ঢাকার নদীপাড়ে ৪৩০০ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঢাকার চারপাশের নদীকে আপনরূপে ফিরিয়ে দিয়ে পরিকল্পিত নগরী গড়তে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্বে নেমেছে সরকার। ইতোমধ্যে ৪ হাজার ১৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১১৩ একর ভূমি উদ্ধার করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়।

উদ্ধারকৃত ভূমিতে স্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপনের পর এখন চলবে ওয়াকওয়েসহ সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। নতুন করে আরও নদীপাড়ে ৪৩০০ অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। রোজা, ঈদের কারণে টানা তিন মাস স্থগিত থাকলেও আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তথ্য মতে, ৪ হাজার ৩শ অবৈধ স্থাপনার মধ্যে স্থানীয়সহ রাজনৈতিক প্রভাবশালীর স্থাপনাও রয়েছে। তারা বিভিন্নভাবে অভিযান ব্যাহত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে সরকারিভাবে যত প্রভাবশালীই হোক, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্তে অনড় মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে কঠোর থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, নতুন করে আরও ৪ হাজার ৩শ অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে বিআইডব্লিউটিএ। অবৈধ ওইসব স্থাপনার মধ্যে— ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ফল ও সবজির দোকান, স্থানীয় কাপড় ও ঝুট ব্যবসা, বিভিন্ন প্রকার শিল্প-কারখানা এবং নদীর তীরভূমিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে অন্তত দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রভাবশালী।

গত ২৮ মে অনুষ্ঠিত ঢাকার চারপাশে নদী ও তীরভূমি দখলমুক্ত, নদীর দূষণরোধ করতে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে ‘ক্রস ডিসকাশন’ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উচ্ছেদের কৌশল নির্ধারণ করে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত হয়।

সভায় ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে একটি কর্ম পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। সভায় জানানো হয়— গত ২৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযানে ৪ হাজার ১৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। ১১৩ একর ভূমি উদ্ধার, ২৬ লাখ টাকা জরিমানা এবং নিলামের মাধ্যমে আরও ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।

সূত্র মতে, ওই সভায় ঢাকা নদী দূষণের জন্য ১৮-২০টি কারণ চিহ্নিত করে এগুলো সমাধানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, শিল্প মন্ত্রণালয়, ঢাকা ওয়াসা, পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আরও কি ধরনের সমস্যা তৈরি হয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরি করে প্রতিবেদন আকারে নৌ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

গত ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ঢাকার চারপাশের নদীসমূহ ও তীরের অবৈধ দখলদার অপসারণ কার্যক্রমের সর্বশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রীর কড়াককড়ি নির্দেশনা এবং হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নে ঢাকা শহরের চারদিকে নৌপথ দখলমুক্ত করতে অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত হয়।

একইসঙ্গে উদ্ধারকৃত ভূমিতে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ সৃষ্টি এবং ওয়াক ওয়ে নির্মাণে সরকার ৮৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করারও সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে নৌ সচিব জানান— নদী তীরে যত্রতত্র ধর্মীয় উপাসনালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন নদীতে সংযোগ দেয়া, নদী পাড় দখল করে ফল ও সবজির বাজার স্থাপনসহ নৌযানের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হয়, যা নদীর পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে।

এরপর যারা বা প্রতিষ্ঠান নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলছেন, তা বন্ধসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় ওই বৈঠকে। বৈঠকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, রাজউক, ভূমি মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবর রহমান। সভায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সমন্বয়ে ঢাকার আশপাশের নদীর তীরবর্তী সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সমন্বিতভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়।

নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, দখলমুক্ত করার পর নদীর চারপাশে স্থায়ী আরসিসি সীমানা পিলার স্থাপন, সীমানা বরাবর ওয়াকওয়ে উইথ কিওয়াল এবং ওয়াকওয়ে উইথ পাইল নির্মাণ করা হবে। প্রশস্ত জায়গায় পর্যটন বান্ধব ইকোপার্ক, বসার বেঞ্চ, ছাতা, ঘাট ও জেটি নির্মাণ করা হবে।

এসব উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য ইতোমধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। সভায় নদীতে অনুমোদিতভাবে ভরাটকৃত মাটি খননের মাধ্যমে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত হয়। আর নদী দূষণরোধে নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পন্টুন কেনার প্রকল্পের আওতায় নদীর তলদেশ থেকে দূষিত বর্জ্য অপসারণের জন্য ৫টি বিভার ক্লিনিং ভেসেল কেনা হবে।

৩৫টি ড্রেজার কেনার প্রকল্পের আওতায় নদীর তলদেশে থেকে দূষিত বর্জ্য অপসারণের জন্য ২টি গ্রাব ড্রেজার কেনার সিদ্ধান্ত হয়। নদীর পাড়ে সলিড বর্জ্য রাখার জন্য ডাস্টবিন নির্মাণ করা হবে। অবশিষ্ট ১৫০ কিলোমিটার নদীর তলদেশ থেকে দূষিত বর্জ্য অপসারণের জন্য ৩য় পর্যায়ের প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।

নদী দূষণের জন্য বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে সভায়। লঞ্চ, স্টিমার থেকে ফেলা বর্জ্য, ওয়াসার অপরিশোধিত বর্জ্য, খোলা ড্রেন, শিল্প কারখানার থেকে দূষিত পানি, ট্রেক্সটাইল ডাইং, প্রিন্টিং ওয়াসিং এবং ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে নির্গত বর্জ্য অন্যতম।

সভায় ঢাকা নদীর দূষিত হওয়ার জন্য বেশ একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয় নৌ মন্ত্রণালয় থেকে। সেখানে বলা হয়, ঢাকার চারপাশে ৭ হাজার কারখানা থেকে দেড় কিউবিক মিটার দূষিত পানি চারটি নদীতে যায়। প্রায় শূন্য দশমিক ৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার দূষিত পানি অন্যান্য উৎস থেকে নদীতে আসে।

আর প্রতিদিন ৩০০ নির্গমন পথ দিয়ে দূষিত পানি ঢাকার চারপাশে নদীতে যাওয়া পানি মারাত্মক আকারে দূষিত হচ্ছে। দুটি সিটি কর্পোরেশনের ৪৯৫টি খোলা ড্রেন এবং ৫০০টি কাভার্ড ড্রেন দিয়ে প্রতিদিন সার্ফেস ওয়াটার ওয়াসার স্যুয়ারেজ পাইপ লাইনের সাথে মিশে এক হয়ে নদীতে পতিত হয়।

ফলে নদীর শতকরা ৬১ ভাগ দূষিত হয় শিল্প-কারখানার তরল দূষিত বর্জ্য এবং শতকরা ৩৯ ভাগ দূষিত হয় গৃহস্থালীসহ অন্যান্য বর্জ্যে। প্রতিদিন ৬০ হাজার কিউবিক মিটার বিষাক্ত পানি টেক্সটাইল ডাইং, প্রিন্টিং ওয়াসিং এবং ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে নির্গত হয়। এসব দূষণরোধ করতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এসব উদ্যাগ বাস্তবায়নে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে আছে সলিড বর্জ্যগুলো বিজ্ঞান সম্মতভাবে রিসাইক্লিন, ট্রান্সফর্মেশন ও রিইউজ এবং বর্জ্য ডাম্পিংয়ের জন্য সুবিধাজনক জায়গা খুঁজে বের করার জন্য ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে সমাধান করতে হবে।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ আমরা সংবাদকে বলেন, নদীর তীরের ৪ হাজার ৩শ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই অভিযান শুরু হবে। এসব স্থাপনার মালিকরা যতই প্রভাবশালী হোক, আগেও কোনো চাপ নেয়া হয়নি, আগামীতেও হবে না।

তিনি বলেন, আগের উচ্ছেদ অভিযানে যেসব জায়গা উদ্ধার হয়েছে, সেগুলোতে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হবে সহসাই। এজন্য ইতোমধ্যে টেন্ডার হয়ে গেছে। উদ্ধার হওয়া কোনো জায়গাই পরিত্যক্ত রাখা হবে না।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box