টের পাচ্ছে বিশ্ব

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিরূপ আবহাওয়ার কবলে পড়েছে গোটা বিশ্ব। একদিকে তুমুল বৃষ্টি-বন্যা-খরা, আরেকদিকে চলছে ভয়াবহ দাবানল আর অগ্নুৎপাত। আবার একই সময়ে পৃথিবীর নানা অঞ্চল স্থবির হয়ে পড়ছে তুষারপাতে। মেরু অঞ্চলের বাইরেই ঠাণ্ডায় জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে বড় বড় নদী ও সাগর। দিন যত গড়াচ্ছে এভাবেই বিশ্ব টের পাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ। উষ্ণায়নের প্রভাবেই বিশ্বজুড়ে এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে জানিয়ে বিজ্ঞানীরা উন্নত দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অবিলম্বে পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বিশ্বকে।

চলতি সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির মতো জায়গা সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। হোয়াইট হাউসের বেসমেন্ট পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে বানের পানি। যা আগে কখনোই ঘটেনি। ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় গত মাসেই চীনে মারা গেছে অন্তত ৬১ জন। জাপানের পশ্চিমাঞ্চচলেও বৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এ সপ্তাহে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে মারা গেছে অন্তত ১৮০ জন। পার্শ্ববর্তী ভারতে একই সময়ে এক রাজ্যে চলছে খরা আরেক রাজ্যে চলছে বন্যা পরিস্থিতি।
নেপালে বৃষ্টিপাতের কারণে শুরু হয়েছে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস।

অপরদিকে ইউরোপের জার্মানিতে চলছে ভয়াবহ তাপদাহ, যা থেকে দেশটির কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের বনাঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এসব দুর্যোগকে অদূর ভবিষ্যতের ‘পূর্বাভাস’ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। জাতিসংঘে জলবায়ু নিয়ে কাজ করেন এমন বিজ্ঞানীদের সংগঠন ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)সম্প্রতি গবেষণা করে দেখিয়েছে, ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সমুদ্রে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ ঝড়, বন্যা এবং খরা দেখা দিতে পারে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে। আইপিসিসির প্রধান হোয়েসাং লি বলেছেন, ‘মানব ইতিহাসের জন্য আগামী কয়েকটা বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি, আপনাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছি। এখন প্রতিটি দেশের সরকারের দায়িত্ব নিজেদের দায়িত্ব পালন করা।’

আইপিসিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ভয়াবহতা খুব দ্রুতই টের পাবে বিশ্ববাসী। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিসের নির্বাহী পরিচালক জেনিফার মর্গান বলেছেন, ‘বিজ্ঞানীরা অদূর ভবিষ্যতের জন্য যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেসব ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটতে শুরু করেছে।’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে সর্বগ্রাসী তা ইতোমধ্যে টের পাচ্ছে বিশ্ববাসী। অন্তত কয়েকদিনের ঘটনা থেকেই এটা অনুমান করা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে শুধু অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশগুলোই মোকাবেলা করছে এমন নয়, উন্নত দেশগুলোও এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির মতো জায়গা সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। হোয়াইট হাউসের বেসমেন্ট পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে বানের পানি। এমন পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়েছে দেশটির আবহাওয়া দফতর। এর আগে গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ভয়াবহ তুষারপাতে স্থবির হয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্য। কোটি কোটি মানুষকে পোহাতে হয়েছে চরম ভোগান্তি।

সর্বশেষ খবর- দেশটির লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে মৌসুমি ঝড় ব্যারি। এ অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত মাসের মধ্যবর্তী সময়ে চীনের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে ভারী বর্ষণ ও বন্যায় মারা গেছে অন্তত ৬১ জন। ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে আরো ৩ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ। বন্যায় ধসে পড়েছে অন্তত ৯ হাজার ৩০০ ঘর। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৭ লাখ ১০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি। সব মিলিয়ে বন্যায় দেশটির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১৯৩ কোটি ডলারে। প্রতিবছরই গ্রীষ্মকালে উত্তরাঞ্চলে নিয়মিত খরা ও দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার শিকার হয় চীন।

প্রায় একই সময়ে তীব্র দাবদাহে পুড়েছে ইউরোপ। বিশেষ করে এ সময় জার্মানিতে তাপমাত্রা একশ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। শুষ্ক এ আবহাওয়ায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের জঙ্গলে দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। জার্মান সরকারের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১৮ সালে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের বন-জঙ্গলে মোট ১৭শ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে; যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি। দেশটিতে সাধারণত শীতকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বনাঞ্চলগুলো। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহের খবরে জানা গেছে, তীব্র গরমে জার্মানির অঙ্গরাজ্য মেকলেনবুর্গ ফরপর্মান ও ব্রান্ডেনবুর্গের ৫টি স্থানে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।

এ মাসের শুরু থেকে সবথেকে বিরূপ ও বিপজ্জনক আবহাওয়া পরিস্থিতি বিরাজ করছে পার্শ্ববর্তী ভারতে। একই সময়ে দেশটিতে বন্যা ও খরা একসঙ্গে চলছে। মাসের প্রথম সপ্তাহে মুম্বাইয়ে প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় মারা গেছে অন্তত ৪০ জন। জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের প্রথম পাঁচ দিনের টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে মুম্বাইসহ গোটা মহারাষ্ট্র। মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতের আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও ভয়াবহ আকার নিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। গতকাল শনিবার দেশটির বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, টানা বৃষ্টির কারণে আসামের ৩৩টি জেলার মধ্যে বন্যায় ডুবে গেছে ২১টি। ব্রহ্মপুত্রের বিধ্বংসী স্রোতে রাজধানী গুয়াহাটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে জেলাগুলোর। বন্যায় এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ লাখ। প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে ব্রহ্মপুত্র-সহ ১০টি নদীর জল বইছে বিপদসীমার ওপর দিয়ে।

প্রবল বৃষ্টি ও বন্যায় রাজ্যটির প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি তলিয়ে গেছে পানিতে। রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ বিপর্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি গোটা আসামজুড়ে বন্ধ রাখা হয়েছে ফেরি পরিষেবাও। ৬৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে এরই মধ্যে আশ্রয় নিয়ে অন্তত ১০ হাজার মানুষ। এছাড়া আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে আরো প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ। আসামে যখন বৃষ্টি ও বন্যার মতো দুর্যোগ চলছে ঠিক তখনই দেশটির আরেক রাজ্য তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে চলছে ভীষণ খরা। সেখানে সৃষ্টি হয়েছে জলসংকট। সে সংকট কাটাতে গত শুক্রবার ২০ লাখ ৫০ হাজার মিলিয়ন লিটার জল নিয়ে একটি ট্রেন পাঠিয়েছে ভারত সরকার। চেন্নাইয়ে জলের চাহিদা মেটাতে আরও জল নিয়ে ট্রেন পাঠানো হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে, চার মাস ধরে চূড়ান্ত জল সংকটে ভুগছে চেন্নাই। কারণ টানা ২০০ দিন চেন্নাইয়ে একটুও বৃষ্টি হয়নি। তীব্র গরমে জলসংকট চরমে পৌঁছেছে। প্রতিদিন জলের যে চাহিদা রয়েছে তার থেকে ২০ কোটি লিটার কম জলের জোগান হয় চেন্নাইয়ে। কিছু দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে এ সংকট আরও ভয়াবহ আকার নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারত ছাড়াও হিমালয় কন্যা পার্শ্ববর্তী নেপালে গত বৃহস্পতিবার থেকে একটানা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা ও ভূমিধস শুরু হয়েছে। গতকাল পাওয়া খবরে জানা গেছে, বৃষ্টির কারণে দেশটির ৭৭টি জেলার মধ্যে ২০টি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্রবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেশজুড়ে ১৫ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে আহত হয়েছেন আরো ১৩ জন, নিখোঁজ ছয়জন।

এদিকে এশিয়ার আরেক দেশ জাপানেও চলছে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে ভারী বর্ষণ, বন্যা ও ভূমিধসে মৃত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৭৯-তে পৌঁছেছে। এখনো অনেকে নিখোঁজ। হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আটকে পড়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গত বুধবার দুর্যোগকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। দুর্যোগের কারণে বাতিল করেছেন বিদেশ সফর। প্রবল বর্ষণে বন্যার কারণে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ছে সেখানে।

জার্মানির রুহর বিশ্ববিদ্যালয় বোখাম এবং ডেভেলপমেন্ট হেল্প অ্যালায়েন্স নামে একটি জার্মান বেসরকারি মানবিক সংস্থা যৌথভাবে একটি গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণাপরবর্তী প্রতিবেদনে তারা ১৭২টি দেশের ভূমিকম্প, সুনামি, হারিকেন এবং বন্যার ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ১৫টি দেশ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়, যেখানে বাংলাদেশ রয়েছে নবম স্থানে। ওই ১৫ দেশ হলো- ভানুয়াতু, টোঙ্গা, ফিলিপিন্স, সোলোমন আইল্যান্ড, গায়ানা, পাপুয়া নিউগিনি, গুয়েতেমালা, ব্রুনেই, বাংলাদেশ, ফিজি, কোস্টারিকা, কম্বোডিয়া, পূর্বতিমুর, এল সালভাদর ও কিরিবাতি। উল্লিখিত তালিকার ৯টিই দ্বীপদেশ।

পরিবেশবাদী সংগঠন জার্মানওয়াচ ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০১৯’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সম্প্রতি। সেখানে গত ১৯ বছরে চরম আবহাওয়ার শিকার দেশের তালিকা করা হয়েছে। যার মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ রয়েছে সপ্তম স্থানে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে, পুয়ের্টো রিকো, হন্ডুরাস, মিয়ানমার, হাইতি, ফিলিপাইন্স, নিকারাগুয়া, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম এবং ডোমিনিকা।

জার্মানওয়াচ বলছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চরম আবহাওয়ার কারণে (ঝড়, বন্যা, তীব্র গরম) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে আছে। জার্মানওয়াচের আরেকটি সূচকে বাংলাদেশ রয়েছে নবম স্থানে। তবে ওই প্রতিবেদন তৈরিতে শুধু ২০১৭ সালের তথ্য ব্যবহার করা হয়। ওতে দেখা যাচ্ছে, ওই বছর বাংলাদেশে দুর্যোগে ৪০৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯০ কোটি ডলার। ২০১৭ সালের সূচকে বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও নেপালের নাম আছে।

জার্মানওয়াচ ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০১৭ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্ট একের পর এক হারিকেনের আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ধনী কয়েকটি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি যে দিন দিন সর্বজনীন সমস্যায় পরিণত হচ্ছে, তা ধনী দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। প্রতিনিয়ত বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বাস্তুহারা হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এরই মধ্যে দেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ঋতুশৃঙ্খলায় দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। এরই মধ্যে কয়েকদিনের টানা ও ভারী বৃষ্টিতে বন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ কয়েকটি শহরে। এছাড়া ভারত থেকে আসা প্রায় সব নদ-নদীর পানি বেড়েই চলেছে। উত্তর, উত্তর পূর্ব এবং দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের নদী-বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রায় সব নদীতেই উজান থেকে আসা পানির প্রবাহ বাড়ছে। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইস গেটের সব খুলে দিয়ে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধাসহ উত্তরের অধিকাংশ জেলার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এছাড়া অতিবৃষ্টিতে পার্বত্যাঞ্চলে দেখা দিয়েছে ভূমি ও পাহাড়ধস। গতকাল শনিবার রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর আগে গত ৮ জুলাই কাপ্তাইয়ের কেপিএম কলাবাগান এলাকায় মালি কলোনি পাহাড়ধসে মারা গেছে মা ও শিশু। এছাড়া কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ঘটেছে পাহাড়ধসের ঘটনা। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকদিনে ক্যাম্পে পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে মারা গেছে এক নারী ও চার শিশুসহ পাঁচজন।

বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা, ত্রাণের আশায় পানিবন্দিরা
ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা অব্যাহত ঢলের পানিতে দেশের নদ-নদীগুলোর পানি বেড়েই চলছে। এ পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। চলতি সপ্তাহে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বন্যা মধ্যাঞ্চলেও (ঢাকার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল) ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

সরেজমিন দেখা যায়, ত্রাণের অপেক্ষায় রয়েছে সুনামগঞ্জে লাখো পানিবন্দি মানুষ। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সয়লাব তাদের বাড়িঘরের চারপাশ। ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই বাসিন্দাদের। আক্ষরিক অর্থেই তারা পানিবন্দি। বাড়িঘর তলিয়ে গিয়ে সম্পদহানির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন পানিবন্দি এসব মানুষ। দুর্ভোগ বাড়ছে প্রতিদিনই। জুটছে না পর্যাপ্ত ত্রাণ। বিশুদ্ধ পানির সংকটও রয়েছে। বাধ্য হয়ে ঢলের পানি দিয়ে রান্না ও দৈনন্দিন কাজ সারছেন তারা। সুনামগঞ্জ সদর, বিশ^ম্ভরপুর, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ওইসব উপজেলার বেশির ভাগ সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫০০ বাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। পানিবন্দি রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।
বিশ্বম্ভরপুরের পলাশ ইউনিয়নের রাজঘাট গ্রামের পানিবন্দি বাসিন্দারা জানান, পাঁচ দিন আগে ঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করে। সেই থেকে চুলায় আগুন জ্বালাতে পারছেন না। দোকান থেকে শুকনো খাবার কিনে এনে রাখা হয়েছিল। সামান্য খাবার সবাই স্বল্প পরিমাণে খাচ্ছেন। বাজার থেকে চিড়াগুড় কিনে খাচ্ছেন এ এলাকার মানুষ। রান্নার ব্যবস্থা না থাকায় শুকনা খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন তারা। গবাদিপশু নিয়ে কৃষকরা বেকায়দায় আছেন। প্রতিটি গোয়ালঘরে ঢুকেছে বন্যার পানি। এতে গবাদিপশুর জন্য খুঁজতে হচ্ছে উঁচু জায়গা।

কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ত্রাণ দিচ্ছে কিন্তু সবাই তা পাচ্ছে না। ত্রাণের পরিমাণ আরও বাড়ানোর প্রতি জোর দেন তারা। নগদ টাকার পাশাপাশি শুকনো খাবার ও ওষুধ বেশি দরকার বলে জানান সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিতরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, সুরমা নদীর পানি ৮ দশমিক ৪ থেকে ৮ দশমিক ৬-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। পানি এখন স্থির অবস্থায় রয়েছে। আগামী কয়েক দিনে আরও বৃষ্টি হবে ও পাহাড়ি ঢল নামবে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পানি আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন এ কর্মকর্তা।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক বলেন, এ পর্যন্ত জেলায় ৩০০ টন চাল, তিন হাজার ৭৬৫ প্যাকেট শুকনো খাবার ও নগদ আড়াই লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় নগদ ১০ লাখ টাকা, ৩০০ টন চাল ও চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার দিয়েছে। প্রতি প্যাকেট শুকনো খাবারে চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনিসহ সাড়ে ১৬ কেজি সামগ্রী থাকে। তবে এবার খাবারের প্যাকেটে মোমবাতি ও দেশলাই নেই।

এদিকে পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকাল শনিবারের তথ্য অনুযায়ী- সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, সোমেশ্বরী, কংস, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ধরলা, তিস্তা, ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নদীর পানি ২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। একদিন আগে গত শুক্রবার সাতটি নদীর পানি ১২টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবানে ১২১ সেন্টিমিটার ও দোহাজারীতে বিপদসীমার ১০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ৩-৪ দিন পানি অনেকটাই বাড়বে। উত্তরবঙ্গ থেকে বন্যাটা আস্তে আস্তে মধ্যাঞ্চলের দিকে আসবে। বন্যা যমুনা হয়ে পদ্মাতে আসবে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর পানি বাড়তে পারে বলে মনে করছি, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর পানি কোনো কোনো পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতেও পারে।

তিনি আরও বলেন, আগামী বুধ বা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হতে থাকবে। এরপর থেকে পানি কমতে শুরু করতে পারে। এরপরই বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাবে। নতুন করে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর অঞ্চলে বন্যা উপদ্রুত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান।

দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতলে বৃদ্ধি পাচ্ছে জানিয়ে গতকাল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র প্রতিবেদনে জানিয়েছে।

আটদিনে পাঁচবার ডুবল বন্দরনগরী
ভারী বৃষ্টির কারণে গত আট দিনে পাঁচবারের মতো জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বেশির ভাগ এলাকায়। গতকাল শনিবার ভোর থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকার কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পুরো নগরবাসীকে।

শুধু মহানগরী নয়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু, হালদা ও কর্ণফুলী নদীতে পানি বেড়ে চট্টগ্রাম জেলার ১৪টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার ১৬টি উপজেলার মধ্যে শুধু মিরসরাই ও সন্দ্বীপ উপজেলা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্য ১৪ উপজেলার মধ্যে সাতকানিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও সীতাকু- উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এসব উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বাঁশখালী, সীতাকু-, হাটহাজারীসহ কয়েকটি উপজেলার পাহাড়ি এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ভূমিধসের আশঙ্কায়।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, পাঁচদিনে চট্টগ্রাম নগরীতে মোট ৬১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

গত সোমবার নগরীতে সর্বোচ্চ ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এছাড়া রোববার ৬৬ মিলিমিটার, মঙ্গলবার ৬৯ মিলিমিটার, বুধবার ১৪৬ মিলিমিটার ও বৃহস্পতিবার ৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

শুক্রবার থেকে বৃষ্টি শুরু হলেও সোমবার থেকে শুরু হয় ভারী বর্ষণ। এদিন চট্টগ্রাম নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে নগরীর বেশ কয়েকটি প্রধান সড়ক হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়। মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের নিচে গলাসমান পানি জমে।

হালিশহর, আগ্রাবাদ সিডিএ, ব্যাপারীপাড়া, শান্তিবাগ, মুহুরীপাড়া, রঙ্গীপাড়া, ছোটপুল, বড়পুল এলাকায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে গেলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় রোগী ও স্বজনদের।

পানি বেড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে সোনাকানিয়া (আংশিক) ছাড়া বাকি সব ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কে পানি উঠে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পৌরসভাতেও পানি। ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৬টিতে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। সাঙ্গু নদীর পানি বেড়েছে, সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারী বৃষ্টি। ইউনিয়নগুলোর বেশির ভাগ অভ্যন্তরীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্গতদের মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্র ও শনিবার প্রায় দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৪৫ টন চাল ও এক লাখ নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে বলে ইউএনও মোবারক জানান।

উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীর তিনশোর মতো পরিবার দুর্দশায় বলে জানিয়েছেন ইউএনও মোমেনা আক্তার। তিনি বলেন, পুকুরিয়া, শিলকূপ, কালিপুর ও পুঁইছড়ি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টি হচ্ছে, পানি উঠছে, বন্ধ হলে আবার নেমে যাচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারে পানিবন্দি মানুষের পরিমাণ কম বলে দাবি করেন তিনি। এখানকার পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় সীতাকুণ্ড উপজেলায় ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে আবহাওয়া অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। উপজেলাটির সদর এলাকার বিভিন্ন ঘরে পানি প্রবেশ করেছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments