ত্রাণের অপেক্ষায় বানভাসিরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বসবাসের একমাত্র সম্বল টিনের ঘর পানিতে ভেসে গেছে। উঁচু সড়কের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার রমজান আলী ও তার পরিবার। পরিবার নিয়ে দুই দিন আগে ফুলছড়ির কাতলমাড়ি থেকে সাঘাটা উপজেলার ভাঙামোড়ে ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। বাঁধে আশ্রয় নেওয়া লোকজনের ছবি তুলতে গেলে তারা বলতে থাকেন, বাবা হামার নাম নেকে (লিখে) নেও। কিছু পাইলে খায়া বাচমু। খোলা আকাশের নিচে বসবাস করা বৃদ্ধা ছালেহা, জোবেদা ও আয়েশা বলেন, ‘ফটোক তুলে কি হবে বাবা, মোর নাম নেকে নেও।’

এমন আর্তনাদ শুধু ছালেহা, জোবেদা ও আয়েশা বা রমজান আলীর নয়। বন্যার্তদের জন্য সরকারিভাবে যে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিছু কিছু এলাকায় ত্রাণের জন্য দেখা দিয়েছে হাহাকার। নৌকা দেখলেই মানুষ ত্রাণের নৌকা মনে করে এগিয়ে যাচ্ছে। পরে ত্রাণ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছে।

হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও উত্তরাঞ্চলে আরও ভয়াল রূপ ধারণ করছে বন্যা। এখনও লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় অনেকেই ছুটছে নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে। বন্ধ রয়েছে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ভাঙামোড়ে ওয়াপদা বাঁধে আশ্রয় নেওয়া বাবু মিয়া বলেন, এত পানি ম্যালা দিন হলো দেকিন্যা। পানি এ্যাংকে (এভাবে) করে বাড়ে সব শ্যাষ হবে ভাবিনি।

একটু এগিয়ে যেতেই বাঁধ এলাকায় চোখে পড়ল বাস্তুহারা মানুষের লম্বা লাইন। কেউ ভেজা আসবাবপত্র শুকানোর চেষ্টা করছেন, কেউবা রশি দিয়ে বাঁশ আর পলিথিন কিংবা টিনের চালা তৈরি করে মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজছেন। কচুয়াহাট থেকে ভরতখালী হয়ে কুকড়াহাট পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার বাঁধের উঁচু সড়কে এভাবেই শুধু বানভাসি মানুষের ভিড়। এছাড়া স্কুল মাঠে এবং শুকনো জায়গার অভাবে অল্প স্থানেই প্রায় তিন হাজার পরিবার খোলা আকাশের নিচে বেঁচে থাকার পথ খুঁজছেন। বন্যার পানি টিনের চালের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বাড়িতে থাকার কোনো পরিস্থিতি নেই তাদের। কেউ ঘর ছেড়ে এসেছেন, কেউবা আবার টিনের চালা ভেঙে গরু-বাছুর নিয়েই বাঁধে এসেছেন। গরু-ছাগলের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকছেন।

গত চার দিন ধরে বন্যার পানি বৃদ্ধির পর গতকাল শনিবার কিছুটা কমেছে। বন্যায় হলদিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, বেড়া, গাড়ামারা, দীঘলকান্দি, পাতিলবাড়ি, গুয়াবাড়ি, কালুরপাড়া, কানাই পাড়া, কুমারপাড়া, জুমারবাড়ি ইউনিয়নের কাঠুর, থৈকরের পাড়া, পূর্ব আমদির পাড়া, ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চিনিরপটল, খামার পবনতাইড়, সাঘাটা ইউনিয়নের হাটবাড়ি, গোবিন্দী, বাঁশহাটা, দক্ষিণ সাথালিয়া, হাসিলকান্দি, ভরতখালি ইউনিয়নের বরমতাইড়, ভাঙ্গামোড়, পদুমশহরের স্কুল বাজার, ডিমলা, সাতটেকর, চকদাতেয়া, মুক্তিনগর, বোনারপাড়া ইউনিয়নের বাটি, দুর্গাপুর, রাঘবপুর, ভুতমারা, দলদলিয়া, ময়মন্তপুর, শিমুলতাইর, কালপানি, শাহারভিটা ও কচুয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর, গাছাবাড়ি, রামনগর, চনন্দনপাটসহ ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় দেড় লাখ মানুষ।

পদুমশহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তৌহিদুজ্জামান স্বপন জানান, নৌকা নিয়ে পানিবন্দি পরিবারগুলোকে উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

জামালপুরের বকশীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি সামান্য উন্নতি হলেও মানুষের মধ্যে দুর্ভোগ কমেনি। বন্যার পানি কিছুটা কমলেও বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বানভাসি এলাকায় এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী না দেওয়ায় মানুষের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়েছে। নৌকা দেখলেই মানুষ ত্রাণের নৌকা মনে করে এগিয়ে যাচ্ছে। পরে ত্রাণ না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।

গত ছয়দিনের ভয়াবহ বন্যায় বকশীগঞ্জ উপজেলার একটি পৌরসভাসহ সাতটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। এর মধ্যে সাধুরপাড়া ইউনিয়ন, বগারচর, নিলক্ষিয়া ও মেরুরচর ইউনিয়নের শতভাগ গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়। বাকি বাট্টাজোড়, ধানুয়া কামালপুর ও বকশীগঞ্জ সদরের ৯০ ভাগ গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যায়। এছাড়াও পৌর এলাকার ৭০ ভাগ গ্রাম প্লাবিত হয়। ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে বকশীগঞ্জ উপজেলার দেড় লাখ মানুষ। বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে গত তিন দিনে শিশু-কিশোরসহ ছয় জন মারা গেছে এবং একজন নিখোঁজ হয়েছে।

সাধুরপাড়া ইউনিয়নের বিলেরপাড় গ্রাম, ডেরুরবিল, বাংগাল পাড়া, চরগাজীরপাড়া, কতুবেরচর, চরকামালের বার্তী, তালতলা, মদনের চর, ঠান্ডারবন্দ, দাসপাড়া, নিলেরচর , উত্তর আচ্চাকান্দি গ্রামের মানুষ অসহায় ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শুকনো খাবার সংকট থাকায় এসব গ্রামের মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন।

মেরুরচর ইউনিয়নের ঘুঘরাকান্দি গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের ঘরে ঘরে পানি উঠায় তারা রান্না করতে পারছে না। গত তিন ধরে না খেয়ে আছে তারা। এছাড়াও মেরুরচর, বগারচর, নিলক্ষিয়া এলাকায় ত্রাণের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন থেকে ৬০ টন চাল ও দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

বকশীগঞ্জ উপজেলায় এবারের বন্যায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হলেও শুধুমাত্র দেওয়া হয়েছে ৬০ চাল ও দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার। সব মিলিয়ে ১০ হাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

এছাড়াও পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা না থাকায় হতাশ হয়েছেন বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে বানভাসিদের পাশে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। যেদিকেই ত্রাণের নৌকা নিয়ে যাওয়া হয় সেদিকেই হাহাকার করে বানভাসি মানুষ। বিশেষ করে সাধুরপাড়া, মেরুরচর, বগারচর, নিলক্ষিয়া ইউনিয়নে বন্যার খারাপ অবস্থা বিরাজ করায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ত্রাণের জন্য মানুষের চাহিদা থাকলেও তা সবাইকে দেওয়া যাচ্ছে না। বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নলকূপ পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানি পান করতে পরছে না বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ। পাশাপাশি স্যানিটেশন ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা। বন্যায় ভেঙে গেছে রাস্তাঘাট। চলাচলের জন্য ভেলা অথবা নৌকা ছাড়া ঘর হতে বের হতে পারছে না বানভাসি মানুষ।

বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাসান মাহবুব খান বলেন, এখন পর্যন্ত ১০ হাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আশা করি আরও কিছু ত্রাণ দিতে পারব।

বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টের পানি মাপক গেজ পাঠক আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, যমুনার পানি কমতে শুরু করেছে। শনিবার সকালে যমুনার বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১৩৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান টিটু জানিয়েছেন, বন্যায় উপজেলার ৩৬ হাজার ৩৬০টি পরিবারের এক লাখ ৮০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ২৪০ টন চাল, চার হাজার ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, চার হাজার প্যাকেট খিচুড়ি, পাঁচ হাজার পিস রুটি, এক হাজার প্যাকেট শিশু খাদ্য, এক হাজার প্যাকেট গো-খাদ্য ও ৫০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে।

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় নতুন নতুন এলাকা প্রালাবিত হয়েছে। নদী ভাঙনের তীব্রতাও দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে নদী ভাঙন রোধ করতে পারছে না। পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁর চরাঞ্চলের নারিকেলবাড়িয়া, চর নাছিরপুর, চর মানাইড়, ঢেউখালী ও আকটেরচর আংশিক এলাকাসহ পাঁচটি ইউনিয়নে বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত এক সপ্তাহে উপজেলার চর মানাইড় ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে জাজিরাকান্দি, আদিলউদ্দীন মোল্যা কান্দি, আমির খাঁ কান্দি, কালাই মাতুব্বর কান্দি গ্রামের মূল্যবান গাছপালা, ফসলি জমি, শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি নেমে আসায় শরীয়তপুর জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্যার পানিতে নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর, মোক্তারের চর ও রাজনগর ইউনিয়নের নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া এলাকায় চরাঞ্চলের বাড়ির আঙ্গিনা পানিতে তলিয়ে গেছে। রাস্তাঘাটের নিচু জায়গায় পানিতে প্লাবিত।

বন্যার পানিতে নড়িয়া উপজেলার ঈশ্বরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শেহের আলী মাদরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চেবেকা গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরজপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ডুবে গেছে। এছাড়া জাজিরা উপজেলার পাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইয়াছিন মাদবরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাজিয়ার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাজিয়ার চর ছমির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্লাবিত হওয়ায় বিদ্যালয় বন্ধ করে অন্যত্র পাঠদান চলছে। জেলার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২-৩ দিনের মধ্যে বন্যা দেখা দিবে।

গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি ধীর গতিতে হ্রাস পেলেও করতোয়া নদীর পানি এখনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ এলাকায় বাঙালী নদীর পানি তোড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যা কবলিত এলাকার পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি সংকট, স্যানিটেশনের অব্যবস্থা, গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

গাইবান্ধা রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, ত্রিমোহিনী থেকে বোনারপাড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রেললাইনের অবস্থা খারাপ থাকায় আন্তঃনগর লালমনি এক্সপ্রেস ও রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন বিকল্পভাবে রংপুর-পার্বতীপুর-সান্তাহার হয়ে ঢাকায় চলাচল করছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা য়ায়, বন্যায় এ পর্যন্ত জেলার সাতটি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি গ্রামের চার লাখ ৮৫ হাজার সাড়ে ৩০০ লোক এবং ৪৪ হাজার ৭৯২টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৭৪ হাজার ১০৪ জন আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় ৫৭৫ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা এবং ২৩৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৬৩ কিলোমিটার বাঁধ, ২১টি কালভার্ট এবং ১০ হাজার ৮৩৩ হেক্টর আবাদি জমি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ১৭৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ২৬৪টি মাদ্রাসা পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় শিক্ষাদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বন্যায় পুকুরগুলো ডুবে যাওয়ায় দুই হাজার ৯৪১টি পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি কিছুটা হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ১২৫ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

এছাড়া করতোয়া নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার তিন সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

যমুনা-ধলেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে টাঙ্গাইলের নাগরপুরের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এ দুই নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে উপজেলা সদরের বিভিন্ন পয়েন্টে পানি ঢুকে পড়েছে।

উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ অফিসের তথ্যমতে, যমুনা-ধলেশ্বরী নদীর পানিতে সৃষ্ট বন্যায় নাগরপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার কলমাইদে বন্যার পানিতে ডুবে কলমাইদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিবুলের মৃত্যু হয়েছে। সে কলমাইদ গ্রামের আমিনুরের ছেলে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন পুকুর, জলাশয় এবং খামারের মাছ ভেসে এবং পাড় ভেঙে প্রায় কোটি টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বন্যার কারণে উপজেলার ৬৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে এবং অনেক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

এদিকে সলিমাবাদ-ধুবড়িয়া সড়কের তেবাড়িয়া কালীবাড়ি সামনের বেইলি ব্রিজ বন্যার পানির স্রোতে ভেঙে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া নাগরপুর-চৌহালী, নাগরপুর-ধল্লা, নাগনপুর-বাটরা সড়কসহ নাগরপুর উপজেলার সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নের সংযোগ সড়কে বন্যার পানি উঠে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে টাঙ্গাইল-আরিচা আঞ্চলিক মহাসড়ক ও নাগরপুর-মির্জাপুর ভায়া মোকনা সড়ক। এসব সড়কে বন্যার পানি উঠে যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যার পানিতে অনেকের বীজতলা, সবজি ও পাটের আবাদ তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে বন্যাদুর্গত চরাঞ্চল এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি, গো- খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার পানি উঠায় অনেকেই ঘর বাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফয়েজুল ইসলাম বলেন, প্লাবিত এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে উঠার পরামর্শ দিয়েছি। এছাড়া তাদের মাঝে শুকনো খাবার, চাল, ডাল বিতরণ করেছি। তিনি ধৈর্য্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবেলার আহ্বান জানান।

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনার পানি কমলেও বাঙালী নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনা ও বাঙালী উভয় নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বাঙালী নদীর প্রবল স্রোতে জোড়গাছা সেতুর সংযোগ সড়ক ধসে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদারের মাধ্যমে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাছান মাহমুদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি কমে গতকাল শনিবার বিকেল ৩টায় বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং বাঙালী নদীর পানি ১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। উজানে গাইবান্ধায় বাঁধ ভাঙার কারণে যমুনার পানি এসে বাঙালী নদীতে প্রবেশ করায় বাঙালী নদীর পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যমুনার পানির উচ্চতার সঙ্গে বাঙালী নদীর পানির উচ্চতা সমান হলে বাঙালী নদীর পানিও কমতে শুরু করবে।

বন্যাদুর্গতদের মাঝে সরকারি ভাবে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত আছে এবং বেসরকারি ভাবে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহম্মেদ কালিতলা গ্রোয়েন বাঁধ এবং কুড়িপাড়া চরে ৯০০ পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেন।

কুড়িগ্রামে বন্যার পানি ধীর গতিতে কমতে শুরু করায় দুর্ভোগ বেড়েছে বানভাসিদের। নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ বাড়িঘর তলিয়ে থাকায় এবং পার্শ্ববর্তী কোনো উঁচু জায়গা না থাকায় পানিবন্দিরা পরিবার পরিজন নিয়ে ডিঙ্গি নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় অবর্ণনীয় কষ্টে বসবাস করছেন। দুর্গম চরাঞ্চলগুলোতে এ চিত্র আরও ভয়াবহ।

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ, সাহেবের আলগা, হাতিয়া, কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুরসহ ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি চরের অধিকাংশ মানুষ শুকনো জায়গায় স্থান না পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে নৌকা ও ভেলায় বসবাস করছে। শুধুমাত্র ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার প্রায় দুই শতাধিক দুর্গম চরাঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার ১০ থেকে ১২ দিন ধরে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া বাড়ি ঘরের পাশেই নৌকায় বসবাস করছেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments