দুধ বিক্রি বন্ধ: খামারিদের ক্ষতি দিনে ১৭ কোটি টাকা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

হাইকোর্টের নির্দেশে বাজারজাতকারী ১৪ কোম্পানি দুধ উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ রাখায় একদিনেই প্রায় ৫ লাখ লিটার দুধ অবিক্রিত থেকে গেছে খামারিদের কাছে। এতে খামারিদের অন্তত ১৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামারিরা প্রতিদিনই এমন ক্ষতির মুখে পড়লেও এতে দুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে তেমন ক্ষতির মুখে পড়বে না।

দুধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পাওয়ার কারণে হাইকোর্ট ওই ১৪ কোম্পানিকে পাঁচ সপ্তাহের জন্য দুধ উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধের নির্দেশ দেন রোববার (২৮ জুলাই)। পরে আজ সোমবার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মিল্ক ভিটাকে আট সপ্তাহের জন্য দুধ উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহ করার সুযোগ পুনর্বহাল করেন আদালত।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে দেশে। আর দেশের সাত থেকে আট লাখ খামারি উৎপাদন করে থাকেন ৯৪ লাখ লিটার দুধ। এর মধ্যে প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত লাখ লিটার দুধ খামারিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে থাকে দুধ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল মিল্ক ভিটাই প্রতিদিন প্রায় এক লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে থাকে।

ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, মিল্ক ভিটা ছাড়া বাকি ১৩ কোম্পানির ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকাকালীন প্রতিদিন খামারিদের পাঁচ লাখ লিটার দুধ অবিক্রিত থেকে যাবে। প্রতি লিটার দুধের দাম ৩৫ টাকা হিসাবে তারা প্রতিদিন ১৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ক্ষতি আশঙ্কায় রয়েছেন।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ ইমরান সারাবাংলাকে বলেন, কোম্পানিগুলোর দুধ সংগ্রহ বন্ধ থাকলে বড় খামারিদের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। তবে দরিদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অনেকেই ঋণের টাকা দিয়েও খামার চালাচ্ছেন। আবার দুধের ওপরই তাদের জীবিকা নির্ভর করে। তারা ভীষণ বিপদে পড়ে যাবে।

জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. হিরেশ রঞ্জন ভৌমিক সারাবাংলাকে বলেন, যারা অর্গানাইজড ফার্ম, তাদের প্রত্যেকেরই নির্ধারিত খামারি আছে। ফার্মগুলো দুধ না কিনলে সেসব খামারিরা অন্য কোথাও দুধ বিক্রি করতে পারবেন না। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তিনি বলেন, এক মিল্ক ভিটাই তো প্রতিদিন এক লাখ টন দুধ সংগ্রহ করে। দুধ উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ থাকলে প্রতিদিন অন্তত ৫ লাখ টন দুধ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমিও মনে করি। এতে খামারিদের দিনে ১৭ কোটি টাকা ক্ষতি হওয়া আস্বাভাবিক নয়। ক্ষুদ্র খামারিরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এদিকে, দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানিগুলো দুধ ক্রয় ও বিপণন কার্যক্রম বন্ধ রাখায় পাবনার ভাঙ্গুরা উপজেলার খামারিরা সড়কে দুধ ঢেলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। দুধ বিক্রি করতে না পারায় চরম দুর্দিনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তারা।

খামারিদের এমন ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি সায়েন্স বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. হারুন উর রশীদও। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, খামারিদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা মিথ্যা নয়। কারণ দুধ তো আর স্টক করে রাখা যাবে না। ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনও খামারিদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে তথ্য দিয়েছে, তার সঙ্গে আমি শতভাগ একমত।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দুধে বিভিন্নভাবেই অ্যান্টিবায়োটিক আসতে পারে। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি পরীক্ষার বিষয়। দুগ্ধজাত গাভীকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হলে সেই দুধে অ্যান্টিবায়োটিক থাকতে পারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে এ বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না।

আরও পড়ুন- আমরা চাই দেশেই নিরাপদ দুধ উৎপাদিত হোক: হাইকোর্ট

তবে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির ক্ষেত্রে খামারিদেরও ছাড় দিতে রাজি নন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, গাভীকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর ২১ দিনের মধ্যে দুধ সংগ্রহ করলে খামারি পর্যায়েও দুধে অ্যান্টিবায়োটিক থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই দুধ থেকে দই বানানো যেতে পারে, কিন্তু তরল দুধ হিসেবে বাজারজাত করা যাবে না।

খামারিদের ক্ষতি প্রসঙ্গে ডা. ফারুকের মন্তব্য, ১৭ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে খামারিদের, কিন্তু মানুষের ক্ষতি হচ্ছে কত? চার বছরের একটি শিশুর শরীরেও এখন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এমন অনেক শিশুই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ছে। এটা তো জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য মাথায় রেখে দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তুলতে হবে।

এদিকে, রোববার হাইকোর্ট নির্দেশনা দেওয়ার পরদিন সোমবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর বেশিরভাগ দোকানেই তরল দুধ বিক্রি হতে দেখা যায়নি। খুচরা দোকান ও সুপার শপগুলো দুপুরের আগ পর্যন্ত ছিল দুধ শূন্য। যে দুয়েকটি দোকানে বিভিন্ন কোম্পানির তরল দুধের মজুত ছিল, তারাও সেগুলো বিক্রি করেছে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে। মোবাইল কোর্ট ও মামলার ভয়ে দুপুর পর্যন্ত দুধ না থাকার তথ্যই জানান বেশিরভাগ বিক্রেতা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments