দুই জোটেই বাড়ছে ক্ষোভ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ভালো নেই বড় দুই রাজনৈতিক দলের জোট সঙ্গীরা। নামে জোটে রাখা হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অংশীদারিত্বে নেই ছোট দলগুলো। যা নিয়ে বড় রাজনৈতিক জোট ১৪ দল এবং ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষোভ বেড়েই চলেছে।

তথ্য মতে, সময়ের প্রয়োজনে রাজনৈতিক বৈরী পেরোতে জোট গঠন করা হলেও জোটে উপেক্ষিত ছোট দলগুলো। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ভূমিকা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ছোট দলগুলোর খোঁজ রাখে না প্রধান দলগুলো।

২০০৪ সালে ৯ দফা দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ পায় রাজনৈতিক জোট ১৪ দল। এরপর এক সঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন এবং সরকার গঠন করেছে জোট। কিন্তু প্রতিবারই নির্বাচনের আগে যতটা গুরুত্ব পায় জোট, নির্বাচনের পর যেন ততটাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে শরিক দলগুলো।

সূত্র মতে, গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নতুন আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা। নির্বাচনের আগে বাড়ানো হয় জোটের পরিধি। নতুন করে জোটে এসে সুবিধা পেলেও ভোটের মাঠেই স্বপ্ন পুড়ে ১৪ দলভুক্ত শরিকদের। জোটের প্রতীক নৌকার প্রার্থী হয়ে অন্তত ৩০ জন নেতা সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও তা ভঙ্গ হয়।

নতুন তো নয়ই, বরং গত মেয়াদের চেয়েও কমানো হয় প্রার্থী সংখ্যা। ১৪ দলের কয়েকজন নেতাকে প্রথমে প্রার্থী করা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তা বাতিল করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে জোটের নেতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর অনেকেই আশা করেছিলেন- ঠাঁই পাবেন মন্ত্রিসভায়।

কিন্তু সেখানেও হয়েছে হতাশ। গঠিত মন্ত্রিসভায় ১৪ দলের কাউকে রাখেননি আওয়ামী লীগের নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। মন্ত্রিসভায় ১৪ দলের কাউকে রাখা হবে না- এমন চিন্তা ছিল না কারোরই। অথচ এর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সব সরকারই ছিল অংশগ্রহণমূলক।

জোটের শরিক দল, এমনকি বিরোধী দলের প্রতিনিধিও ছিল সরকারে। ২০০৮ সালের গঠিত জোটভুক্তদলের মধ্যে মন্ত্রিসভায় ছিলেন- জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিএম কাদের, মুজিবুল হক চুন্নু, জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের হাসানুল হক ইনু, সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারেও হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, মশিউর রহমান রাঙ্গাকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়।

সূত্র আরও জানায়, সরকার গঠনের পর সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল জোটের নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। এরপর থেকে আশায় দিন কাটছে দলগুলোর। ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ধরনের সুখবর পাননি জোটের নেতারা। বরং বিভিন্ন সময়ে সরকারের শীর্ষ নেতাদের হাস্যরসের খোরাক হয়েছে।

মন্ত্রিসভা ছাড়াও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে মূল্যায়ন করার কথা শোনা গেলেও তা এখনো দেখা যায়নি। এছাড়া দলীয় কার্যক্রমে উপেক্ষিত ১৪ দল। জোট গঠিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের বড় কোনো কর্মসূচি থাকলে এর আগে ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক করা হতো।

গত নির্বাচনের ১৯ দিন পর ১৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের উদযাপিত সমাবেশে ১৪ দলকে অংশ নিতে সেভাবে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। এসব কারণে ক্ষোভের অন্তর্দহনে পুড়ছে ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা।

বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, যা হওয়ার, তা তো হয়েছে। আওয়ামী লীগ তাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আমরা কখনো মূল্যায়ন চাইনি।

জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, নির্বচানের আগে জোটকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল, পরে সেটা দেখিনি। মূল্যায়ন যা করার তো করেছে, এখন আর সম্ভাবনা দেখি না। জোট নিয়ে সরকারের যে পলিসি, সেটা পরিবর্তন কবে হবে সেটা জোটনেত্রীই জানেন।

ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, নির্বাচনে আমাদের জোটের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়েছে। সেটা হলো- মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় আসা। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করে, নীতি তাদের কাছে মূল নয়, আর এ কারণে জোট যথার্থ মূল্যায়ন পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ গণআজাদী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এসকে সিকদার বলেন, আমরা হতাশ নই। সময় এখনো শেষ হয়নি, অপেক্ষা করতে হবে। জোটনেত্রী শেখ হাসিনা সবদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন। আমি আশাবাদী তিনি ১৪ দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।

অন্যদিকে, একই অবস্থা ঐক্যফ্রন্টের। গত নির্বাচনের আগে যে লক্ষ্যে জোট গঠন করা হয়েছিল, তা পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভে জোটটির নেতারা। নির্বাচনের পূর্বের আন্দোলন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, আসন বণ্টন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণ এবং আন্দোলন নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে জোটের শরিক দলগুলো।

বিএনপির কয়েকজন নেতা এবং গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন অনেকটা একতরফাভাবে জোট পরিচালনা করছেন। জোটের অন্য দলগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যা নিয়ে খোদ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বাংলাদেশ ন্যাপ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি)।

যদিও তাদের একটি অংশ পরে ২০ দলের সঙ্গে থেকে যায়। ১/১১-এর কুশীলব ও বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়ার নেতাদেরকে সাথে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন এবং বিএনপির বিরুদ্ধে জোট নেতাদের অবজ্ঞা-অবহেলার অভিযোগে বিজেপি ও লেবার পার্টির একটি অংশ জোট ছেড়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে জোটের কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টির সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। গত ৯ মে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে অনেক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেন এবং তা এ মাসের মধ্যে দূর করা না হলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নিজের দলকে সরিয়ে নেয়ার আল্টিমেটাম দেন তিনি। এরপর অবশ্য আল্টিমেটামের সময় বাড়িয়ে ১২ জুন করেন। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পুনরায় দলীয় সিদ্ধান্ত জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন কাদের সিদ্দিকী।

এদিকে, কাদের সিদ্দিকীর আল্টিমেটামের পর জোটের বিভাজন দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেছেন শীর্ষনেতারা। সর্বশেষ গতকাল সোমবার বিকালে জোট নেতা আসম আব্দুর রবের উত্তরার বাসায় বৈঠকে বসেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা।

বৈঠকে ড. কামাল হোসেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

তবে দুই ঘণ্টার ঐ বৈঠকেও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ফলে সোমবারের বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। ওই বৈঠকে কাদের সিদ্দিকীর আল্টিমেটামের বিষয়টি এজেন্ডায় থাকলেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box