নগর জুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ আতঙ্ক

আলোকিত সকাল ডেস্ক

প্রচন্ড জ্বর ও শরীর ব্যথা নিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তা উজ্জ্বল আহমেদ (৩৫)। এই জ্বর নিয়ে তার পুরো পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত। রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে এমনটাই বলেছেন চিকিৎসকরা। তবে শুরুতেই হাসপাতালে ভর্তি করায় তিনি এখন বিপদমুক্ত। উজ্জ্বল আহমেদের পরিবারের মতো নগরবাসী ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্কে ভুগছেন।

অন্যদিকে এ বছর ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। তবে ডেঙ্গুতে আরও অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। ডেঙ্গু জ্বরে মারা গেলেও সরকারি তালিকায় আসছে না এমন অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গুর ধরনটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উদ্বেগজনক। অনেকের প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে, সবাই শকে চলে যাচ্ছে। আগে সামান্য ডেঙ্গু হয়েই ভালো হয়ে যেত। এবার সবারই রক্ত লাগছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বর হলে গাফিলতি না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঢাকার আশপাশেও ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। ঢাকার বাইরে অন্তত চারটি জেলায় ডেঙ্গু জ্বরের রোগী শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

সরকারি হিসাবে, মে মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৮৪ জন। জুন মাসে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৭৭০। আর এ মাসের প্রথম ১৮ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৬১। এ বছর মোট আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ৫৪৬ জন। গতকাল ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল ১ হাজার ৩০০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন পাঁচজন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নমুনা রোগতত্ত¡ বিভাগ সংগ্রহ করেছে, পরীক্ষা শেষে তাদের মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু হলে এই সংখ্যা বাড়তে পারে। ২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। সরকারি হিসাবে ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়েছিল আর মারা গিয়েছিল ৯৩ জন। এরপর ডেঙ্গু জ্বরে মৃতের সংখ্যা কমতে থাকে। গত বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মারা গিয়েছিল ২৬ জন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চোখ রাখলেই ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেটের জন্য রক্ত চেয়ে সহযোগিতার স্ট্যাটাসের সংখ্যা দেখলে সহজেই অনুমান করা যায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে রাজধানীর বেশ কিছু নামিদামি স্কুলের শিক্ষার্থীদের কেউ অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি কিংবা সিক বেডে পরীক্ষা দিয়েছে বলে নিশ্চিত খবর পাওয়া গেছে।

রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় সমালোচনার মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। শুক্রবার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতে এক শোভাযাত্রার শুরুতে মেয়র বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুটি বিভাগের কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া যতদিন নিয়ন্ত্রণে না আসবে, মৌসুম যতদিন থাকবে এ আদেশ ততদিন বলবৎ থাকবে। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং নিজ নিজ বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার রাখতে সবার প্রতি আহŸান জানান মেয়র।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাংসদ আসলামুল হক, সাদেক খান, সাবেক ক্রিকেটার আকরাম খান, ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজ, চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস, রিয়াজ, অরুণা বিশ্বাস, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর, রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে ২৯ এপ্রিল বিআরবি হাসপাতালে ৫৩ বছর বয়সি এক ব্যক্তি এবং আজগর আলী হাসপাতালে ৩২ বছর বয়সি এক যুবকের মৃত্যু হয় ডেঙ্গুতে। এরপর ১৬ জুন অ্যাপোলো হাসপাতালে মারা যায় ১১ বছরের এক শিশু, ২৯ জুন ইবনে সিনা হাসপাতালে ৪২ বছর বয়সি এক ব্যক্তি এবং ৩ জুলাই স্কয়ার হাসপাতালে ৪২ বছর বয়সি একজন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়। তবে বুধবার পর্যন্ত ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ১৯ জনের মৃত্যুর খবর মেলে। এর মধ্যে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজন, মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে দুজন, স্কয়ার হাসপাতালে তিনজন, ল্যাবএইড হাসপাতালে একজন এবং পুরান ঢাকার সালাহউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

১৫ জুলাই স্কয়ার হাসপাতালে মারা গেছে লাবণ্য আলিনা কাজী নামে চার বছরের এক শিশু। আলিনার বাবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মোহাম্মদ কাজী ফয়সাল জানান, ১০ জুলাই আলিনাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডেঙ্গুর কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়।

পাঁচদিন ধরে জ্বরে ভুগছিল ১৪ বছরের কিশোর সুমন হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে বাবা-মা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে চিকিৎসকরা তাকে ডেঙ্গু চিকিৎসা অনুযায়ী স্যালাইন দেন। এখন সুস্থ হয়ে উঠছে ছেলেটি। ডেঙ্গু আক্রান্তদের রক্তে প্লাটিলেট কমলেও তারটা ঠিকই ছিল। কিন্তু পরীক্ষায় তারও ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এবার ডেঙ্গুতে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়েছে। এটা খুবই বিরল। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পরেও অনেকে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. টিটু মিয়া বলেন, এবার ডেঙ্গু মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, যকৃত ও কিডনির মতো নানা অঙ্গ আক্রান্ত করছে। খারাপ অবস্থায় হাসপাতালে আসা অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এবারের ডেঙ্গুর ধরনটা ভিন্ন এবং উদ্বেজনক।

আস/এসআইসু

Facebook Comments