নানা অনিয়মে ডুবছে ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চরম দূরাবস্থা বিরাজ করছে দেশের আর্থিক খাতে। ঋণের নামে অর্থ লোপাট, বিদেশে অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে ডুবতে বসেছে।

অনিয়মের কারণে ডুবে যাওয়া ফার্মার্স ব্যাংককে কোনমতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে নাম পরিবর্তন করে। অনিয়ম আর পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও ঋণের অনিয়মে ‍কিছুদিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে পিপলস লিজিং নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি। এই পরিস্থিতি আর্থিক খাতের দুরাবস্থার চিত্র বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ক্রিসেন্ট গ্রুপের নানা জাল-জালিয়াতি, অর্থপাচার ও আত্মসাতের ঘটনার পর ডুবছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির বোঝা বইছে সোনালী ব্যাংক। ঋণ জালিয়াতিতে এখনও বেহাল দশা বেসিকের। অগ্রণী, রূপালী ও বিডিবিএল এরও একই অবস্থা। এসব ব্যাংকে লাগামহীনভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। নানা সঙ্কটে মূলধনও খেয়ে ফেলছে। সব মিলিয়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

ক্রিসেন্ট ও অ্যাননটেক্স গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিতে কোণঠাসা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। এখন খেলাপি ঋণের ভারে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ জনতার।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির খেলাপি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৪৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এর মধ্যে ওই দুটি গ্রুপের ঋণই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি চার হাজার ৮৮৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর ফলে ব্যাংকটি বড় লোকসানে পড়বে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো চলছে নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও বেড়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একক কর্তৃত্বও নেই এসব ব্যাংকে। ফলে বাড়ছে নানা রকম জাল-জালিয়াতি, অর্থপাচার ও আত্মসাতের মতো ঘটনা। এতে নাজুক অবস্থায় পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। খারাপ অবস্থা থেকে এসব ব্যাংককে ফেরাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত করে সুশাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি ঋণ কেলেঙ্কারির নেপথ্যের নায়কদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। খেলাপি ঋণ বেড়েছে। প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ, মূলধন ঘাটতি ও লোকসানের কারণে নাজুক অবস্থায় পড়েছে এসব ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতের সেবা দেয়া নন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাল, হলুদ ও সবুজ তালিকাভুক্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে বর্তমানে খুব খারাপ অর্থাৎ লাল তালিকায় রয়েছে ১২টি প্রতিষ্ঠান। হলুদ তালিকায় রয়েছে ১৮টি প্রতিষ্ঠান। মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সবুজ বা সবচেয়ে ভালো তালিকায়।

রেড জোনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বিআইএফসি, পিপলস লিজিং, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, রাষ্ট্রায়ত্ত ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), প্রাইম ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, মাইডাস ফাইন্যান্সিং, জিএসপি ফাইন্যান্স ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স।

হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির বোঝা এখনও বাইছে সোনালী ব্যাংক। হলমার্কের কাছে সোনালী ব্যাংকেরই আটকে আছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকটির আর্থিক সূচকেরও উন্নতি নেই। ২০১৯ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির খেলাপি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৩৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। ফলে প্রতিষ্ঠানটির মন্দ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ বা প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আলোচিত সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি তিন হাজার ৩৪০ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

আরেক রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংক বেসিক ব্যাংকে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল, চার বছরে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে বেসিক ব্যাংক থেকে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লুট হয়। টাকার অঙ্কে দেশের ইতিহাসে এককভাবে এটাই সবচেয়ে বড় ঋণ কেলেঙ্কারি। ব্যাংকটির এ লুণ্ঠনে সরাসরি জড়িত ছিলেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু। তাকে সহায়তা করেন ওইসময়ের পরিচালনা পর্ষদ। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ব্যাংকটি। ২০১৯ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির খেলাপি দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৮০৪ কোটি ১২ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। খেলাপির চাপে ব্যাংকটি মূলধনও খেয়ে ফেলছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২৩৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দৈনিক জাগরণকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদই ঋণ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছে। উচ্চপর্যায়ের লোকরা যখন অনিয়ম করে তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। গ্রাহককে প্রলোভন দেখিয়ে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে, আবার ঋণ বিতরণে কোনও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে না। এতে ঋণ ফেরতও আসছে না। খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। নগদ অর্থ সঙ্কট তো রয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংক এখনও আলোচিত মুন গ্রুপ কেলেঙ্কারিসহ ঋণ বিতরণে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে আছে। ২০১৯ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির খেলাপি দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ১৪৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৫৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

নানা অনিয়মের কারণে বিতরণ করা ঋণ ফেরত আনতে পারছে না রূপালী ব্যাংক। ২০১৯ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকটির খেলাপি দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৩৮০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। আলোচিত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মন্দ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ বা প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে এক হাজার ৪৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ১৫৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম দৈনিক জাগরণকে জানান, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। এজন্য যা যা করা দরকার আইন অনুযায়ী তা-ই করা হচ্ছে আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারা যাতে বিপদে না পড়ে সে জন্য এসব প্রতিষ্ঠানে কঠোর নজর রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘নানা অনিয়মের কারণে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে ছিটকে পড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। সংস্থাটি বলছে, একসময় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য (আমদানি-রফতানি) সেবা প্রদানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকই ছিল চালকের আসনে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় এ স্থান দখলে নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ২০১৮ সালে দেশের মোট রফতানির মাত্র ৭ শতাংশ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে। বছরটিতে রফতানি বাণিজ্যের ৭৪ শতাংশই হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকের হাত ধরে।

আর্থিক খাতের এই দুরবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দৈনিক জাগরণকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নাজুক পরিস্থিতির মূল কারণ হলো, সুশাসনের অভাব। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, প্রভাবশালীদের চাপ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তো রয়েছে-ই। এছাড়া প্রভাবশালীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না। বিভিন্ন চাপের কারণে ব্যাংকগুলোরও কিছুই করার থাকে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এই দুর্নীতি দূর করতে হলে বড় প্রয়োজন সদিচ্ছা আর অপরাধীদের শাস্থির আওতায় নিয়ে আসা বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments