পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে দুই সিটির ল্যান্ডফিল

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ময়লা-আবর্জনা ফেলার মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ভরাট। গতকাল যাত্রাবাড়ীর মৃধাবাড়ী এলাকায় ময়লার স্তূপ-সুমন আহমেদ সানি
ঢাকায় মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গত ২০ বছরে দ্বিগুণ হারে বেড়েছে বর্জ্যের পরিমাণ। এতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) ৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে।

যা বছরে দুই সিটিতে ২২ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্যের পাহাড় হচ্ছে। এতো বর্জ্য কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে না। বর্জ্য ফেলার জন্য সংস্থা দুটির নিজস্ব জায়গা আমিনবাজার ও মাতুয়াইল প্রায় ভরে গেছে। এ নিয়ে খোদ ডিএনসিসি-ডিএসসিসি চরম বিপাকে পড়েছে।

জানা যায়, ১৯৯০ সালে তৎকালীন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) থাকায় মাতুয়াইলে ৫০ একর জমির ওপর ল্যান্ডফিল গড়ে উঠে। ২০০৫-৬ অর্থবছরে আরও ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ১০০ একরে সম্প্রসারণ করা হয়। পরবর্তীতে রাজধানীতে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) বিভক্ত হয়।

জাতীয় সংসদে আইন করে আগের সিটি কর্পোরেশন বিলুপ্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) করা হয়। এতে উত্তর সিটির জন্য আমিনবাজারে আরও ৫১.৪৮ একর জমিতে ল্যান্ডফিলের জায়গা অধিগ্রহণ করে সরকার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে প্রায় ৩০ ফিট পাহাড়সম বর্জ্যের স্তূপ। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা বর্জ্যবাহী গাড়িতে এনে ল্যান্ডফিল স্টেশনে ফেলা হয়।

এরপর ৫০-৬০ জন নারী-শিশু ল্যান্ডফিলে আনা বর্জ্যে প্লাস্টিকের বোতলসহ নানা জিনিসপত্র সংগ্রহ করছে। পরে স্কেভেটর ও বুলডোজার দিয়ে বর্জ্য লণ্ডভণ্ড করে দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু যারা ময়লার ভেতর কাজ করছেন তাদের জন্য নেই গ্লাভস, মাস্ক, বুটজুতা বা হেলমেটের ব্যবস্থা।

এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসাবাড়ির সংগ্রহ করা ময়লা-আবর্জনা থেকে মারাত্মক সব রোগ হয়। তারা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, টিটেনাস এবং এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। হতে পারে তাদের পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ। এছাড়া নাক-মুখ সুরক্ষিত না থাকায় নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহের ভেতরে ঢুকছে মারাত্মক সব জীবাণু।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ১২ বছর ধরে ময়লার ভেতরে থাকা জিনিসপত্র খুঁজছেন আব্দুর রাজ্জাক। এখন তার ময়লার দুর্গন্ধ সহ্য হয়ে গেছে। তবে তার ১৭ বছরের ছেলে মতলুব ৩ বছর কাজ করে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টে ভুগছে।

শুধু মতলুব নয় তার মতো অনেক ছেলেমেয়ে ল্যান্ডফিলে ময়লার ভেতর নানা জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে এসে মারাত্মক রোগে ভুগছেন। আর যারা এখনো কাজ করছেন তারাও রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। বর্জ্যের গন্ধে নিজেদের মানিয়ে নিতে তারা ড্যান্ডিসহ নানা রকম নেশায় জড়িয়ে পড়ে।

ময়লার ভেতরে প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করতে আসা আব্দুর রাজ্জাক আমার সংবাদকে বলেন, প্রতিদিন সকাল ৬টায় ল্যান্ডফিলে উপস্থিত থাকি। কারণ সকালে যেসব বর্জ্যবাহী গাড়ি আসে সেগুলোতে প্লাস্টিকের বোতল বেশি পাওয়া যায়। এজন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত কাজের মধ্যেই থাকতে হয়। তবে সিটি কর্পোরেশন থেকে কোনো গ্লাভস, মাস্ক ও বুটজুতা দেয়া হয়নি। খালি হাত ও পায়ে ময়লার ভেতরে থাকা জিনিসপত্র সংগ্রহে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা এমএ শাহেদ আমার সংবাদকে বলেন, এখানে যারা ময়লা-আবর্জনার ভেতরে প্লাস্টিক খুঁজে তারা সিটি কর্পোরেশনের কোনো লোকজন নয়। বাইরে থেকে এসব টোকাই আসে। আর ডিএসসিসির ল্যান্ডফিলে স্কেভেটর ৬টি, বুলডোজার ২টি এবং ড্রেজার ৫টি আছে। এসব যন্ত্রপাতি দিয়েই বর্জ্যবাহী গাড়ির ময়লা স্তূপ করা হয়।

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। গ্লাভস, মাস্ক, বুট ও হেলমেটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র দেয়া হয়। কিন্তু তারা এসব পরিধান করে কাজে স্বস্তিবোধ করে না। এ নিয়ে শত চেষ্টা করেও পরিচ্ছন্নকর্মীদের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাওয়া নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বের কাতারেও পৌঁছার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু কিভাবে এগোচ্ছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। কারণ একটি দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী।

সেই রাজধানী ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। বর্জ্যের বিকল্প ব্যবহার শুরু না করলে ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর পরিণতি হবে। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ল্যান্ডফিলের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর সুযোগ নষ্ট হবে।

এছাড়া ল্যান্ডফিলের জন্য জমির পরিমাণ না বাড়িয়ে যদি বর্জ্যগুলোর সঠিক ব্যবহারের পরিকল্পনা নেয়া যেত তাহলে বর্জ্যই দেশের সম্পদে পরিণত হতো। কিন্তু সেই পরিকল্পনায় এগোনো ছাড়া বারবার ল্যান্ডফিলের জন্য জমি বাড়াতে থাকলে একসময় নগরবাসী মারাত্মক ঝুঁকির মুখ থেকে বের হতে শত চেষ্টা করেও লাভ হবে না।

সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ল্যান্ডফিল ভরাটের পথে এ নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করার চিন্তা রয়েছে। ইতোমধ্যে মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল নতুন করে বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য আরও ১৬২ একর জমি অধিগ্রহণ করার পরিকল্পনা চলছে। ডিএসসিসির ৮১ একর জমির মধ্যে ৫০ একর ল্যান্ডফিল ও ৩১ একর জায়গা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবহার করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণে বছরে প্রায় ১ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে ঢাকায় ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৩৪ বর্গমাইল আয়তনের এই শহরে প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। জনপ্রতি ৫৬০ গ্রাম বর্জ্য উৎপাদন করে।

এছাড়া বিশ্বের মধ্যে বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় ঢাকার অন্তর্ভুক্তি পিছিয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। কারণ রাজধানীতে উৎপাদিত বর্জ্যের ৮০ শতাংশ সংগ্রহ করতে পারে পরিচ্ছন্নকর্মীরা। বাকি বর্জ্য নানাভাবে বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মোহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন পরিবেশ বান্ধব ল্যান্ডফিল তৈরি করতে পারেনি। জনবসতি এলাকার বাইরে করা উচিত।

কিন্তু আমিনবাজারে জনবসতির কাছেই ল্যান্ডফিল করা হয়েছে। আর বর্জ্য থেকে নির্গত পানি মাটির নিচে চলে যাচ্ছে যা বুড়িগঙ্গা নদীতে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। ল্যান্ডফিল করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেখা যায় না।

ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মঞ্জুর হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে এখনো কিছু জায়গা ফাঁকা আছে। সেখানেই ময়লা ফেলা হচ্ছে। তবে এই ল্যান্ডফিলের আশপাশে ৮১ একর জমি ও অন্যত্র ১০০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রপোজল পাঠানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে আরও আধুনিক ল্যান্ডফিল করা হবে।

ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. জাহিদ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ময়লা-আবর্জনা ফেলার জায়গা থাকবে না। এজন্য নতুন করে ৮১ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা চলছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box