জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে প্রিয়া সাহাকে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভিত্তিহীন নালিশ দেওয়ায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহাকে নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। এ ঘটনাকে প্রিয়া সাহার সাম্প্রদায়িক উসকানি, হঠকারী মন্তব্য বলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সচেতন মানুষ। অনেকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, দেশে ফিরলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার পেছনে তার নিশ্চয়ই একটি কারণ ও উদ্দেশ্য রয়েছে। তার উদ্দেশ্যটা কী, এটা আমাদের দেখার বিষয় হয়েও দাঁড়িয়েছে। এদিকে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের দেশের প্রায় সব

শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিবাদ করছেন। বিক্ষোভ হয়েছে ঢাকায় প্রিয়ার সাহার বাড়ির সামনেও। গতকাল ধানম-িতে তার বাড়ির সামনে ‘সচেতন ছাত্র সমাজের’ ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে দেওয়া প্রিয়া সাহার বক্তব্য তার নিজ সংগঠন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এটি ভিত্তিহীন। প্রিয়া সাহার বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নালিশ একেবারেই তার নিজস্ব বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটির সভাপতি রানা দাশগুপ্ত। সংগঠন থেকে তিনজন প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছে, যেখানে তার নাম নেই। মার্কিন গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন ফ্রিডম হাউস ২৭ প্রতিনিধির তালিকা তুলে ধরেছে।

তালিকার ১৮ নম্বরে প্রিয়া বিশ্বাস সাহার নাম রয়েছে। রানা দাশগুপ্ত বলেন, তার সংগঠন থেকে তিনজন প্রতিনিধিকে ওয়াশিংটনের ওই সম্মেলনে পাঠানো হয়েছিল। তারা হলেন পরিষদের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য অশোক বড়ুয়া ও নির্মল রোজারিও এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জী। তিনি বলেন, এর বাইরে আমাদের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।

এদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নির্যাতিত হচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশি নাগরিক প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন, সরকার তাকে ‘ভয়ঙ্কর মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে। গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশ সরকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার এই ভয়ঙ্কর মিথ্যা অভিযোগের কঠোর প্রতিবাদ এবং তার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।

কড়া ভাষায় প্রিয়া সাহার বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রিয়া সাহার অভিযোগে সাজানো গল্পের পেছনে অশুভ উদ্দেশ্য রয়েছে। তার এই বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা। বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার আশা করছে এ ধরনের আন্তর্জাতিক ইভেন্টের আয়োজকরা সত্যিকার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাবেন, যারা ধর্মীয় স্বাধীনতার সত্যিকার চেতনা ও মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর অবদান রাখবেন।

সংখ্যালঘুদের নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রিয়া সাহা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা ও বানোয়াট। এ বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যে উগ্রবাদীদের উৎসাহিত করে। এ ছাড়া তার এ বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ। দেশদ্রোহী হিসেবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রিয়া সাহা ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে করেছেন, তা নাকচের পাশাপাশি এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন। তিনি বলেন, প্রিয়া সাহার করা অভিযোগ একেবারেই মিথ্যা। বিশেষ মতলবে এমন উদ্ভট কথা বলেছেন তিনি।

আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, এটি শুধু নিন্দনীয় অপরাধ নয়, এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা মতলববাজ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

প্রিয়া সাহার অভিযোগকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, প্রিয়া সাহার অভিযোগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তার বক্তব্য দেশবিরোধী। তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আনতে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। ১৪ দল এক বিবৃতিতে প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার পাশাপাশি কার প্ররোচনায়, কোন মহলের মদদে তিনি এ ধরনের মিথ্যাচার করেছেন, তা বের করা উচিত বলে মন্তব্য করেছে।

প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। আজ ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তিনি মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। ব্যারিস্টার সুমন বলেন, এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ করেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও প্রিয়া সাহার বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের দায়-দায়িত্বহীন বক্তব্য দিয়ে তিনি দেশেরই ক্ষতি করেছেন। তার এ ধরনের তৎপরতা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত।

পিরোজপুর প্রতিনিধি জানান, প্রিয়া সাহার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থ অর্জনের চেষ্টা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে তার নিজ বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুরের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে। পিরোজপুরের ভারপ্রাপ্ত

পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, প্রিয়া বালার অভিযোগের বিষয়ে কোনো ঘটনা পিরোজপুর জেলার কোথাও ঘটেনি। পিরোজপুরের পুলিশ প্রশাসন সাম্প্রদায়িক যে কোনো বিষয়ে সব সময় গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। নাজিরপুর উপজেলায় বা পিরোজপুর জেলার কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়াার ঘটনা ঘটেনি।

বর্তমানে পিরোজপুরে অবস্থানরত গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে কেউ ধর্মীয় বিবেচনায় নির্যাতনের শিকার হন না।

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মুসলাম-হিন্দুদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নাজিরপুরের একটি হিন্দু বা অন্য কোনো ধর্ম সম্প্রদায়েরর লোক গুম বা নিখোঁজ হয়নি। প্রিয়া বালার বক্তব্য অসদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

জানা গেছে, প্রিয়া সাহা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক। এ ছাড়া তিনি ‘দলিত কণ্ঠ’ নামের একটি পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ‘দলিত কণ্ঠ’ পত্রিকায় প্রিয়া সাহার পুরো নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রিয় বালা বিশ্বাস’। বয়স দেখানো হয়েছে ৫৪ বছর। বাবার নাম-মৃত নগেন্দ্র নাথ বিশ্বাস। প্রিয়া সাহা ওরফে প্রিয়া বালা বিশ্বাস বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ‘শারি’র নির্বাহী

পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। প্রিয় বালার স্বামী মলয় কুমার সাহা দুদকের সদর দপ্তরে উপপরিচালক পদে কমর্রত রয়েছেন। তার দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন।

গত ১৬ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে কথা বলেন। এতে বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে প্রিয়া সাহা ট্রাম্পকে বলেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এখানে (বাংলাদেশে) ৩৭ মিলিয়ন (৩ কোটি ৭০ লাখ) হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ডিসঅ্যাপেয়ার (নিখোঁজ) হয়ে গেছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই।

এখনো সেখানে (বাংলাদেশে) ১৮ মিলিয়ন (১ কোটি ৮০ লাখ) সংখ্যালঘু মানুষ রয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments