ধানক্ষেতের আগুনের উত্তাপ এখন ঢাকার রাজপথে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ধান চাষে কৃষকের ‘লোকসান’ এবং মন্ত্রীর ‘আবেগে ধানক্ষেতে আগুন’ মন্তব্য নিয়ে আলোচনা এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। টাঙ্গাইলে দুই উপজেলায় ধানক্ষেতে দুই কৃষকের আগুন দেয়া এবং ক্ষেতমজুরদের দিনহাজিরা ৫শ থেকে ৮শ টাকা নিয়ে আলোচনা এখন শুধু গ্রামে নয়, ঢাকা শহরেও হচ্ছে। রাজধানীর রাজপথে ধানের মূল্য বৃদ্ধির দাবিতে মানববন্ধন হচ্ছে, সভা সেমিনার সিম্পোজিয়া হচ্ছে; ভারত থেকে চাল আমদানীর বিরুদ্ধে শ্লোগান হচ্ছে। সর্বত্রই আওয়াজ উঠেছে ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’। ‘কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে’। বাম দলগুলো কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে ধান কেনার দাবি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করছে। এ নিয়ে সমালোচনায় লিপ্ত বিরোধী দল, বিএনপি ও বিভিন্ন সংগঠন। ধানের দাম নিয়ে একের পর এক কর্মসূচি পালন করছেন বাম রাজনীতিক নেতারা। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কোনো না কোনো সংগঠন প্রতিদিনই ধানের দাম বাড়ানোর দাবিতে মানববন্ধন করছে।

গত দুই সপ্তাহ ধরে ধানের দাম, ক্ষেতমজুরদের দাম, ধানক্ষেতে আগুন দেয়া, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিনে পয়সা অসহায় গরীব কৃষকের ধান কেটে দেয়া নিয়ে খবর প্রকাশিত হচ্ছে দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকাসহ টিভি মাধ্যমে। এ ছাড়া কিছু টেলিভিশন কৃষকদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরছেন এবং ফলাও করে প্রচার করছে। কৃষক ও ধানক্ষেতে আগুনের ছবি যখন পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। রংপুরের সাতমাথায় কৃষকরা রাজপথে ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কৃষকের সন্তানরা পথ নাটকের মতো প্রতিবাদ করেছে। তখন থেকেই চায়ের স্টলে ‘ধানে কৃষকের সর্বনাশ’ নিয়ে আলোচনার ঝড়ে উঠছে।

কৃষকের ছেলেমেয়ে যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন তাদের অধিকাংশই লেখাপড়ার খরচের জোগান আসে ধান বিক্রি থেকে। ঢাকা বা বিভাগীয় জেলা শহরে চাকরি করেন বাড়িতে তাদের ফোনে কথা হলে একটি বিষয়ই ওঠে আসে, তা হলো ধান। শ্রমিকের দাম বেশি, ধান পানিতে পড়ে গেছে, ধানের দাম কম, ব্যাপারিরা ধান নিতে চায় না, সরকার মধ্যত্বত্তভোগীদের পকেট ভরাতে ধান ক্রয়ে বিলম্ব করছে ইত্যাদি কথা।
ধানক্ষেতে কৃষকের আগুন দেয়া নিয়ে সম্প্রতি খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘যারা ধানক্ষেতে আগুন দিচ্ছে তারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এ কাজ করছে।’ আবার কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক ধানের আগুন দেয়া নিয়ে দায়িত্বহীন বেঁফাস কথা বললে তা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ উঠে। কৃষি মন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন।

খাদ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। তিনি বলেন, ‘কৃষকের সঙ্গে দয়া করে মশকরা করবেন না।’ স্ট্যাটাসে তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতা কি মানুষকে অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দেয়? আমার জানা মতে, সুস্থ চোখ অন্ধ হতে সময় লাগে। কিন্তু ধানের ভান্ডার নওগাঁর গাঁও-গেরাম থেকে উঠে আসা খাদ্যমন্ত্রী মাত্র ৪ মাসে গাঁয়ের কৃষকদের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক ভুলে গেলেন! অন্ধ হয়ে গেলেন এসির ঠান্ডা বাতাসে!! আপনি, আমি কৃষকের ভোটে, কৃষকের দয়ায় সংসদে এসেছি। আগুন দিয়েছে নিজের ক্ষেতে, আপনার পাঞ্জাবিতে দেয়নি। তাতেই সহ্য হচ্ছে না!’ ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাকর্মী জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের স্ট্যাটাসের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তারা চান ধানের ন্যায্য দাম পাক কৃষক।

এ দিকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও চায় ধানের ন্যায্য দাম পাক কৃষক। জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মিল মালিক নয়, সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত ধান নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে কিনতে হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি মালিকানাধীন গুদামগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জরুরিভিত্তিতে ধান সংরক্ষণ করতে হবে। ১৪ দলীয় জোট নেতা রাশেদ খান মেননও গতকাল বলেছেন, ভারত থেকে চাল আমদানীর নামে বিদেশে টাকা পাচার করা যায়। সেটা করতেই বিদেশ থেকে চাল আমদানী করতে আগ্রহ। মূলত দুর্নীতির কারণেই কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।

খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে জএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেছেন, মন্ত্রীরা কি ভুলে গেছেন তাদের বাড়ি কোথায় ছিল? তাদের পূর্বপুরুষ কি ছিল? এ সরকার বুঝতে পারছে না। যদি এমন চলতে থাকে তাহলে দেশে আগুন জ্বলে যাবে। কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য দেয়া হচ্ছে না। কৃষকরা যদি একবার ক্ষেপে যায় তাহলে দেশের মানুষ না খেয়ে মরবে। তিনি বলেন, বঙ্গভবনে, গণভবনে, সচিবালয়ে ফসল উৎপাদন হয় না। উৎপাদন হয় ক্ষেতে-খামারে, আর সেই উৎপাদন যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দেশ চলবে কীভাবে? দেশের মানুষ বাঁচবে কীভাব? কৃষক না বাঁচলে দেশ থাকবে না।

কৃষকদের এমন দুরবস্থায়, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ‘সরকারি ক্রয়কেন্দ্র’ চালু করে সরাসারি কৃষকের কাছ থেকে ১০৪০ টাকা মণ দরে ধান কেনার দাবিতে ২০-২৬ মে দেশব্যাপী ‘কৃষক বাঁচাও সপ্তাহ’ পালন করছে সিপিবি। দলটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম বলেছেন, কৃষকরা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। কিন্তু তারা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। তারা মুনাফালোভী ‘রাইস মিল মালিক’ ও ‘ধান-চাল সিন্ডিকেট’ এর প্রতারণার ফলে উৎপাদন ব্যয়ের অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।
গত শনিবার ঢাকার এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ধানের দাম কমে যাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী খুবই চিন্তিত। তবে এ মুহূর্তে ধান কিনে সরকারের পক্ষে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। ধানের দাম অস্বাভাবিকভাবে কম হলেও দ্রুত এর সমাধান কঠিন। আমাদের হয়তো কিছুটা সেক্রিফাইস করতে হবে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ভুর্তোকি দিয়ে হলেও চাল বিদেশে রফতানি করা হবে।

প্রতিমণ ধানের দাম কমপক্ষে ১ হাজার ১০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। ধানের দাম বৃদ্ধির দাবিতে রোববার রাজশাহীতে বিক্ষোভ-সমাবেশ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন। কৃষককে ধানের ন্যায্যমূল্য দেয়ার দাবিতে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। কর্মসূচির মধ্যে ২১ মে দেশব্যাপী জেলা প্রশাসকের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে স্মারকলিপি এবং ২৩ মে সারা দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ের হাট-বাজারগুলোতে মানববন্ধন। কৃষক দলের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদু গত রোববার প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে বলেন, গত এক শতাব্দীতে লক্ষ করবেন কৃষক তার উৎপাদিত ধানে আগুন দিয়েছে এ রকম ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এই সরকারের আমলে ঘটেছে। কী ভয়ঙ্কর! কৃষক তার ধানের ন্যায্যমূল্য ন পেয়ে ক্ষেতে আগুন দিচ্ছে আর সরকার নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। কৃষক দলের পক্ষ থেকে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। ২১, ২২, ২৩, ২৪ মে সারা দেশের সব ইউনিয়নের হাটে প্রতিবাদ সমাবেশ, ২৫ মে সব উপজেলা সদরে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ২৬ মে সারা দেশের জেলা প্রশাসক বরাবর ধানের ন্যায্যমূল্য দাবিতে স্মারকলিপি দেয়া।

এদিকে নির্ধারিত ও ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি আইনি (লিগ্যাল) নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। আগামী তিন দিনের মধ্যে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হলে হাইকোর্টে রিট করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়। গত রোববার রেজিস্ট্রি ডাকযোগে খাদ্য মন্ত্রণালয় সচিব ও কৃষি মন্ত্রণালয় সচিব বরাবর এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গতকালও সিরাজগঞ্জে ধানের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে মহাসড়কে কৃষকরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। এ ছাড়া গত কয়েকদিন রাজধানীতে কৃষক সমিতি, ক্ষেত মজুর সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য দেয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও মিছিল অব্যাহত রেখেছে। টাঙ্গাইলের দুই ধানের ক্ষেতে আগুন দেয়ার উত্তার সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আগুনের উত্তার এখন ঢাকার রাজপথেও ছড়িয়ে পড়েছে।

এ যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে/ সে আগুন ছড়িয়ে গেল সব খানে সবখানে—’ এর মতো। তবে এটা সুরের আগুন নয়, ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া কৃষকের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের আগুন যেন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments