প্রতিবছর বাড়ছে পাঁচ লাখ শিক্ষিত বেকার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা শেষে দেশে নতুন করে প্রতিবছর যুক্ত হচ্ছে সাড়ে ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ শিক্ষিত বেকার। যারা ১০ বছরের মাধ্যমিক ও দুই বছরের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে লেখাপড়া করেও সমাজে অনুৎপাদনশীল হয়ে দেশের অর্থনীতিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছেন না। বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি দেশে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। আর এ জন্য দেশের পুঁথিগত শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অন্যদিকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দাঁড়াবে ৮ কোটি ৪৮ লাখ দক্ষ শ্রমিকের। এই বিপুল সংখ্যক জনশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তোলাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৃত্তিমূলক জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। এতে করে বাস্তব জীবনে পুঁথিগত জ্ঞান কাজে আসে না। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে অষ্টম শ্রেণি শেষে বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর দাবি তাদের।

লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্য মতে, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি ১০ জন শিক্ষিত তরুণের তিনজন বেকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, বেকারদের মধ্যে চিকিৎসক প্রকৌশলীদের হার ১৪ দশমিক ২৭ তাংশ। নারী চিকিৎসক প্রকৌশলীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩১ শতাংশ। এরপরই আছেন উচ্চ মাধ্যমিক ডিগ্রিধারীরা। তাদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০টি সর্বাধিক বেকারত্বের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ।

এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, এ বছর কারিগরিতে পাসের হার বেড়েছে। ছয় বছর আগেও কারিগরি শিক্ষায় দেশের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১ শতাংশ লেখাপড়া করত। তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষার প্রতিও সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। বর্তমানে ১৭ শতাংশ হলেও আগামী ২০৩০ সালে তা ৩০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে স্কুল ও মাদ্রাসায় ২টি ট্রেড কোর্স চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত দেশের আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি), মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৭ হাজার ২৮৬ জন। ১০টি বোর্ডের অধীনে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন। আর ফেল করেছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৭ জন। এ হিসাবে দেখা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করা শিক্ষার্থীর মধ্যে সিংহভাগ ঝরে পড়ে। আর পাস করা শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি অংশ পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন কারণে উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কোনো কলেজে ভর্তি হয় না। এই পরিসংখ্যানে এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসির পরপর উচ্চশিক্ষায় আর যুক্ত থাকে না।

আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এইচএসসির পর কয়েক বছর বেকার থাকার পর ‘ছাত্র’ ভিসায় কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমায়। তবে তারা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ায় নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ ছাড়া অদক্ষ শ্রমিক হওয়ায় দেশ অধিক হারে রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্যক্রম পুঁথিগত বিদ্যানির্ভর। আর এ কারণেই ঝরে পড়া ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পাওয়ারা দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারে না। বরং বেকার হয়ে দেশে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা ও পরবর্তী ধাপে কর্মমুখী শিক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষায় ভালো ফোকাস দিয়েছে। তবে তা অপ্রতুল। সরকারের পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে সন্তানকে বিএ, এমএ পাস করাতে হবে। কিন্তু দেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। তবে শিক্ষা বাজেটে সবচেয়ে কম বরাদ্দ বৃত্তিমূলক শিক্ষায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক সংকটসহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় জনশক্তি দেশে ও দেশের বাইরে অদক্ষ হয়ে থাকছে। এরা দেশের জন্য শিক্ষিত বেকার হিসেবে বোঝা বাড়াচ্ছে বলে তিনি জানান।

আস/এসআইসু

Facebook Comments