নিরাপত্তাহীন নুসরাত পরিবার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার পর এবার তার পরিবারের লোকজনকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে ঘাতক ও তাদের স্বজনরা। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার মামলার বিচার চলাকালে আদালতের এজলাস এবং আদালত চত্বরে আসামি ও তাদের স্বজনরা দফায় দফায় নুসরাতে ভাই এবং তাদের আইজীবীদের হুমকি দিয়েছে। এরপর থেকে নুসরাতের পরিবারের লোকজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ, আসামিদের স্বজনরা তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, তাদের পক্ষের সাক্ষীদের আদালতে যেতে বাধা দিতে পারে আসামিপক্ষের লোকজন। তাই তাদের এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা চান।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার মামলার হাজিরা দিতে আসামিদের পুলিশি হেফাজতে আদালতে তোলা হয়। এ সময় আদালত চত্বরে ও এজলাসের সামনে মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও তাদের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম খোকনকে হুমকি দেয় আসামিরা। তখন নুসরাত হত্যামামলায় চার্জশিটভুক্ত ১৬ আাসামিসহ গ্রেফতার হওয়া ২১ জনই মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ দাবি করে অ্যাডভোকেট খোকনকে গালিগালাজ করে এবং ‘ধর ধর’ বলে আসামিরা খোকনের ওপর চড়াও হয়। পরিস্থিতি বেসামাল হতে শুরু করলে আদালতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

আইনজীবীরা বিষয়টি আদালতকে জানালে বিচারক আদালতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেন পুলিশকে। পরে পিবিআই আদালতে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। আদালত চত্বরে আসামিদের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের পর এ ঘটনার নেপথ্যে কোনো শক্তি কাজ করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নিহত নুসরাতের বড় ভাই ও মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান এ বিষয়ে খোলা কাগজকে বলেন, আসামিরা আদালতে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার পরিবারকে আক্রমণ করে আসামিরা হুমকি দিচ্ছে। আমাদের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম খোকনকেও হুমকি দিচ্ছে। ঘটনার পর আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

এ জন্য নিরাপত্তা চাইলে ফেনীর এসপি আমাদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। নোমান অভিযোগ করেন, পুলিশ শুধু আমাদের নিরাপত্তা দিলেই হবে না, আমাদের পক্ষের সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, তাদেরও নিরাপত্তা দিতে হবে। সাক্ষীরা যেন আমাদের পক্ষে সাক্ষী দিতে আদালতে না যায় সে জন্য আসামিদের স্বজনরা সাক্ষীদেরও হুমকি দিচ্ছে।

এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আদালত চত্বরে বা এজলাসের সামনে বাদী ও তার আইনজীবীদের হুমকির বিষয়টি আদালতের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তারা বলছেন, নুসরাত হত্যামামলার আসামিরা খুবই প্রভাবশালী এটা সবাই জানে। আসামিরা যদি এজলাসের মধ্যে বাদীকে হুমকি দেয় তাহলে সে বিষয়টি আদালত আমলে নিতে পারেন এবং মামলার বাদীকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে পারেন। আর যদি আদালত চত্বরে বা আদালতের বাইরে অন্য কোথাও হুমকি দেয় তাহলে বাদী বিষয়টি আদালতকে জানালে আদালত পুলিশকে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। তা ছাড়া হুমকি দেওয়ার কারণে বাদী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নতুন করে আরও একটি মামলা করতে পারে এবং আদালত সেই মামলা আমলে নিয়ে তা তদন্তে নির্দেশ দিতে পারেন। একই সঙ্গে বাদীকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। তারা আরও বলেন কোনো সন্দেহ নেই, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। সরকার চায় এ মামলাটি দ্রুত শেষ করতে। আসামিরা বাদীকে হুমকি দেওয়ার একাধিক কারণ থাকতে পারে।

এর মধ্যে রয়েছে- মামলার সাক্ষীরা যাতে আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসে সেই ভয়ভীতি সৃষ্টি করার জন্য এ হুমকি দেওয়া হতে পারে। কেননা, সাক্ষীরা যদি আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসে তাহলে আসামিরা আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার পথ পাবে এবং মামলার কোনো ফল আসবে না। তা ছাড়া, মামলার সাক্ষী শুরু হলে এতে আরও অনেকের নাম চলে আসতে পারে এমন আশঙ্কায় এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা অপরাধীরা পর্দার আড়ালে থেকে কোনো কলকাঠি নাড়তে পারে। তাই বাদীকে হুমকির বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত করে দেখা যেতে পারে এর পেছনে আরও কেউ জড়িত আছে কি না।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী মনজিল মোরসেদ খোলা কাগজকে বলেন, আদালতে যদি আসামিরা বাদীকে হুমকি দেয় তাহলে প্রসিকিউশন পক্ষ আদালতে তাদের নিরাপত্তা চাইতে পারে। আর হুমকি দেওয়ার কারণে আরেকটি মামলাও হতে পারে। এসব মামলায় সব জায়গায় দেখা যায় প্রভাবশালী আসামিরা সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে আদালতে হাজির হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে যাতে মামলায় কোনো ফল না আসে। এটাই হচ্ছে তাদের একমাত্র পথ। এ জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। এ হুমকির সঙ্গে বাইরের কেউ আছে কি না, যারা বাদীদের ক্ষতি করতে পারে সে বিষয়টি প্রশাসনকে খতিয়ে দেখতে হবে।

মামলার রায় বিলম্ব হওয়ার কারণে আসামিরা বাদীপক্ষকে হুমকি দেওয়ার উৎসাহ পায় কি না, এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে এটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। স্বাভাবিকভাবে ক্রিমিনাল মামলার সাক্ষীর তারিখ এক মাস পর পর হয়, এটা হয়তো সাত দিন পর পর হতে পারে। নারায়গঞ্জের সাত খুনের মামলাসহ বেশি কিছু মামলার বিচার কিন্তু দ্রুত হয়েছে, আশা করি এটার বিচারও দ্রুত হবে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোর্তিময় বড়ুয়া বলেন, যদি আদালতের সামনে হুমকির ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে আদালতের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। যদি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় তাহলে সেটা আরেকটি সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি আপরাধ। সে ধারাটি আদালত আলাদাভাবে আমলে নিতে পারেন। বিচারক আসলে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারেন না। আদালতে আসামিদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এটা বাদীর প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ নয়, এটা মূল আদালতের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। এ আচরণ হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া চালানোর যে অধিকার আছে সেটাকে অস্বীকার করা। সুতরাং বিচারকের উচিত ছিল এটা বিবেচনায় নেওয়া। এটা চার্জগঠনের সময়ও সুযোগ আছে।

আদালতের বাইরেও তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তরা জন্য নুসরাতের পরিবার কি করতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা আদালতের কাছে আলাদাভাবে নিরাপত্তা চাইতে পারেন। যেহেতু বিষয়টি আদালতে চলে গেছে, সে ক্ষেত্রে আদালত যদি বলে দেন বাদীপক্ষকে আলাদা নিরাপত্তা দিতে, তাহলে পুলিশ প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে বাধ্য।

তিনি আরও বলেন, সবকিছু যে আদালত করবে এমন নয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিরাপত্তা সেল রয়েছে, সেখানে আবেদন করলে তাদেরও নিরাপত্তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। চার্জশিটে ওসি মোয়াজ্জেমের নাম না থাকায় নুসরাতের পরিবার অসন্তুষ্ট, সে ক্ষেত্রে মোয়াজ্জেমকে আসামি করার সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুযোগ আছে। সে ক্ষেত্রে এই চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি দিতে হবে এবং তাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করতে হবে।

বিচারে বিলম্ব হওয়ার কারণে আসামিরা বাদীদের হুমকি দেওয়ার উৎসাহ পায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন- কিছুটা পায়। কেননা একটি মামলা এখন যে রকম আলোচনায় আছে ১০-১৫ বছর পরে সে রকম তো আর আলোচনায় থাকে না। যে সুযোগটা কিছুটা হলেও আসামিরা পায়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box