ধরাছোঁয়ার বাইরে গুজবের হোতারা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মাথা লাগবে’- চলতি মাসের শুরুর দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন গুজব চোখে পড়ে। অবশ্য এর আগে ভিডিও শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ইউটিউবে প্রথম এই গুজব ছড়ানো হয়। এর জেরে ছেলেধরা সন্দেহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ পর্যন্ত আটজনকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই গুজবের জেরে প্রায় প্রতিদিনই নিরীহ মানুষ গণপিটুনির শিকার হচ্ছেন। গত কয়েক দিনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুজব ছড়ানো ও গণপিটুনিতে জড়িত অভিযোগে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে; কিন্তু মাথা কাটা গুজবের সেই হোতাদের এখনও ধরা যায়নি। তাদের চিহ্নিতও করা যায়নি।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, গ্রেফতার হওয়া কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং এখন পর্যন্ত তদন্তে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করা এবং অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য পরিকল্পিতভাবে ওই গুজব ছড়ানো হয়েছিল। এর পেছনে হোতাদের চিহ্নিত করার জন্য পুলিশের সাইবার বিভাগগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে দুবাইয়ে একজন মাস্টারমাইন্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, দুবাইয়ে অবস্থানরত ওই ব্যক্তি সরকারবিরোধী রাজনীতি বলয়ের লোক। তার অবস্থানও শনাক্ত করা হয়েছে। তাকে আইনের আওতায় নিতে দেশটির পুলিশ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) মো. সোহেল রানা সমকালকে বলেন, গুজব রটনাকারী ও এর জেরে গণপিটুনির সঙ্গে জড়িত শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমন গুজবের পরিকল্পনাকারী এবং যে বা যারা প্রথমে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিতে পুলিশের সাইবার ইউনিটগুলো কাজ করছে। এর বাইরে গুজব ঠেকাতে নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, গত জুনের শেষ দিকে ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে গুজব ছড়ানো শুরু হয়। গুজব সৃষ্টিকারীরা প্রথমে একটি ভুয়া ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবে দেয়। সেখানে দেখানো হয়, পানির নিচ থেকে উঠে আসা ‘দানব’ পদ্মা সেতুর একেকটি পিলার গিলে খাচ্ছে। এই দানবগুলোর জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শেষ করা যাচ্ছে না বলে এতে প্রচারণা চালানো হয়। এরপর কথিত ওই দানব সম্পর্কে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এর পরই ভয়ঙ্করভাবে গুজব ছড়ানো হয়, এসব দানবকে শান্ত রাখতে নিষ্পাপ শিশুদের মাথা লাগবে। শুরুর দিকে এমন ভিডিও কেউ পাত্তা না দিলেও তা ডালপালা ছড়ায়। যদিও ওই ভিডিওটি এখন আর ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য এর আগে-পরে অনেকেই ধীরে ধীরে ফেসবুকেও পদ্মা সেতু নির্মাণে ‘মানুষের মাথা’ লাগবে বলে গুজব ছড়ায়।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সাইবার সিকিউরিট অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজের পাশাপাশি ব্যক্তির ফেসবুক আইডি থেকেও শুরু দিকে মাথাকাটা গুজব ছড়ানো হয়। এসব আইডি বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, এদের প্রায় সবাই আগেও নানা গুজব ছড়িয়েছে। নিজেদের গ্রুপ, পেজ ও আইডি থেকে সরকারবিরোধী নানা বিষয়ে ট্রল করেছে। অবশ্য এরপরই নানা আইডি থেকে নানাভাবে এই গুজব রীতিমতো ভাইরাল হয়ে যায়। ‘মাথা লাগবে’ এমন গুজবের পরপরই একই গোষ্ঠী ‘মাথা কাটতে ছেলেধরা নেমেছে’ বলেও গুজব ছড়ায়। যারা শুরুর দিকে এটা ছড়িয়েছিল, তারা তা পরিকল্পিতভাবেই করেছে। পরে হয়তো অনেকে হুজুগে পোস্ট দিয়েছে এবং গণপিটুনিতে অংশ নেয়। এরই মধ্যে এ ধরনের বেশকিছু ফেসবুক আইডি, ইউটিউব ও কথিত অনলাইন পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

চলতি মাসে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পটুয়াখালী ও কেরানীগঞ্জে সাতজনকে ‘ছেলেধরা’ অপবাদে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। তবে গত ২০ জুলাই রাজধানীর বাড্ডার একটি স্কুলে মেয়েকে ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা আখ্যায়িত করে তাসলিমা বেগম রেনু নামের এক মাকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মোবাইল ফোনে ধারণ করা পিটুনির সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। আরও বেশি সতর্ক হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

সর্বশেষ গত বুধবার সারাদেশে গুজব সৃষ্টি করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টার মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে আসেন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা ও অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে এমন গুজব ছড়িয়েছে। এতে জড়িতরা নানা আন্দোলন করে ব্যর্থ হয়ে এখন আড়ালে থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে। অবশ্য গত দু’দিনে এমন ছেলেধরা গুজবের জেরে গণপিটুনিও কমে এসেছে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার দেশের কোথাও গণপিটুনির খবর পাওয়া যায়নি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments