী পাঁচ বছরে করে দেখানোর কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তবে বিভিন্ন মহলে ইতোমধ্যে কানাঘুষা চলছে— সরকারের আগ্রহ থাকলেও আমলাদের ধীরগতির কারণেই সরকার গত সেশনে ক্ষমতায় থেকেও প্রতিশ্রুতির শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যদিও এবার ক্ষমতা গ্রহণের পরই আগামী পাঁচ বছর মেয়াদকালের মধ্যেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনা পাওয়ার পর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্টের মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সরকারি অফিস-আদালতে থাকা সকল শূন্যপদেও দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে সরকারি খাতেও প্রায় চার লাখ লোক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেলেও কার্যত এখনো দৃশ্যমান নয় সেই প্রক্রিয়া।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের শুরুতে (২৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থিত মন্ত্রীদের ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানো, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করাসহ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতি পরিবারে অন্তত একজন করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারি দপ্তরগুলোতে থাকা শূন্যপদ দ্রুত নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের নির্দেশও দেন তিনি। কার্যত দু-একটি সরকারি দপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়ার কথা জানা গেলেও বেশিরভাগ দপ্তরই এখনো রয়েছে উদ্যোগহীন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরে মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান (গত ৪ মার্চ) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে সরকারি দপ্তরসমূহে দ্রুত শূন্যপদ পূরণের সদয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একনেক

সভায় তিনি এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সানুগ্রহ অনুশাসন প্রদান করেন। সরকারি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোতে শূন্যপদে দ্রুত জনবল নিয়োগ দিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতেও বলেছেন মুখ্য সচিব।

মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে পাঠানো চিঠিতে লিখেছেন, অনবিলম্বে আপনার মন্ত্রণালয়/ বিভাগ ও আওতাধীন দপ্তর/সংস্থাসমূহে বিদ্যমান শূন্যপদের যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রণয়নের জন্য আপনার ব্যক্তিগত মনোযোগ আকর্ষণ করছি।

এসব শূন্যপদে কত দিনের মধ্যে জনবল নিয়োগ সম্ভব তার একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। বিদ্যমান শূন্যপদের তথ্য ও এসব শূন্যপদ পূরণের জন্য প্রণীত কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

তরুণ যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়াকে বর্তমান সরকার বিশেষ অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে তিনি চিঠিতে লিখেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলোর শূন্যপদে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের এ অঙ্গীকার অনেকটা পূরণ করা সম্ভব। এ জন্যই সময়াবদ্ধ ও সক্রিয় কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারের সকল শূন্যপদ পূরণের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর (গত ১০ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, সরকারের বিভিন্ন অফিস ও মন্ত্রণালয়ে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭৪৬টি সরকারি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে শূন্য রয়েছে তিন হাজার ৮৫৪টি পদ।

আর্থিকপ্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবিএম রুহুল আজাদের সভাপতিত্বে চলতি বছরের শুরুতেই রাষ্ট্রায়ত্ত সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদে দ্রুত লোক নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বৈঠকও হয়েছে।

ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্যপদের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৮৪টি।

এর মধ্যে শুধু ব্যাংকগুলোতেই শূন্যপদ রয়েছে ৪৩ হাজার ৬২৫টি। এসব শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ দিতে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশনা দিয়েছে আর্থিকপ্রতিষ্ঠান বিভাগ।

বৈঠকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ১৯৮৬ সাল হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত কৃষি ব্যাংকে অফিসার পদে কোনো লোক নিয়োগ হয়নি। ফলে ব্যাংকটিতে মধ্যবর্তী স্তরে কর্মকর্তার শূন্যতা সৃষ্টি হয়।

এই সমস্যা দূর করতে মধ্যবর্তী স্তরে সরাসরি নিয়োগের কথা বলেন তিনি। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনবল সংকট সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে। অগ্রণী ব্যাংকেও জনবল ঘাটতি রয়েছে।

দ্রুত এসব ব্যাংকের শূন্যপদ পূরণে মন্ত্রণালয় থেকে কর্মপরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বিধিমালার জন্য অনেক শূন্যপদ পূরণ করা যায় না।

অথচ এ বিধিমালা তৈরি করা খুব কঠিন কাজ না। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত বিধিমালা রাষ্ট্রপতি জারি করলেও যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যায়েই বিধিমালা তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগার কোনো কারণ নাই।

তিনি বলেন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিসিএস নিয়োগের জন্য সুপারিশ করলেও সংশ্লিষ্টদের পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগ দিতে এক বছরের বেশি সময় লাগে। যা মোটেই উচিত না। ২৭তম বিসিএসে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়েছিল মাত্র দুই মাসে।

সেই সময় দুই মাসে হলে এখন কেন এক বছরের বেশি সময় লাগবে। কারিগরি পদের বাইরে সাধারণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হয়। এই দলীয় পরিচয় খুঁজতে গিয়ে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। দ্রুত নিয়োগ দিতে চাইলে রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা বাদ দিতে হবে।

সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, আপাতত অগ্রগতি নেই, ঈদের পর জানতে পারেন।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments