পুলিশের তদন্ত নিয়ে যত প্রশ্ন

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশের একমুখী আচরণ নানা রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্বামীকে বাঁচাতে ধারালো অস্ত্রধারী দুই সন্ত্রাসীর সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করা নারী নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে ঘিরেই চলছে পুলিশের তদন্ত। যে মোবাইল ফোনের কাহিনি বানিয়ে পুলিশ মিন্নিকে দায়ী করার চেষ্টা করছে, সেই মোবাইল বা মোবাইলের মালিক হেলাল হেফাজতে না এলেও পুলিশ বলছে তাদের তদন্ত শেষ পর্যায়ে। এজাহারভুক্ত চার আসামি এখনো পলাতক। আর ঘটনার অনেক প্রত্যক্ষদর্শীকে সাক্ষী না করায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের কেউই প্রত্যক্ষদর্শী নয়। এজাহার অনুযায়ী মিন্নিই একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী হলেও পুলিশ তাকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের তথ্যে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।

সূত্রের তথ্য, প্রথম যে ভিডিও ফুটেজটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি কার মোবাইল ফোন থেকে ধারণ করা এবং কে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসব প্রশ্নের জবাব না খুঁজে তড়িঘড়ি করে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে পুলিশ। বরগুনা পুলিশের এই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর গত সপ্তাহেই এ মামলা পিবিআই বা সিআইডিতে স্থানান্তরের দাবি তোলেন। তিনি বলেন, আসল অপরাধীদের আড়াল করতেই মিন্নিকে ফাঁসানো হচ্ছে। পুলিশের তদন্তে তিনি আস্থা রাখতে পারছেন না। পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলেছে, মিন্নিকে গ্রেফতারের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এ ছাড়া মিন্নির রিমান্ড চলাকালে সংবাদ সম্মেলনে বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন মিন্নিকে দায়ী করে যে বক্তব্য দেন তাতেও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

তাকে কোপানোর ঘটনার একটি ডিভিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তা দেশব্যাপী আলোচিত হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, রিফাতের স্ত্রী মিন্নি স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এ ঘটনায় নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ মামলা করেন। ওই মামলায় মিন্নিসহ ১০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তবে ঘটনার ১৮ দিন পর দুলাল শরীফ ছেলের হত্যাকান্ডের জন্য পুত্রবধূকে দায়ী করে তার গ্রেফতার দাবি করেন। এরপর মিন্নিকে আসামি হিসেবে এ মামলায় গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, দুলাল শরীফের পরিবারে মিন্নির বিষয়ে সন্দেহ ঢুকিয়েছে পুলিশই। মিন্নিকে রিমান্ডে নিয়ে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও আদায় করা হয়। তবে মিন্নি তার আইনজীবীকে জানিয়েছেন, নির্যাতন চালিয়ে তার কাছ থেকে এ জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। এ জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদনও করেছেন তিনি। এর মধ্যে গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মামলার ১ নম্বর আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড নিহত হয়েছেন। এদিকে নয়ন বন্ডের মা সাহিদা বেগম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, প্রভাবশালীদের বাঁচাতেই তার ছেলেকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে গত বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বরগুনা সদর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। দুই সপ্তাহের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারব।

সাক্ষী নেই প্রত্যক্ষদর্শীরা : রিফাত হত্যা মামলার এজাহারে ১০ সাক্ষীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মিন্নি ছাড়াও রিফাতের দুই চাচা ও গ্যাং গ্রুপের হোতা মঞ্জুরুল আলম জনসহ আরও নয়জনের নাম আছে, যারা কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তাদের বেশির ভাগের বাড়ি শহরের বাইরে লবণগোলা গ্রামে। নিহত রিফাতের বাড়িও ওই একই গ্রামে। আর মঞ্জুরুল আলম জন স্থানীয় সংসদ সদস্যের পুত্র সুনাম দেবনাথের ঘনিষ্ঠ। জানা গেছে, দ্বিতীয় দফায় রিফাত শরীফ মোটরসাইকেলে চড়ে যখন ঘটনাস্থলে আসেন, তখন তার পেছনে বসা ছিলেন মনির নামের এক যুবক। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, ওই যুবক মোটরসাইকেল থেকে নেমে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর রিফাতের ওপর হামলা হয়। মনিরকে এখনো সাক্ষী করা হয়নি বা তার কোনো জবানবন্দি নেয়নি পুলিশ। অন্যদিকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, মিন্নির সঙ্গে এক তরুণ হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করেন। নূরুল ইসলাম রনি নামের ওই তরুণ বরগুনা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ও জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। পুলিশ তার বক্তব্য নিলেও তাকে সাক্ষী করা হয়েছে কিনা, এখনো জানেন না রনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ নিজেদের প্রয়োজনমতো সাক্ষী বানাচ্ছে। চার্জশিটে পুলিশ তদন্তের নামে মিন্নির চরিত্রহননই করবে বলে আশঙ্কা স্থানীয় বিশিষ্ট নাগরিকদের।

জবানবন্দিই পুলিশের ভরসা : রিফাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জন আসামি গ্রেফতারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত সাতজন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার হওয়া আটজন রয়েছেন। বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন দাবি করেছেন, অন্য আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে মিন্নিও জড়িত বলে জানিয়েছেন। মিন্নির জবানবন্দিতেও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, যার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। সব আসামি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। এ বিষয়ে মিন্নির আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী আসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আসামির যতই জবানবন্দি থাকুক না কেন, প্রত্যক্ষ সাক্ষীর জবানবন্দি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ। এটি আলোচিত মামলা, তাই এর তদন্তে সব প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার।

পুলিশ মাদক ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছে : রিফাত শরীফ হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশ মাদক ইস্যু এড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ মামলায় যারা আসামি ও যে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, তারা সবাই মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত বলে লোকমুখে প্রচার রয়েছে। এ কারণে হত্যাকান্ডের পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে মাদক। এ ছাড়া অন্য কারণও থাকতে পারে। তবে আমরা দেখছি পুলিশ মাদক ইস্যুকে বাদ দিয়ে তদন্ত করছে। যেটা মোটেও ঠিক নয়। জানতে চাইলে বরগুনা প্রেস ক্লাব সভাপতি চিত্তরঞ্জন শীল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যে তরুণ মারা গেছে এবং যারা আসামি তারা সবাই একই গ্রুপের সদস্য ছিল। মাদক, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে এদের বিরুদ্ধে। তবে পুলিশ কেন মাদকের বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি না। আমি মনে করি হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশকে তদন্তে সব বিষয়ই আমলে নিতে হবে।

মিন্নির জামিন শুনানি আজ : বরগুনা প্রতিনিধি জানান, আজ মঙ্গলবার বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হবে। এর আগে ২৩ জুলাই জামিন আবেদন দাখিলের পর বিচারক আবেদনটি গ্রহণ করে শুনানির জন্য আজকের দিন ঠিক করেন। গত ১৬ জুলাই রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও আসামি শনাক্তকরণের কথা বলে পুলিশ বাসা থেকে তাকে পুলিশ লাইনসে নিয়ে আসে। ১১ ঘণ্টারও বেশি সময় পর ওইদিন রাত ১০টার দিকে পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান, রিফাত শরীফ হত্যার সঙ্গে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরদিন মিন্নিকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করে মিন্নির ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। তবে মিন্নি তার আইনজীবীকে জানিয়েছেন, নির্যাতন করে পুলিশ এ জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে। এরপর ২১ জুলাই মিন্নির জামিন আবেদন করা হলে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক তা নামঞ্জুর করেন। আজ মিন্নির পক্ষে জামিন শুনানিতে তার আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলামকে সহায়তা করতে আইন ও সালিস কেন্দ্র, ব্লাস্ট ও ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতিসহ মোট ২০ জন আইনজীবী অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments