ঝুঁকিতে শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তান

আলোকিত সকাল ডেস্ক

কেউ কাজ করছেন পোশাক কারখানায়, কেউ ছাতা কারখানায়, কেউ মোটর গ্যারেজে, কেউ ট্যানারিতে, আবার কেউ গৃহকর্মী বা পরিবহন শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার সুতীব্র লড়াইয়ে সূর্যের আলোর দেখা মিলতে না মিলতেই শুরু হয় তাদের কর্মযুদ্ধ। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত শরীর-মন নিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে গভীর রাত। আবার নির্ধারিত কর্মঘণ্টা আর ওভারটাইম মিলিয়ে অনেক সময় ফেরাই হয় না ঘরে। জীবনযুদ্ধে লড়াইরত সেই শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তানরা কেমন আছে? কতটা যত্ন, কতটা সময়, কতটা শিক্ষা পাচ্ছে তাদের শিশুরা।

সাভার, আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শ্রমজীবী বাবা-মা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের শিশুদের রেখে যাচ্ছেন বয়স্ক পাড়াপড়শিদের জিম্মায়। অনেক বাবা মা আবার ছোট্ট শিশুকে ঘরে তালা মেরে চলে যান কাজে। আবার অনেক সময় অপেক্ষাকৃত বড় শিশু ছোট শিশুকে দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন। মা-বাবার সঙ্গহীন সেই সব শিশুর জীবন কতটা আনন্দময় কিংবা কতটা নিরাপদ?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক খোলা কাগজকে বলেন, ‘গরিব শ্রমজীবী মানুষদের কাজ করেই খেতে হয়। ফলে শিশুদের তারা তেমন একটা সময় দিতে পারেন না। এই সুযোগে অপরাধীরা শিশুদের অপব্যবহার করে। শিশুদের এমন নিরাপত্তা ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। শ্রমজীবী বাবা মায়ের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাজ করা উচিত।’

শিল্পাঞ্চল সাভার পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শ্রমজীবী বাবা-মায়ের শিশুদের সঙ্গে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের তথ্য মিলেছে। আট বছর বয়সী রিয়া (ছদ্মনাম)। থাকেন সাভার পৌরসভার একটি বস্তিতে। বাবা রিকশা চালক, মা গৃহকর্মী। কর্মব্যস্ত বাবা-মা ঠিক মতো সময় দিতে পারেন না রিয়াকে। এ অবস্থায় অরক্ষিত রিয়াকে তার দূর সম্পর্কের এক খালা অপহরণ করে বিক্রি করে দেয় পাচারকারীদের কাছে। পাচারকারীরা শিশুটিকে কুষ্টিয়ার খোকশায় আটকে রেখে নির্যাতন চালায়। রিয়াকে তারা ভারতে পাচার করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করে। শিশুটি এটা বুঝতে পেরে কৌশলে অপহরণকারীর খপ্পর থেকে পালিয়ে আসে। খোকশা থানার পুলিশ রিয়াকে উদ্ধার করে বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছে দেয়।

সাভার ব্যাংক টাউন ভার্ক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কাকলী (ছদ্মনাম)। এগার বছর বয়সী শিশুটির মা স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন, বাবা রিকশাচালক। কয়েকদিন আগে প্রতিবেশী যুবক মো. আলী (২৩) শিশুটিকে একা পেয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। স্থানীয়রা টের পেয়ে আলীকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়।

সাভার ডগরমোড়া এলাকার ১২ বছরের শিশু স্বপ্না (১২) (ছদ্মনাম)। বাবা ভাঙ্গাড়ি মালের ব্যবসায়ী, মা গৃহকর্মী। প্রতিবেশী বাবু শিশুটিকে রুমে আটকে রেখে রাতভর যৌন নির্যাতন চালায়। পরে মৃত ভেবে বস্তায় ভরে ছাদে রেখে আসে। স্থানীয়রা বাবুর বাড়ির পানির ট্যাংকের পাশে অসুস্থ অবস্থায় স্বপ্নাকে উদ্ধার করে।

কেবল রিয়া, কাকলী, স্বপ্না নয় শ্রমজীবী বাবা মায়ের সন্তানদের সঙ্গে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। সাভার শিশু রক্ষা মনিটরিং কমিটির সভাপতি রোকেয়া হক খোলা কাগজকে বলেন, শ্রমজীবী বাবা মায়ের সন্তানরা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বসবাস করে। মা-বাবার সঙ্গবঞ্চিত এসব শিশু একেবারে অরক্ষিত অবস্থায় বেড়ে উঠছে। ফলে শৈশবেই নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে শিশুদের। তিনি বলেন, শিশু খুন, ধর্ষণ, অপহরণের ঘটনা অহরহই ঘটছে।

সাভারে শ্রমজীবী বাবা মায়ের সন্তানদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে কাজ করছেন বেসরকারি সংস্থা ভিলেজ এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার (ভার্ক)। সংস্থাটি টিডিএইচ নেদারল্যান্ডসের আর্থিক সহযোগিতায় ২০১২ সাল থেকে শ্রমজীবীদের সন্তানদের জন্য এবং শ্রমজীবী শিশুদের জন্য ৪০টি উপানুষ্ঠানিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। প্রায় ১৪শ শিশুকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে পড়ানো হচ্ছে। ভার্কের প্রকল্প সমন্বয়কারী প্রিয়তা খন্দকার খোলা কাগজকে বলেন, নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী বাবা-মায়ের সন্তানদের জন্য সামাজিক কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। আমাদের স্কুলে শিশুরা তিন ঘণ্টা পড়ে, দিনের বাকি সময়টা তারা অরক্ষিতই থাকে। তার মতে এ সব শিশুর নিরাপত্তার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত ডে কেয়ার সেন্টার গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহিদ মাহমুদ খোলা কাগজকে বলেন, পেটের তাগিদেই শ্রমজীবী মা-বাবা সন্তানকে রেখে কাজে যান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আশপাশের অপরাধীরা এই সুযোগ নেয়। তারা শিশুদের সোনালি শৈশবকে নরক বানিয়ে তোলে। তিনি বলেন, শ্রমজীবী বাবা মায়ের সন্তানদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে শিল্পাঞ্চলে নজরদারি বাড়াতে হবে। কোথাও কোনো শিশু নিপীড়নের শিকার হলে, অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments