নকল মাস্ক সরবরাহে জড়িত দুর্নীতিবাজ জানোয়ারদের কঠিন শাস্তি চাই

51

করোনার অভিশাপে বিপন্ন মানুষের এমন ভয়ংকর মৃত্যু যন্ত্রণার মুখেও দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য বিভাগ নকল মাস্ক সরবরাহ করে নির্লজ্জ দুর্নীতি ও জালিয়াতি করলো! এরা মানুষ না হিংস্র জানোয়ার? চিকিৎসকদলকেই নয়, যুদ্ধের করোনারোগীর সেবায় যেখানে এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহারের বিকল্প নাই সেখানে নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে অনেককে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিতে ফেলছে?

কত বর্বর অমানবিক চরম লোভী হলেই এই সময়ে এমন দুর্নীতি করে অবৈধ অর্থের নেশায়! একদিনে তদন্ত করে এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত হিংস্র জানোয়ারদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দরকার। কুষ্ঠিয়া সরকারি হাসপাতালে পাঠানো মাস্কের কার্টুনে ‘এন-৯৫’ ব্রান্ড লেখা থাকলেও ভিতরে নাকি সস্তা গেন্জির কাপড়ের নকল মাস্ক পেয়ে ব্যবহার না করে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ সংবাদ পড়ে অসহায় মনের রাগ যন্ত্রণায় ইচ্ছে হচ্ছিলো নিজের গায়ের চামড়া খুলে ফেলি! এতো অন্ধ হিংস্র লোভ এদের!

এন-৯৫ মাস্কতো বাহির থেকে এসেছিলো। এটা আমেরিকান মানের। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইওয়ানসহ ৩০ দেশে মিলে। দুর্নীতিবাজরা মনে করেছিলো চিকিৎসকরা চিনবে না। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যে সব হাতের মুঠোয় এটা বুঝেনি। এতদিন জার্মান স্টিকারে চাইনিজ মেশিন সরবরাহ করে লুটেছে,তাই লোকাল তৈরি করে নকল মাস্কের প্যাকেটে এন-৯৫ স্টিকার লাগিয়ে মৃত্যু দুয়ারে রেখে লোভটা করেছে। এন-৯৫ কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি হয়। গেন্জির কাপড়ে নয়।

বুঝি না এতো বছর স্বাস্থ্য খাতে অবাধ লুটপাটেও তাদের রাক্ষুসে ক্ষিধে মিটেনি? ভয়ংকর করোনাভাইরাসের মুখে যখন বঙ্গবন্ধু কন্যা জাতিকে সাহস দিয়ে নেতৃত্বের দক্ষতায় মানবিক শক্তিতে জাগিয়ে তুলছেন, গোটা পৃথিবীর সাথে দেশ যেখানে কঠিন দুঃসময়ের মুখে ঐক্যবদ্ধ তখন এমন দানবদের বিশ্বাসঘাতকতা?বঙ্গবন্ধু কন্যাকে কি নিজে মাস্ক পিপিইর অর্ডার ও তা দেখে সরবরাহ করতে হবে? এতো রাবন চারদিকে?

গত ক’দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের প্রভাবশালীদের সন্তান, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম জড়িয়ে খবর ভেসে বেড়াচ্ছিলো যে তারা রাজ্জাকের জেএমআই গ্রুপ থেকে সস্তা নকল মাস্ক সরবরাহ করে মুনাফা লুটছেন। তখন এটার গুরুত্বই দেইনি। ভেবেছি গুজব। আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা। আরেকটি দল আছে গুজব বুঝে অবাধ লুন্ঠন বুঝে না! কিন্তু বিভিন্ন হাসপাতাল যখন নকল বলে ফেরত দিচ্ছে এবং বিতর্ক উঠেছে তখন এই সংকটে সিরিয়াসলি নিতে হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা:আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ভুল করে জেএমআই এন-৯৫ প্যাকেটে সরবরাহ করেছে! অসহ্য লাগছে চতুর মিথ্যুক এ লোকটিকে। জেএমআইকে কাজ পেতে কারা ভূমিকা রেখেছে? ৭০ ভাগ সরবরাহ তারা করে। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর প্রথমে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অভিযোগ আমলে নেয়নি। পরে গোয়েন্দা সংস্হার রিপোর্টে তারা নড়েচরে বসে।

ইত্তেফাকে আজ আবুল খায়েরের রিপোর্টে বলা হয়েছে,‘করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের বিশেষ সুরক্ষাসামগ্রী দিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে মাস্ক ও পিপিই আছে। কিন্তু ‘এন-৯৫’ নামে যেসব মাস্ক দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠান থেকে নকল ও নিম্নমানের এই মাস্কসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চিকিৎসক-নার্সদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার জন্য এটি অন্যতম কারণ বলে দাবি করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, যেটা সরবরাহ করা হয়েছে সেটা আসল ‘এন-৯৫’ মাস্ক নয়। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের জন্য নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। এগুলো ব্যবহার করে করোনার রোগীর চিকিৎসায় আইসোলেশন ওয়ার্ড, আইসিইউ ও ল্যাবরেটরিতে যাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। মাস্কের ওপর শুধু ‘এন-৯৫’ সিল মারা, এটা পুরোটাই নকল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ইত্তেফাককে বলেন, জেএমআই গ্রুপ নামের প্রতিষ্ঠানটি ‘এন-৯৫’-এর প্যাকেটে সাধারণ মাস্ক দিয়েছে ভুলবশত। এজন্য কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পক্ষ থেকে জেএমআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ঐ মাস্কের মান নিয়ে অভিযোগ আসে। মুগদা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে সিএমএসডিকে (কেন্দ্রীয় ঔষধাগার) বিষয়টি জানিয়েছিল। খুলনার একটি হাসপাতালও একই অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু কারোর কথায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্ণপাত করেনি। অবশেষে গোয়েন্দা রিপোর্টে বিষয়টির সত্যতা মিলেছে। প্রথম দিকে ২০০ থেকে ২৫০ পিস প্রকৃত ‘এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরে দেশে তৈরি নিম্নমানের মাস্ক ‘এন-৯৫’ প্যাকেটে সরবরাহ করা হয়।

সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) একশ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশে নকল ‘এন-৯৫’ মাস্ক মুন্সীগঞ্জের একটি কারখানায় বানিয়ে ভুয়া আমদানি দেখিয়ে সরবরাহ করেছে জেএমআই। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তার বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের করোনা মোকাবিলা সামগ্রী কেনাকাটার প্রায় ৭০ শতাংশই সরবরাহ করে জেএমআই। তাদের সরবরাহ করা ‘এন-৯৫’ মাস্কের মান নিয়ে শুরু থেকেই চিকিৎসকদের প্রশ্ন ছিল।

ডাক্তাররা বারবার বলে আসছিলেন, এটি দুই নম্বর মাস্ক। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিষয়টি কর্ণপাত করেননি। সম্প্রতি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে ভয়াবহ তথ্য পান। জেএমআই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে জামায়াতের অন্যতম ডোনার। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের মাস্ক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের মধ্যে সরবরাহ করেছে। আর তাকে কাজ পাইয়ে দিতে সহায়তা করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।

একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও তার সন্তানও এই চক্রে জড়িত বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। করোনা মোকাবিলায় শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে কাজে না লাগানোও তাদের ষড়যন্ত্রের অংশ। জানা গেছে, সম্প্রতি গোয়েন্দা রিপোর্টটি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।

আমাদের প্রায় দেড়শো ডাক্তার নার্স করোনায় আক্রান্ত। তিনশো স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত। সাতদিনে হাসপাতাল হয় আর সরকারের অনুদান প্রনোদনা পাওয়া গার্মেন্ট কি দ্রুত মানসম্মত পিপিই দিতে পারে না? মাস্ক আনার দায়িত্ব আর কোন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এনে পরীক্ষা করা যায় না? স্বাস্থ্যখাতের শীর্ষে ব্যাপক বরখাস্ত অ্যাকশন ছাড়া কি সম্ভব? আমাদের করোনা ছড়িয়েছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসক ও সেবা কর্মীদের শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এই অপরাধীদের কাছে চাউল চোর অপরাধীই না। এমনটাই মনে হয়।

Facebook Comments