ধানের ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত কৃষক

এই বোরো মৌসুমে কৃষকের যা অবস্থা, তাতে এককথায় বলা যায়- তাদের মাথায় হাত। এর কারণ তারা ধানের মূল্য পাচ্ছেন না, অথচ ফলন হয়েছে বাম্পার।

বাজারে ক্রেতা নেই, সরকারি সংগ্রহ অভিযানও শুরু হয়নি। ভাবা যায়, কৃষকের উৎপাদিত খরচ তো উঠছেই না, উল্টো প্রতি মণে লোকসান হচ্ছে তিনশ’ টাকার বেশি।
ওদিকে দিনমজুরের পারিশ্রমিক চড়া। কোথাও কোথাও ২ মণ ধান দিয়েও মিলছে না কামলা। রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে ক্ষেতের পাকা ধানে আগুন দিচ্ছেন কৃষক। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ঘটেছে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। সেখানে আগুন দেয়া ক্ষেতের ধান কৃষকের হয়ে কেটে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

কৃষকের দুরবস্থার কি শেষ আছে? তারা ধান ফলানোর জন্য ধার-দেনা করেছিলেন। সেই ধারের টাকা শোধ করতে হবে। মহাজনের টাকা, বীজ-সার কেনার জন্য ধার-দেনা- এসব শোধ করার চিন্তা মাথায় এলে নাভিশ্বাস উঠে যায়। অঞ্চলভেদে এবার ধান চাষে বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে অর্ধেক টাকাও মিলছে না। এই অবস্থার কারণও অজানা নয়। আড়তদাররা তৈরি করেছে সিন্ডিকেট, তাদের বাইরে গিয়ে ধান বিক্রির সুযোগ নেই। ওদিকে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী ও চালকল মালিকদের কারসাজি।

সরকারি পর্যায়ে ধান কেনার কথা ছিল ২৫ এপ্রিল; কিন্তু এখন পর্যন্ত ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি। এর সুযোগ নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। সরকারি পর্যায়ে ধান কেনা শুরু না হওয়ায় ফড়িয়াদের কাছে অল্প দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। না করে উপায়ই বা কী? ধারের টাকা শোধ করতে হবে না? এ সময়টায় তো তাদের হাতে টাকা থাকে না, নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর জন্যও তারা অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সারা দেশে রব উঠেছে- কৃষক বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও। রাজশাহীতে কয়েক হাজার কৃষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা সড়কে ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। ধানের ক্ষেতে আগুন লাগানোর ঘটনাকে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন পরিকল্পিত। তার এই বক্তব্য কৃষকের সঙ্গে মশকরা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ অবশ্য খাদ্যমন্ত্রীর এ কথার প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদ আমরাও করছি। সরকার কৃষককে ধানের ন্যায্যমূল্য দিতে পারবে না, এজন্য দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। তা না, তিনি মশকরা করছেন তাদের সঙ্গে!

এটা স্পষ্ট, সময়মতো সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু না হওয়ার প্রেক্ষাপটেই কৃষকের এই নাজেহাল অবস্থা। আমাদের কথা হল, এখনই উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। সংশোধন করতে হবে ধান-চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি। সরকার যদি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করে, তাহলে আর সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সেটা কেন করা হচ্ছে না তা বোধগম্য নয়।

সংকটটা শুধু এ বছরের নয়, গত কয়েক বছর ধরেই কৃষক তার ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষক ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। সেক্ষেত্রে তৈরি হবে মহাসংকট। সরকারের উচিত কৃষি ও কৃষক বাঁচানোর যে দাবি উঠেছে দেশময়, তা আমলে নিয়ে কৃষকের জন্য ধানের ন্যায্যমূল্যের ব্যবস্থা করা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments