নতুন মেরুকরণের দিকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বর্তমানে দেশীয় রাজনীতিতে চরম বিপর্যস্ত অবস্থা পার করছে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী’ ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো। সরকারের রোষানল, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ, নেতৃত্বের দুর্বলতা, নেতাদের অনৈক্য, মামলা, হামলার পাশাপাশি দলের ভাঙ্গন বাংলাদেশি জাতীয়বাদ চর্চার রাজনৈতিক দলগুলোকে চরম অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এ থেকে উত্তরণে এ ধারার রাজনৈতিক ছোট ছোট দলগুলো নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে যার যার অবস্থান থেকে বর্তমান বৈরী সময় কাটিয়ে সুবিধাজনক সময়ে তারা বৃহত্তর মোর্চা বা জোট করে সরকার বিরোধী আন্দোলনের যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। বেশ কয়েকটি জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্ব শূন্যতার কথা প্রকাশ্যে জানালেন বিএনপি জোটের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ, বীরবিক্রম।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে জেলে থেকে আমাদের নির্দেশনা দেয়া সম্ভব নয়। তারেক রহমানের পক্ষে লন্ডন থেকে সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকাও সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদেরই সেই দায়িত্ব নিতে হবে এবং আমি সেই দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত।’

তিনি বলেন, ‘আমরা উদ্যোগ নিয়েছি, বিএনপিকে অনুরোধ করব, বিএনপি নেতাদের অনুরোধ করব; আপনারা নেতৃত্ব দেন, তা না হলে আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করুন। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বসে থাকলে চলবে না।

অলি বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিতে গিয়েও পারি নাই, এবার স্বৈরশাসকের হাতে জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। বিএনপির যারা আছেন, আপনারা নিজেদের মধ্যে কথা বলেন। কারা কারা আসবেন, আমাদের সাথে আসেন।’

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যর হাতে হত্যার শিকার হওয়ার পর জিয়ার এ দলের হাল ধরেন তার বিধবা স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দেশে অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসীন হন সেনাশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। গৃহবধূ খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরার পর দলের ঐক্য ধরে রাখার পাশাপাশি তাকে দীর্ঘদিন স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আন্দোলন করতে হয়। এক পর্যায়ে দীর্ঘ ৯ বছর আন্দোলনের পর ৯০ দশকের শেষের দিকে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ঘটে।

এরশাদের পতনের পর অপ্রত্যাশিতভাবে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের প্রথম নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনতে সক্ষম হন খালেদা জিয়া। এরপর আরও দু’বার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের দুর্বলতায় আর তার পারিষদদের দুর্নীতি ও মিথ্যা অহংবোধের কারণে ধীরে ধীরে বিএনপি জনবিচ্ছিন্নতায় দিকে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে দেশে আসে সেনা সমর্থিত সরকার। সেই সরকারের আমলে আটক হন সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তাদের নামে বেশ কিছু দুর্নীতির মামলাও দায়ের করে সেনাসমর্থিত সরকার।

এর প্রায় দুই বছর পর সেনাসমর্থিত সরকার ২০০৮ সালে দেশে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। সরকারে আসায় শেখ হাসিনার সকল মামলা একে একে বাতিল হয়ে গেলেও মামলা রয়ে যায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। এরপর দীর্ঘ দশ বছর আদালত থেকে আদালতে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে গেল বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়। সেদিন থেকে তিনি পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে দিন যাপন করছেন।

খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই গেল বছরের ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের নেতাদের নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন করে। নির্বাচনে এ জোট ভূমিধস পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। বারবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপি একাদশ নির্বাচনে মাত্র ৬টি ও শরিকদল দুটি মোট ৮টি আসন লাভ করে। আর এ নির্বাচনের পর থেকেই দেশীয় রাজনীতিতে বিএনপির ক্ষয়িঞ্চু শক্তি দৃশ্যমান হতে থাকে।

এছাড়া খালেদা জিয়ার কারাবাসের পর ধীরে ধীরে দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মধ্যে ক্ষয় ধরা শুরু করে। ভাঙ্গতে শুরু করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটগুলোও। সর্বশেষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিশদলীয় জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিও (বিজেপি) জোট ছেড়ে চলে যায়।

সম্প্রতি দৈনিক জাগরণের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতিকের সঙ্গে আলাপ করা হয়। আলাপে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দেশের রাজনীতির বর্তমান যে ধারা চলছে, তাতে সামনে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে আরও কঠিন বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে নানা চড়াই উৎরাই। কথা হচ্ছে-আমরা যারা জাতীয়বাদী আদর্শের অনুসারী তারা এ বিপর্যয় কতটা দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করতে পারব, তার উপর নির্ভর করছে আগামীতে এদেশে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আদৌ থাকবে কি থাকবে না।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিশদল থেকে বের হয়ে যাওয়া এক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে দৈনিক জাগরণকে বলেন, ‘আমার আশঙ্কা আসন্ন রোজার ঈদের পর প্রথম বিপর্যয় আসছে বিএনপির উপর। ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপির সিনিয়র ও প্রভাবশালী নেতাদের সরকারের বিভিন্ন মহল ও বিভিন্ন এজেন্সির উচ্চ পদস্থ লোকদের সঙ্গে যোগাযোগে আশঙ্কা করছি খুব শিগগিরই বিএনপিতে ভাঙন আসছে। সেটা কিভাবে তা আমি বলতে পারব না। তবে গেল কিছুদিন এ আশঙ্কার বিষয়ে অনেক প্রমাণের সাক্ষী হিসেবে আমি অনেক কিছু প্রত্যক্ষ করেছি।

তিনি আরও বলেন, বিএনপির ভাঙ্গনে আমাদের সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিএনপি ভাঙার পর দেশে অপরাপর যে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের উপরও আঘাত আসা অবশ্যাম্ভী। তাই সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে, তা যতই ক্ষুদ্র শক্তি হোক, সেখান থেকেই নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে।

অপর এক নেতা জানান, নিঃসন্দেহে বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতির বাতিঘর। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের মতো ছোট ছোট শক্তির দলগুলো কেন বিএনপিরই টিকে থাকা দুষ্কর! তাই আমরা আমাদের যার যার অবস্থান থেকে বেশকিছু তরুণ রাজনীতিক নিজেদের মতো করে যোগাযোগ রাখছি। মাঝে মাঝে আলাপ-আলোচনাও করছি। সময় নিচ্ছি। আগামী দুই, তিন বা পাঁচ বছর পরই যে আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু বর্তমান সরকারের আগ্রাসী রাজনীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। না হলে দেশের জন্যই অমঙ্গল বয়ে আনবে।

তিনি দৈনিক জাগরণকে জানান, সম্প্রতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ তার দল বিজেপি নিয়ে বিএনপি জোট থেকে বের হয়ে গেছেন। এখানে ম্যাসেজ খুব ক্লিয়ার। তিনি ক্ষমতাসীন জোটে যাবেন না। তিনি নিজের অঞ্চলে তার দলকে সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিচিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। সাংগঠনিকভাবে ওই অঞ্চলে বিজেপির ভিত শক্ত করার চেষ্টা করবেন। আমরা যারা আছি তারাও যার যার অঞ্চলে আমাদের দলকে সাংগঠনিক একটি শক্ত কাঠামোর উপর দাঁড় করাতে প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছি। এক সময় আমরা সম্মিলিতভাবে এসব শক্তি একত্রিত হয়ে দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন ও সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে রাজপথে আন্দোলনে নামব ইনশাল্লাহ।

বিএনপি জোট থেকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আগে বের হওয়া বর্তমানে যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি দৈনিক জাগরণকে বলেন, আমরা যারা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করি বর্তমান সময়টা তাদের জন্য অত্যন্ত বৈরী তা মানতেই হবে। তবে জেল, জুলুম, মামলার ভয়ে তো বসে থাকলে চলবে না। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে।

জেবেল গাণি আরও বলেন, আমরা ছোট ছোট দলগুলো নিজেদের অঞ্চলে আমাদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে মনযোগী হয়েছি। সময় লাগুক। একটা পর্যায়ে আমরা এসব শক্তি ঐক্যবদ্ধ ও একত্রিত হয়ে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বো। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments