জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প এমডিজি থেকে এসডিজি

দুলাল আহমদ চৌধুরী

জাতিসংঘের ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এমডিজি অর্জনের সময় শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে। আর ২০১৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে ১৫ বছর মেয়াদি ‘সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ বা এসডিজি। বিশ্বের অনুন্নোত, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে ক্রমান্বয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি, দারিদ্যতা দূরীকরণ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশেষ এই প্রকল্প হাতে নেয় ইউএনডিপি (ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট)। এই প্রেক্ষাপটে প্রাথমিকভাবে এমডিজির আটটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়। যার বিপরীতে এসডিজিতে নির্ধারিত হয় মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা।

২০০০ সালে জাতিসংঘ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে, যা শেষ হয় ২০১৫ সালে। এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল আটটি। ১. চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল করা, ২. সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন, ৩. জেন্ডার সমতা অর্জন এবং নারীর ক্ষমতায়ন, ৪. শিশু মৃত্যুহার হার কমানো, ৫. মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, ৬. এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগব্যাধি দমন, ৭. পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ৮. সার্বিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতিসংঘের এমডিজির লক্ষ্য অর্জনে অনুসরণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। যার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে নূন্যতম সময় স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নিত হবার গৌরব। আর এজন্য বাংলাদেশকে বলা হয় এমডিজির ‘রোল মডেল’৷ অভিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী তা দেখানোও সম্ভব।

জাতিসংঘ এমডিজির লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ সংক্রান্ত যে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছে, তা হলো: ১. বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রদ্ধৃদ্ধি নিয়মিতভাবেই ৬ শতাংশের উপরে রয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২৪.৮ শতাংশ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই হার ছিল ৫৬.৭ শতাংশ।

লিঙ্গ সমতা: দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপরে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম, ডব্লিউইএফ ২০০৬ সাল থেকে প্রতিবছর ‘বিশ্ব লিঙ্গবৈষম্য সূচক’ প্রকাশ করে আসছে। মূলত চারটি বিষয়- অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অর্জন, স্বাস্থ্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন – বিবেচনা করে এ সূচক প্রকাশ করা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে সবশেষ সূচকটি প্রকাশ করা হয়েছে। ২. বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রকৃত ভর্তি হার ৯৭.৭ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলে ৯৬.৬ ও মেয়ে ৯৮.৮ শতাংশ। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ১৯৯১ সালে ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৪ সালে ৮১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া ১৫ বছরের বেশি বয়সি জনসংখ্যার শিক্ষার হার ১৯৯০ সালের ৩৭.২ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৬১ শতাংশ হয়েছে। ৩. ২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতি ১০০ ছেলের বিপরীতে ১০৩ জন মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ১৯৯০ সালে ছেলে-মেয়ের এই অনুপাত ছিল ১০০:৮৩। আর মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ের অনুপাত ছিল: ১০০: ৫২। এখন ১০০:১১৪।

৪. ১৯৯০ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুর মৃত্যুর হার ছিল প্রতি এক হাজারে ১৪৬ জন, যা ২০১৩ সালে ৪৬-এ নেমে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে, কারণ ২০১৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮। ৫. ১৯৯০ সালে মাতৃমৃত্যু হার ছিল ৫৭৪, যা ২০১৩ সালে হয়েছে ১৭০। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষত মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে ১২ হাজার ২১৭টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে। ৬. বাংলাদেশে এইচআইভি অথবা এইডসের প্রাদুর্ভাব এখনো অনেক কম৷ শতকরা ০.১ ভাগ, যা মহামারি সীমার নীচেই রয়েছে৷ ২০১৩ সালে ১৫-২৪ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি-এইডস সম্পর্কে সঠিক ও স্পষ্ট ধারণা রাখে এমন লোকের সংখ্যা ১৮ শতাংশ। ৭. ১৯৯০ সালে দেশে বনাচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক শূন্য শতাংশ, যা ২০১৪ সালে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ে ‘ওজোন’ ক্ষয়কারী পদার্থের পরিমাণ ২০২ ওডিপি টন থেকে হ্রাস পেয়ে ৬৪ দশমিক ৮৮ হয়েছে। ১৯৯০ সালে জনসংখ্যার ৭.৮ শতাংশ বস্তিতে বাস করতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫.২৫ শতাংশে। ৮. ১৯৯০-৯১-এ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ ছিল ৫.৫৯ শতাংশ। ২০১৩-১৪ সালে এর পরিমাণ নেমে এসেছে ১.৭৮ শতাংশে।

সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) ২০১৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের উদ্দেশ্য হলো: দারিদ্র্য দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যমান অর্জন, মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, নারীর সর্বজনীন ক্ষমতায়ন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাসহ সামুদ্রিক সম্পদ সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা৷ এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা হলো: ১. সকল প্রকার দারিদ্র্য দূর করা; ২.খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টির উন্নয়ন ও কৃষির টেকসই উন্নয়ন; ৩. সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা; ৪. সবার জন্য ন্যায্যতাভিত্তিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ; ৫. জেন্ডার সমতা অর্জন এবং সকল নারীর ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন; ৬. সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থাপনা; ৭. সকলের জন্য জ্বালানি বা বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; ৮. স্থিতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণকালীন উৎপাদনমূলক কর্মসংস্থান ও কাজের পরিবেশ; ৯. স্থিতিশীল শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা; ১০. রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃরাষ্ট্র বৈষম্য বিলোপ; ১১. মানব বসতি ও শহরগুলোকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখা; ১২. উৎপাদন ও ভোগ কাঠামোর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; ১৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাক মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ; ১৪. টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা; ১৫. স্থলভূমির জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; মরুকরণ প্রতিরোধ করা এবং জমির ক্ষয়রোধ ও জীববৈচিত্রের ক্ষতি কমানো; ১৬. শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমুলক সমাজ, সকলের জন্য ন্যায়বিচার, সকল স্তরে কার্যকর, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা; এবং ১৭. টেকসই উন্নয়নের জন্য এ সব বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা আনা।

এমডিজি থেকে এসডিজি এ নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) অর্থনীবিদ ড. নাজনীন আহমেদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘আমরা এমডিজি অর্জনে সাফল্য দেখিয়েছি। এখন এই সফলতাকে ধরে রাখতে হলে আমাদের এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই আমাদের অর্জন বা উন্নয়ন টেকসই হবে।” তিনি বলেন, ‘‘এসডিজির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এই পরিকল্পনায় সুশাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসডিজির লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন যেমন আছে, তেমনি বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতা আনার কর্মসূচিও আছে। এসডিজি লক্ষ্য পূরণ একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দ্বার যেমন উন্মোচিত করেছে, ঠিক তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও হাজির করছে।” ড. নাজনীন বলেন, ‘‘জীববৈচিত্রের ক্ষতি কমানো থেকে শুরু করে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ বিনির্মাণ করা কিংবা সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সকল স্তরে কার্যকর, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো লক্ষ্যপূরণ করতে হবে এবার আমাদের৷ সব মিলিয়ে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ থেকে আমাদের মধ্য আয়ের দেশে দিকে যেতে হবে।”

২০১৯ সালের মাঝমাঝি সময়ে একটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পরিসংখ্যানের দেখা যায় এসডিজি’র নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এরই মধ্যে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ইউএনডিপির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া এবং ভারতে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে দারিদ্রতা কমছে। এসব দেশের অন্তত ৯টি সূচকে উন্নতি হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশু দারিদ্রতা আরও দ্রুত গতিতে কমেছে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, হাইতি, ভারত ও পেরুতে। এমপিআই সূচকে দেখানো হয়েছে, ১০টি দেশের ২০০ কোটি মানুষ এসডিজি-১ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে ৮টি দেশের এমপিআই মান কমেছে। সামগ্রিকভাবে এসব দেশের বহুমাত্রিক দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এমপিআই মান একই (শূন্য দশমিক ১৯৮)। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-১ বাস্তবায়নের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয় এমপিআই। এসডিজির প্রধান লক্ষ্যই হলো বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচন। এমপিআই প্রতিবেদনে বিশ্বের ১০১টি দেশের মারাত্মক বহুমাত্রিক দারিদ্র্যতা বিবেচনা করা হয়। এসব দেশের মধ্যে ৩১টি নিম্ন আয়ের, ৬৮টি মধ্যম আয়ের আর দুটি উচ্চ আয়ের দেশ। এসব দেশের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ বহুমাত্রিকভাবে দরিদ্র। এমপিআই প্রতিবেদন দারিদ্র্যতার তুলনা করে আর ১০টি সূচকের মাধ্যমে পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।

সম্পাদনা সহযোগী- এস এম সাব্বির খান

আস/এসআইসু

Facebook Comments