নজর কাড়তে পারছেন না শিক্ষকরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

তৃতীয় ধাপে বাদ পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ফুটপাতে দীর্ঘ ৩৮ দিন যাবত অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। ছবিটি গতকাল তোলা- এম খোকন সিকদার
জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে টানা ৩৮ দিন ধরে আন্দোলন করছেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। গত ২০ দিন ধরে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন তারা। কিন্তু কোনোভাবেই সরকারের সংশ্লিষ্টদের নজর কাড়তে পারেননি শিক্ষকরা।

তাই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আশায় দিন গুনছেন জাতীয়করণ বঞ্চিত ৪ হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাদের প্রত্যাশা, বিদেশ সফরে থাকা প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেই কোনো একটা সমাধান দেবেন। তিনি দেশে আসা পর্যন্ত এভাবেই আন্দোলন চলবে।

এদিকে টানা ৩৮ দিনের আন্দোলনে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ২৫১ জন শিক্ষক। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ জন। আর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন শিক্ষক। শিক্ষকরা জানান, জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে এ আন্দোলন চলছে।

কিন্তু সব সময়ই মিলেছে আশ্বাস। গত বছরও টানা ১৮ দিন অনশন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। দাবি আদায় না হওয়ায় চলতি বছরের ১৬ জুন থেকে ফের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা।

তারপর প্রতীকী অনশন ও অনশন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। এতে সরকারের নজর কাড়তে ব্যর্থ হয়ে চলতি মাসের ৩ তারিখ থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন তারা।

রাজপথের কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন শিক্ষকরা। বৈঠক করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেনের সাথে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।

উপরন্তু ডেঙ্গুজ্বরসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে অসুস্থের তালিকা। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত থাকলেও সমাজে আমরা অবহেলিত। নিজেদের মনে হয় দেশের বোঝা।

খেয়ে না খেয়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এখানে পড়ে থাকলেও কেউ আমাদের কথা শোনার প্রয়োজন মনে করছেন না। বারবার আমাদের অসহায়ত্বের কথা বোঝাতে চেয়েছি। প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের ভূমিকা কী তাও তুলে ধরেছি। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা আমাদের দিকে নজরই দিচ্ছেন না।

জানা যায়, ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দেন।

শিক্ষকদের দাবি, জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়গুলোর যথাযথ পরিসংখ্যান না হওয়ায় জাতীয়করণ যোগ্য আরও ৪ হাজার ১৫৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হয়।

জাতীয়করণকালীন পাঠদানের অনুমতি ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, ছাত্র-ছাত্রীরাও উপবৃত্তি, টিফিন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ জন্য জাতীয়করণের এক দফা দাবিতে বারবার মাঠে নেমেছেন তারা।

এর আগে সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়ে জাতির পিতার মত আরও একটি ইতিহাস রচনা করেছেন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, জাতীয়করণের সমস্ত যোগ্যতা থাকার পরও কিছু সংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কর্মরত শিক্ষকগণ জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হয়।

তৃতীয় ধাপের বিদ্যালয়সমূহের ক্ষেত্রে ২০১২ সালের ২ মে-র পূর্বে স্থাপিত ও পাঠদানের অনুমতির জন্য আবেদনকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় উল্লিখিত তৃতীয় ধাপের বিদ্যালয়গুলোর সমপর্যায়ের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন কিছু কর্মকর্তা কর্মস্থলে না থাকায়, সকল শর্ত পূরণ করার পরও বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

শিক্ষকরা বলছেন, জাতীয়করণকালীন পাঠদানের অনুমতি ও রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করায় আমরা বেতন-ভাতা সুবিধা ও ছাত্র-ছাত্রী উপবৃত্তি, টিফিন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের দাবিকৃত বিদ্যালয়সমূহ ধারাবাহিকভাবে ২০০৯-২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছে।

এছাড়া ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের তালিকার বাইরে পার্বত্য অঞ্চলের ইউএনডিপি পরিচালিত ২১০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বিবেচনায় জাতীয়করণ করেন। তারা বলেন, আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন।

কোনো প্রকার সহিংসতা বা কারো প্ররোচনায় নয়। আমরা বছরের পর বছর বিনা বেতনে বিদ্যালয়সমূহে কর্মরত থেকে এদেশের শিশুদের পাঠদান করিয়ে আসছি। আমাদের অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যে চাকরির বয়সসীমা হারিয়েছে।

বিদ্যালয়সমূহে কর্মরত অধিকাংশ শিক্ষকের অন্যত্র চাকরির আবেদনের বয়স সীমা নেই। এতে আমরা সংসার জীবনে চরম সংকটের মুখে পড়েছি।

তারা আরও বলেন, এ অবস্থা থেকে কেবল আমরা মানবতার জননী, উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের ১ লাখ ৪ হাজার ৭৭২ জন শিক্ষকের মুখে অন্য তুলে দেন, যিনি ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে বুকে টেনে নিয়ে মায়ের মমতায় আশ্রয় দেন, যিনি নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন, তার মাধ্যমেই উত্তরণ পেতে পারি।

আবদুল আহাদ নামের একজন শিক্ষক বলেন, প্রায় দেড় মাস হতে চললো প্রেস ক্লাবের রাস্তায় পড়ে আছি। কেউ আমাদের খবর নেয় না।

সবাই যেনো অন্ধ হয়ে গেছে। অথবা দেখেও না দেখার ভান করছে। নিজের ভাগ্যকে গালি দিয়ে হোসেন আলি নামের একজন শিক্ষক বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবার দয়া না করলে আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকবে না। তাই তিনি দেশে ফিরে কি সিদ্ধান্ত নেন তার অপেক্ষায় আছি।

বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো. কামাল হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত ১৫১ জন শিক্ষক অসুস্থ হয়েছেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১১ জন। আন্দোলনে অংশ নেয়া একজন শিক্ষক মারাও গেছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে রয়েছেন। তিনি দেশে এসেই আমাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। এখন শুধু তার জন্যই অপেক্ষা করছি।

শিক্ষকদের এত আকুতি সত্ত্বেও বিষয়টি নিয়ে অনেকটা নীরব রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা।

তবে এর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন আমার সংবাদকে বলেছিলেন, জাতীয়করণ থেকে বঞ্চিত হওয়া বিদ্যালয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়।

সর্বশেষ ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করার পর আইনি জটিলতাসহ অন্য কারণে সর্বসাকূল্যে ১০০ স্কুল জাতীয়করণের বাইরে থাকতে পারে। শিক্ষকরা যে সংখ্যার কথা বলছেন তা ঠিক নয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments