ডেঙ্গুঝুঁকিতে পুরো ঢাকা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সারা ঢাকা শহর ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে অবস্থানরত শতাধিক শিক্ষার্থী আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উঠেছে ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণার দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে (ডিইউএমসি) বেড়েছে রোগীর চাপ। স্থাপন করা হচ্ছে রক্তের প্লাটিলেট পরিমাপের যন্ত্র।

এদিকে, ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য সব ধরনের পরীক্ষার সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে রাজধানীর সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কলাম আজাদ গতকাল রোববার বিকালে মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদফতরে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জরিপের ডেটা সংগ্রহের কাজ আমরা গতকাল শেষ করেছি। সব কাজ শেষ হওয়ার পর আমরা এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে জানাতে পারব। তবে এখন পুরো ঢাকা শহরই ঝুঁকিপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক জানান, প্রতিটি হাসপাতালে একটা করে হেল্প ডেস্ক বসবে। ডেঙ্গু আক্রান্তরা এই হেল্প ডেস্কে গিয়ে যেকোনো তথ্য নিতে পারবেন। এ ছাড়া হাসপাতালগুলো মনিটর করার জন্য ১০টি মনিটরিং টিম করা হবে, প্রতি টিমে তিন সদস্য করে থাকবেন, যারা ডেঙ্গুর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মনিটর করবেন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরকে অবহিত করবেন।

তিনি আরো বলেন, সেবার ব্যাপারে কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মালিক সমিতিও এসব ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন বলেন জানান তিনি।

এদিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা আরো বেড়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত ৮২৪ জন গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা) দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ৬৮৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।

অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে রোববার পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১১ হাজার ৬৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী। এ সময়ের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮ হাজার ৭২৫ জন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে এলেও সরকারি হিসাবে এখনো মৃতের সংখ্যা আটজন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে মিটফোর্ডে ৭২ জন, শিশু হাসপাতালে ২৬, সোহরাওয়ার্দীতে ৩২, হলি ফ্যামিলিতে ৩৭, বারডেমে ১৭, পুলিশ হাসপাতালে ২১, মুগদা মেডিকেলে ৬৭, বিজিবি হাসপাতালে ৬ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ জন ডেঙ্গু রোগী গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগে ৩৬ জন, চট্টগ্রামে ৩৬, খুলনায় ১২ এবং রাজশাহী বিভাগে ৫৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি রোগীরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বদলে অবহেলার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। সেখানে ভর্তি থাকা ডেঙ্গু আক্রান্ত সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী আলমগীর কবির প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বেশ কয়েক দিন ধরে এখানে ভর্তি আছি। ডাক্তাররা ঠিকমতো দেখতেও আসেন না। ওয়াশরুমের অবস্থাও খারাপ। সব মিলিয়ে খুব বাজে অবস্থার মধ্যে যাচ্ছি।’

এ বিষয়ে অভিহিত করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সারওয়ার জাহান মুক্তাফি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমি প্রতিদিনই খবর নিচ্ছি। স্টাফ-ক্লিনারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আশা করি, আগামীকালের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান করা যাবে।’

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলায় ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে রয়েছে বিস্তারিত :

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে দুজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এদের একজন ভারই দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রিমা সুলতানা, অন্যজন গোবিন্দাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আকরাম হোসেনের স্ত্রী ফাতেমাতুজ্জহুরা। শিক্ষিকা রিমা সুলতানা ঢাকার একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে এবং ফাতেমাতুজ্জহুরা টাঙ্গাইল সোনিয়া ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৭ রোগী। গত মঙ্গলবার থেকে রোববার পর্যন্ত এই সাতজন সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানান, মহানগরীতে গতকাল রোববার নতুন সাতজনসহ জেলায় মোট ৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আগের ২৬ জনের সঙ্গে নতুন দুজনসহ মোট ২৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ জন সুস্থ হয়ে চলে গেছে, বাকি ১৮ জন বর্তমানে মেডিকেলের ১৩, ১৪ ও ১৬নং ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জে কলেজছাত্রসহ পাঁচজন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। এদের মধ্যে দুজনকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, ঝালকাঠির রাজাপুরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিগার সুলতানা (৩৫) নামে এক স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহে গত ২২ দিনে ১৮ জন ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সদর হাসপাতালে ১১ জন, কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৪ ও শৈলকুপায় তিনজনের খোঁজ পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ঢাকায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কুড়িগ্রামে ফিরে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন দুই ডেঙ্গু রোগী। ২৭ ও ২৮ জুলাই দুই দিনে দুই রোগী কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু মো. জাকিরুল ইসলাম।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত সাত দিনে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ জন। এর মধ্যে ১৫ জন চিকিৎসা নিচ্ছে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালে। গুরুতর অবস্থা হওয়ায় দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং বাকি দুজন সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছে।

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন মোট ১১ জন। এদের মধ্যে মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন দুজন। অন্য দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় এরা বর্তমানে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, পাবনায় ২৫০ শর্য্যাবিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় মহিলা ও শিশুসহ ৯ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এ নিয়ে গত ৬ দিনে ২৯ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে ভর্তি করা হয়েছে।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ২৯ জন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মেডিসিন বিভাগে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন ভর্তি হয়েছে।

শেরপুর প্রতিনিধি জানান, শেরপুর জেলা হাসপাতালে ২৮ জুলাই রোববার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরো দুই ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এনিয়ে জেলা হাসপাতালে পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলে ৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জনই ঢাকা থেকে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়। অপরজন টাঙ্গাইলে আক্রান্ত হয়েছে। গতকাল রোববার হাসপাতাল সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments