ঢাকাই চলচ্চিত্রের বড়ই দুর্দিন

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বহুমুখী সঙ্কট আর সংশ্লিষ্ট মহলের উদাসিনতায় চলছে ঢাকাই চলচ্চিত্রের বড়ই দুর্দিন। কমে যাচ্ছে ঢাকাই চলচ্চিত্রের নির্মাণ। ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ছিল ৫৬। তার পরের বছর ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩৫-এ। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে ১৮। বছরের বাকি সময়টাতে বড় জোর ১০-১২টি মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

চলতি বছরে ১৮টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৩টি মুক্তি পায় ছোটপর্দায় অর্থাৎ টেলিভিশন চ্যানেলে। একটি ইউটিউব চ্যানেলে। বাকিগুলো প্রেক্ষাগৃহে। এরমধ্যে শুধু ব্যবসাসফল হয়েছে মাত্র দুইটি চলচ্চিত্র ‘পাসওয়ার্ড’ ও ‘আব্বাস’। বাকি আর কোনোটারই এখন পর্যন্ত মূলধন ফেরত আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

২০১৮ সালে নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে দুই শতাধিক নাম নিবন্ধিত হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই নিবন্ধিত হয় প্রায় ৩৮টি চলচ্চিত্র। সেই তুলনায় চলতি বছরের (২০১৯) গত সাত মাসে মাত্র ৫৫টি চলচ্চিত্রের নাম নিবন্ধন হয়েছে। শুটিং শুরু হয়েছে মাত্র ২০টির। যেখানে গত বছরের প্রথম দুই মাসে ১২টির মতো শুটিং শুরু হয়েছিল।

এসব কারণে হতাশায় ভুগছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী ও প্রদর্শকরা। কাজের অভাবে নির্মাতা ও শিল্পীরা বেকার থাকছেন বছরের পর বছর। ব্যবসা না করায় একের পর এক সিনেমা হল বা প্রেক্ষাগৃহও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রেক্ষগৃহের মধ্যে এখন কোনওমতে টিকে আছে ২৫০টি।

প্রেক্ষাগৃহ বাঁচাতে এখন প্রদর্শকরা ঝুঁকছেন বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির দিকে। কিন্তু তাতেও দর্শক সিনেমাহলমুখী হচ্ছেন না। বিদেশি পুরাতন চলচ্চিত্র দেশের হলে প্রদর্শন দর্শকের কোনও আগ্রহই নেই। এখন হল মালিকরা চেষ্টা আছেন বাইরের দেশ থেকে নতুন চলচ্চিত্র আমদানি করার বিশেষ করে সেসব চলচ্চিত্র মুক্তি পাবে একই সাথে বাংলাদেশেও। বলা হচ্ছে, প্রেক্ষাগৃহ বাঁচানোর এটি হচ্ছে সর্বশেষ উপায়।

আবার প্রেক্ষাগৃহ বা সিনেমা হল মালিকদের ব্যাপারেও অভিযোগ রয়েছে দর্শক, নির্মাতা, শিল্পী ও প্রযোজকদের। কারণ দেশের বেশিরভাগ সিনেমা হল বহু পুরনো। জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা হচ্ছে সিনেমা হলগুলো। সিনেমা দেখানোর যন্ত্রও পুরনো আমলের। যে কারণে দর্শক সঠিক সাউন্ড, পিকচারসহ সিনেমা উপভোগের ভালো পরিবেশ পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ বলেন, বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার চলচ্চিত্রকে অনেক উন্নত করেছে। চলচ্চিত্রের ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম হয়েছে। সিনেমাস্কোপ হয়ে স্ক্রিন অনেক বড় হয়েছে। অথচ সেই আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প একেবারেই বঞ্চিত। তবে তার জন্য কোনওভাবেই প্রযোজক, শিল্পী ও কলা-কুশলী দায়ী নন।

তিনি বলেন, সিনেমাস্কোপ বা ডিজিটাল সাউন্ড- এ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করার মতো অর্থ ও মেধার কোনও কমতি নেই। দেশে এ ধরনের প্রযুক্তিগত সুযোগ না থাকায় আমাদের অনেক নির্মাতা বিদেশে গিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় প্রযুক্তিগতভাবে এসব উন্নতমানের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য ঢাকায় হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশে আর কোনও প্রেক্ষাগৃহ নেই। আমার প্রশ্ন, তাহলে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প আধুনিক ও উন্নতমানের না হওয়া কিংবা বর্তমান চলচ্চিত্র সঙ্কটের জন্য দায়ী কারা? নির্মাতা নাকি প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা ?

চলচ্চিত্র প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু দৈনিক জাগরণকে বলেন, চলতি বছর বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। তবে সেগুলো ব্যবসাসফল ছিল না। এসব ছবি দেখতে দর্শক সেভাবে আসে নেই প্রেক্ষাগৃহে। তাহলে নতুন চলচ্চিত্রের কাজ শুরু হবে কীভাবে? লোকসান দিতে দিতে তো প্রযোজকেরও পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। সবার আগে আসলে সিনেমা হলের আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সেখানে আধুনিকায়ন দরকার, তা না হলে দর্শক শূন্যতায় ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাবে।

খোরশেদ আলম খসরু আরও বলেন, বর্তমানে ডিজিটালের নামে চলছে প্রতারণা। ইলেকট্রনিক প্রজেক্টর বসিয়ে প্রযোজকের কাছ থেকে নানাভাবে টাকা আদায় করছে সিনেমা হল মালিকরা। যদি সত্যিকারের ডিজিটাল ও সেন্ট্রাল ব্যবস্থা চালু করা যায় তাহলে দর্শক স্বাচ্ছন্দ্যে চলচ্চিত্র উপভোগ করতে পারবেন, পাইরেসিও বন্ধ হবে। রেন্টাল কমিয়ে সরকার, চলচ্চিত্রকার ও সাধারণ মানুষ মিলে টার্গেট করতে হবে ২০ টাকা হারে প্রতি টিকিটে ১ কোটি মানুষ চলচ্চিত্র দেখবে। না হলে চলচ্চিত্র ব্যবসায় কেউ আর বিনিয়োগ করবেন না।

চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াৎ আর প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরুর অভিযোগের ভিত্তিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, নির্মাতারা মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র দিতে পারছেন না অথচ প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কন্টেন্টই যদি না থাকে তাহলে সিনেমা হল বা সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করে কি লাভ? বছর কয়েক আগে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু সিরাজগঞ্জে একটি অত্যাধুনিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু মানসম্পন্ন চলচ্চিত্রের অভাবে এক বছর পূর্ণ না হতেই সেটি লোকসান গুনে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তাই আগে কন্টেন্ট দিতে হবে, পরে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। এমন অনেক কারণেই শিল্পটি এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারি অনুদানের অর্থ নিয়ে সব সময়ই নয়ছয় হয়। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ই শুধু নয়, মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ আর বাস্তবায়ন হয় না।

পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, লগ্নিকৃত টাকাই ফেরত পাচ্ছেন না প্রযোজক। তাহলে নতুন চলচ্চিত্র তৈরি হবে কিভাবে? চলচ্চিত্র মুক্তি দিতে গিয়ে পরিবেশকের ঘর থেকে প্রেক্ষাগৃহ পর্যন্ত পথে পথে প্রযোজক লোকসান গুনছেন। এই মুহূর্তে চলচ্চিত্র পরিবেশনের পদ্ধতি পরিবর্তন করা না হলে এই শিল্পের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। চলচ্চিত্র মুক্তি দেয়ার সময় বিভিন্ন এজেন্ট, হলের অসৎ কর্মকর্তাদের দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।

সিনেমা হলের পরিবেশ নিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ও মধুমিতা হলের মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, সিনেমা হলের পরিবেশ ভালো নয়- কয়েক যুগ ধরে এই একটি অজুহাতই দিচ্ছেন অনেকে। এ খারাপ পরিবেশেও কিন্তু অনেক চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হয়েছে।ভাইজান এলো রে, দেবী, পোড়ামন ২, আয়নাবাজি, ঢাকা অ্যাটাক, শিকারী দেখতে দর্শক হলে এসেছিলেন। সে সময় কি হলের পরিবেশন ভালো ছিল? তারপরও তো দর্শক এসেছিলেন চলচ্চিত্রগুলো দেখতে। ভালো গল্পের ভালো চলচ্চিত্র পেলে দর্শক আসবেন। আর হল মালিকরা টাকা পেলে তখন হল সংস্কারও করতে পারবেন। টাকা না পেলে ব্যবসা না হলে আমরা কীভাবে হল সংস্কারের কাজ করবো। তারপরও যতটা সম্ভব আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার মধুমিতা হলের পরিবেশ অনেক ভালো এখন। কিন্তু ক্রমাগত লোকসানে থাকলে তো ব্যবসা থেকে মনটা উঠে যায় আমাদের।

চিত্রনায়ক ফেরদৌস বলেন, সিনেমা হলের অপ্রতুলতা, ভালো পরিবেশক না থাকায় ঢাকার চলচ্চিত্রের সঙ্কট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। সিনেমা হলের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। যেগুলো আছে, সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগেই পরিবার-পরিজন নিয়ে চলচ্চিত্র দেখার পরিবেশ নেই। এখন সময় এসেছে সিনেমাহলগুলো সংস্কার করার। সেই সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার নীতিমালাও সহজ করা প্রয়োজন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments