দাম যেন না বাড়ে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা যেমন ভাবেন তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে ভাবনা। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের সমর্থকরা প্রস্তাবিত বাজেটকে জনকল্যাণমুখী বলে স্বাগত জানান। আবার যারা বিরোধী পক্ষে থাকেন তারা প্রস্তাবিত বাজেটকে জনবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করেন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কড়া সমালোচনার মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে বাজেট ভাবনা থাকলেও বাজেটের তাত্ত্বিক দিক নিয়ে তারা বেশি মাথা ঘামান না। তারা শুধু দেখেন কোন জিনিসের দাম বাড়ল আর কোন জিনিসের দাম কমল। প্রস্তাবিত বাজেটে যে জিনিসের দাম বাড়ানোর কথা বলা হয় বাজেট পাস হওয়ার আগেই তার প্রভাব দ্রুত বাজারে পরে অর্থাৎ পণ্যের দাম দ্রুত বাড়নো হয়। কিন্তু যে জিনিসের দাম কমানোর কথা বলা হয় তা কমতে দেখা যায় না বললেই চলে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য সরকার পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এ বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। যা বিগত যে কোনো বছরের চেয়ে টাকার সংখ্যায় বেশি। সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার পর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বাজেট নিয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ইতিবাচক মন্তব্য করলেও মাঠের বিরোধী দল বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিপুল অংঙ্কের এই বাজেটের কড়া সমালোচনা করছে। বাম রাজনৈতিক দলগুলোও প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করে। সরকারবিরোধী পক্ষগুলো বলছে এ বাজেট ধনী শ্রেণিকে আরও সুবিধা করে দেবে।

সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ বলছেন তারা বাজেট সম্পর্কে তেমন কিছুই বোঝেন না। তবে তারা চান জিনিসের দাম যেন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে। দেশের বেশির ভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত মানুষের যাতে উপকার হয় বাজেট পাশের আগে সরকার যেন সে বিষয়ে লক্ষ রাখে। রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণি পেশার কয়েকজন মানুষের সঙ্গে বাজেট নিয়ে কথা হয়। তারা বলেন, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার আগে তারা এক ধরনের আতঙ্কে থাকেন। তারা ধরেই নেন বাজেটে কিছু জিনিসের দাম বাড়বে এবং তাই হয়। প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর পরই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। তারা বাজেট পাস হওয়া পর্যন্ত সময়ও অপেক্ষা করেন না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায়।

সাধারণ মানুষ বলছেন, সরকার বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায় কিন্তু কোনো পণ্যেও দাম কমে না। বাজেট ঘোষণার পর পরই মিডিয়া প্রচার করা শুরু হয় কোন জিনিসের দাম বাড়বে আর কোন জিনিসের দাম কমবে। যে জিনিসের দাম বাড়বে প্রচার করা হয় ওই জিনিসের দাম খুচরা ব্যবসায়ীরা ওই দিন থেকেই বাড়িয়ে দেন। কিন্তু কোনো জিনিসের দাম কমায় না।

রাজধানীর বনানীর রিকশাচালক তোফাজ্জল হোসেন খোলা কাগজকে বলেন, বাজেটে সম্পর্কে তিনি তেমন কিছুই জানেন না। তবে তার রিকাশার যাত্রীদের মুখে কথাটা মাঝে মধ্যে শোনেন। তিনি বলেন, বাজেট আসলে কিছু কিছু জিনিসের দাম দোকানদাররা বেশি নেন। দাম কেন বেশি নিচ্ছেন জানতে চাইলে বলেন, বাজেটে দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু বাজেটের পর দোকানদারদের কখনো জিনিসের দাম কম নিতে দেখি নাই।

রাজধানীর চা বিক্রি করেন নওগাঁর বেলাল হোসেন। তিনি পড়ালেখা তেমন না জানলেও বেশ সচেতন। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, বাজেটে গরিব মানুষের কোনো উপকার নেই। বড়লোকরা বাজেট বানান। তারা তাদের সুবিধটা রেখেই বাজেট বানান। আমার ৪৫ বছর বয়সে বাজেটের পর কোনো জিনিসে দাম কমেছে দেখিনি।
চাকরি প্রার্থী দীপা আক্তার খোলা কাগজকে বলেন, আমরা পড়ালেখা করলেও বাজেট সম্পর্কে তেমন কিছু বুঝি না। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি বাজেটে কিছু জিনিসের দাম বাড়ছে আর কিছু জিনিসের দাম কমছে। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর বাজারে গিয়ে দেখি যে জিনিসগুলো দাম বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর দাম ঠিকই বাড়ছে। কিন্তু যে জিনিসগুলোর দাম কমার কথা সেগুলোর দাম আর কমছে না। খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বেশি নেওয়ার সময় বলেন, বাজেটে দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু যেগুলো দাম কমানোর কথা বলা হয় সেগুলো কম নেওয়া হয় না।

রাজধানী আগারগাঁওয়ে অবস্থিত একটি কলেজের ছাত্র আকাশ খোলা কাগজকে বলেন, মানুষ শুধু দেখে কোন জিনিসের দাম বেড়েছে আর কোন জিনিসের দাম কমেছে। দেশের অধিকাংশ মানুষই মধ্যবিত্ত। তাদের জন্য মূল্য সংযোজন কর যত কম রাখা যায় ততই ভালো। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো উচিত। কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িতরা যেন ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

কুড়িগ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, বাজেট কি আমি জানি না। ভোট এলে ভোট দিতে যাই। জমি চাষ করে ফসল পাই, তা দিয়ে সংসার চালাই। একই জেলার অপর কৃষক শফিকুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, বাজেট আসলে অনেক জিনিসের দাম বাড়ে কিন্তু কমতে দেখি না। তার দাবি যেন কৃষি উপকরণের দাম কমানো হয় (যেমন : ধান মাড়াই মেশিন, ধান কাটার মেশিন)। এ যন্ত্রগুলোর দাম অনেক বেশি তাই সব কৃষকের পক্ষে এগুলো কেনা সম্ভব নয়। সরকার যেন কৃষক সমিতিগুলোর মাধ্যমে প্রতি গ্রামে অন্তত একটি করে ধান কাটা এবং ধান মাড়াইয়ের মেশিন দিয়ে দেয়।

বাজেট ঘোষণার পর গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে যারা অর্থনৈতিক অপশাসনের সুবিধাভোগী, বাজেট তাদের পক্ষেই গেছে। এক্ষেত্রে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার, দলীয় আদর্শ ও ভোটেরভিত্তির পরিপন্থী। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে যে চাপ রয়েছে, বাজেটে তার স্বীকৃতি নেই। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক কৌশল দরকার, তারও প্রতিফলন ঘটেনি। সামগ্রিকভাবে বাজেট উচ্চবিত্তদের সুবিধা দিয়ে মধ্যবিত্তদের চাপে ফেলবে।

আর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগামী দলে পক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাভিলাষী ও গণবিরোধী। এই বাজেটে সাধারণ জনগণের জন্য কিছু রাখা হয়নি। এ বাজেটে ধনীক শ্রেণিকে আরও ধনী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ সাধারণ জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলটির পক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে কোথাও নেতিবাচক কোনো বিষয় নেই। এটিকে একটি জনবান্ধব ও ইতিবাচক বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন সবসময়ই চ্যালেঞ্জ তবে প্রস্তাবিত বাজেটে নেতিবাচক কোনো বিষয় নেই।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box