ধারাবাহিকভাবে কমছে চিংড়ি রপ্তানি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাংলাদেশ থেকে একসময় প্রচুর চিংড়ি রপ্তানি হতো। তবে এখন তা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। দেশে উত্পাদন কমে যাওয়ায় এমন অবস্থা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে চিংড়ির উত্পাদন কমছে। অন্যদিকে তুলনামূলক কম দামের ও বেশি উত্পাদনশীল ভেন্নামী প্রজাতের চিংড়ি চাষের অনুমোদন না থাকায় উত্পাদনকারী ও রপ্তানিকারকরা লোকসানে পড়ছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ প্রজাতের চিংড়ি চাষের জন্য পাইলট প্রকল্প শুরু হলেও তা কচ্ছপ গতিতে এগুচ্ছে। আবার এবার প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতের জন্য ইতিবাচক কোনো ঘোষণা না দিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাতে ক্ষতিতে পড়তে পারে এ খাত। ফলে এ উত্পাদক ও রপ্তানিকারকরা হতাশ হয়ে পড়ছেন।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রক্রিয়াজাতকৃত হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ৩৫ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ১০ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি আয় কমছে এ খাতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৬৩৫ টন চিংড়ি রপ্তানি হয়। ওই অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৫৫ কোটি ডলার। পরের দুই অর্থবছরে তা যথাক্রমে ৫১ কোটি ডলার ও ৪৭ কোটি ২৩ লাখ ডলারে নেমে আসে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি হয় ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারের। আর গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) ৩৬ হাজার ১৬৮ টন চিংড়ি রপ্তানি করে আয় হয় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। অর্থাত্ গত পাঁচ বছরে রপ্তানি প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে। এদিকে বাংলাদেশ থেকে যত জীবিত ও হিমায়িত মাছ রপ্তানি হয় তার ৮৫ শতাংশ চিংড়ি। আর চিংড়ি রপ্তানি কমে যাওয়ায় মাছ রপ্তানি আয়ে মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্যে দেখা গেছে, দেশে প্রায় পৌনে তিন লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ির চাষাবাদ হয়। যেখানে বছরে ২ লাখ ৩০ হাজার টন চিংড়ি উত্পাদিত হয়। চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াকরণের জন্য সারা দেশে ১০৮টি কারখানা আছে। বাংলাদেশ থেকে হিমায়িত ও জীবিত মাছ ৬০টি দেশে রপ্তানি হয়। এসব দেশে বছরে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি হয়। চিংড়ির উত্পাদন কম হওয়ায় চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি কাজি বেলায়েত হোসেন বলেন, বিশ্বব্যাপী যত চিংড়ি রপ্তানি হয় তার ৭৭ শতাংশ ভেন্নামী প্রজাতের। ৬৭টি দেশ এ প্রজাতের চিংড়ি উত্পাদন করে রপ্তানি করছে। তাই আমাদের দেশ থেকে চিংড়ি রপ্তানি বাড়াতে এ প্রজাতের চিংড়ি উত্পাদনের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ভেন্নামী প্রজাতির চিংড়ি রপ্তানির জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করতে গত বছরের শেষে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য দুটি পাইলট প্রকল্প করার কথা। কিন্তু এ কার্যক্রম কচ্ছপ গতিতে এগুচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। এ ব্যবসায়ী বলেন, এভাবে এগুলে এ প্রকল্প শেষ করতে ৫ বছরের বেশি সময় লেগে যাবে। আর আগামী ৫ বছরে এ খাতের জন্য সরকার যদি অনুকূল সিদ্ধান্ত না নেয় তাহলে প্রক্রিয়াজাতকৃত হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানিখাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় শূন্যের কোঠায় পৌঁছাতে পারে।

এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটে এ খাতের দিকে নজর না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন কাজি বেলায়েত হোসেন। গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, মত্স্যজাত পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থে অ্যাসোসিয়েশন থেকে কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বাজেটে সেগুলোর প্রতিফলন হয়নি। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে এ খাতের জন্য উেস কর শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বহাল রাখার কথা বলা হয়েছিল। আগামী জুলাই থেকে এটি এক শতাংশ হয়ে যাবে। অর্থাত্ এ খাতের জন্য উেস কর চারগুণ বেড়ে যাবে। এ খাতের নগদ সহায়তার ওপর নির্ধারিত ৩ শতাংশ অগ্রিম কর কাটার বিষয়টি বাদ দেওয়ার কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। উল্টো অগ্রিম কর ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ খাতের জন্য নির্ধারিত করপোরেট ট্যাক্স ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করার অনুরোধ জানিয়েছেন বিএফএফইএ সভাপতি। এছাড়া এ খাতের জন্য নগদ সহায়তা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার কথা বলেন তিনি।

বিএফএফইএ’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ মো. শাহাদাত্ আলী খান বলেন, দেশ থেকে ৭০ শতাংশ চিংড়ি ইউরোপে রপ্তানি হয়। আর ২০ ভাগ রপ্তানি হয় আমেরিকায়। বাকি অংশ রপ্তানি হয় অন্যান্য দেশে। তিনি বলেন, যেসব দেশ ভেন্নামী প্রজাতের চিংড়ি উত্পাদন করে তারা অল্প দামে রপ্তানি করতে পারে। ফলে তাদের থেকে চিংড়ি কেনে বিদেশিরা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box