জমজমাট অনলাইন ঈদবাজার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঈদ উপলক্ষে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় ব্যস্ত পুরো দেশবাসী। ছোট-বড় বিপণিবিতানগুলোর পাশাপাশি ঈদের জমজমাট কেনাকাটা চলছে অনলাইনভিত্তিক ই-কমার্স এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতেও। রমজান মাস, রাজধানীজুড়েই যানজট, প্রচন্ড রৌদ্র আর উষ্ণ আবহাওয়া। এসব বাধা পেরিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে মার্কেটে যাওয়ার পর দোকানির সাথে দর কষাকষির বিষয় তো আছেই। নগরজীবনের ব্যস্ততা আর এতোসব ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে তাই অনেকেই এখন ঝুঁকছেন অনলাইন কেনাকাটায়। ঘরে বসে ছবি দেখে পছন্দ হলে বিস্তারিত জেনে অর্ডার করছেন একটি ক্লিকেই। ৪০ থেকে ১০০ টাকার চার্জের বিনিময়ে একদিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের দরজায়। গত কয়েক বছর ধরেই কেনাকাটার এই মাধ্যমটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। শিক্ষার্থী, তরুণদের পাশাপাশি কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য এখন কেনাকাটার প্রধান মাধ্যম এটি। অর্ডারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই নারীরা। কেনাকাটায় সিংহভাগই তাদের অর্ডার বলে জানিয়েছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ইক্যাব)।

রমজান, ঈদসহ অন্যান্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোতে এই ভার্চুয়াল বাজার হয়ে ওঠে রমরমা। এখনকার দিনে অনলাইন মার্কেটে জামা-কাপড়, জুয়েলারি, শাড়ি, প্রসাধনী, ঘর গোছানোর সামগ্রী, চাল-ডাল, মাছ-গোশত, সবজি থেকে শুরু করে জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, গহনা, ব্যাগ-কসমেটিকস, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সবই মিলছে অর্ডার করলেই। জনপ্রিয়তা ও আগ্রহের কারণে উদ্যোক্তারাও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ই-কমার্স সাইট নিয়ে আসছেন। ওয়েব সাইটের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও যোগ হচ্ছে এই বেচাকেনায়।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমানে সারা দেশে ৯৫০টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ৯০০। অনলাইনে কেনাকাটার বেশিরভাগ এখনো পোশাক। দেশে বর্তমানে ই-কমার্স বাজারের আকার বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিদিন ৩০ হাজার ক্রেতা অনলাইনে পণ্যের অর্ডার দেন। আর ঈদ উপলক্ষে এটি পৌঁছেছে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত। ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বছরে একবার হলেও অনলাইনে অর্ডার করেন। যদিও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তা খুবই নগণ্য। কারণ ভারতে অনলাইন গ্রাহকের সংখ্যা ১০ কোটি, চীনে প্রায় ৪০ কোটি। ভারতে জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত, সেখানে বাংলাদেশে এখনও জনসংখ্যার এক শতাংশের কম অনলাইন শপিং করে। সেটাও সংখ্যার হিসাবে একদম কম নয়। ই-ক্যাবের সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদ বলেন, তিন-চার বছর আগে ১০ হাজার অর্ডার পেলেই আমাদের কাছে অনেক বড় মনে হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন সেটি এক লাখ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই ঈদেই সেটি এক লাখ পেরিয়ে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন রাজিব।

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে প্রায় প্রত্যেকটি অনলাইন শপই বিভিন্ন ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। এই মৌসুমে ব্যাপক পণ্য সমাগমও করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দারাজ ঈদ উপলক্ষে ৬ জুন পর্যন্ত ঈদ শপিং ফেস্ট করছে। তাতে এসি, ফ্রিজ, এয়ারকুলার ও মাইক্রোওয়েভসহ বিভিন্ন গৃহস্থালিসামগ্রীতে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে- দৈনিক বিভিন্ন অফার এবং বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ডে কেনাকাটায় রয়েছে মূল্যছাড় সুবিধা। এর মধ্যে সাউথইস্ট ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের কার্ডে ১০ শতাংশ, সিটি ব্যাংকের অ্যামেক্স ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে ১০ শতাংশ ছাড়। এ ছাড়া ১৫ জুন পর্যন্ত সব ভিসা কার্ডে থাকছে ১৫ শতাংশ ছাড়। আর ৬ জুন পর্যন্ত বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে পেমেন্ট করলে থাকছে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ক্যাশ ব্যাক সুবিধা। ই-ভ্যালী, বাগডুমও ঈদ উপলক্ষে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে।

অনলাইনে নিয়মিত কেনাকাটা করেন এমন বেশ কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সড়কে যানজট এবং শপিং সেন্টারগুলোর ভিড়ের যন্ত্রণায় অনলাইনই হয়ে উঠছে অনেকের কেনাকাটার প্রথম পছন্দ। অনলাইন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অথেনটিক শপ, পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখার প্রতি ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিশ্রুতি এবং উন্নত গ্রাহক সেবার কারণে গ্রাহকেরাও আকৃষ্ট হচ্ছেন কেনাকাটার আধুনিকতম এ মাধ্যমে। কেনাকাটায় সাধারণ দামের ওপর ম‚ল্যছাড় এবং সর্বোপরি অনলাইনে মূল্য পরিশোধ করলে ক্যাশব্যাকের অফার লুফে নিচ্ছেন গ্রাহকেরা। নারী ও পুরুষ সবধরনের ক্রেতারাই কিনছেন ঈদের নানান পণ্য। নারী ও পুরুষদের পোশাক, জুতা, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক্স ও গ্যাজেটস, ফ্যাশন আইটেম সহ প্রায় সবধরনের পণ্যই অনলাইনে কিনছেন গ্রাহকেরা।

ই-কমার্স সাইটগুলো থেকে কেনাকাটা করেন এমন মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে দিনকে দিন। শুধু রাজধানীতে নয়; সরাদেশেই বাড়ছে অনলাইনে কেনাকাটা। এতোদিন কেবল ঢাকা কেন্দ্রীয় অনলাইন মার্কেট থাকলেও এখন দেশের বড় বড় শহরগুলোতেও গড়ে উঠছে এধরণের কেনাবেচা। বাংলাদেশে এখন বছরে এক হাজার কোটি টাকার পণ্য অনলাইনে বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব)।

সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ও ইংলিশ সার্চ এর কর্ণধার রাজিব আহমেদ বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন দেশের এক হাজার অনলাইন শপ অনলাইনে ডেলিভারি দেয় ৫০ থেকে এক লাখ অর্ডার। এছাড়া ফেসবুকভিত্তিক আছে ১০ হাজারেরও বেশি। চলতি বছর এই কেনাকাটা দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কয়েক বছর আগেও ঈদ শপিং মানেই ছোটবড় বিভিন্ন শপিংমল, বিপণিবিতান ও ফ্যাশন হাউসে ঘুরে ঘুরে পণ্য কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে অনেক ব্যবসা কার্যক্রম চলছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। প্রয়োজনীয় সব ধরণের পণ্য কেনাবেচা হচ্ছে অনলাইনেই। ফলে একদিকে যেমন অনলাইন শপিংয়ের পরিধি ও পরিসর সম্প্রসারিত হচ্ছে অন্যদিকে রাজধানীসহ অন্যান্য শহরের বড় বড় শপিং কমপ্লেক্সেও পড়ছে তার প্রভাব। ঈদের সময় কিছুটা ভিড় থাকলেও অন্যান্য সময় বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিং মলগুলো অধিকাংশ সময় থাকছে ফাঁকা। যদিও ব্যবসায়ীদের দাবি অনলাইনের এই দাপাদাপিতেও বাজারে তেমন কোনও প্রভাব পড়েনি। বসুন্ধরা সিটির দোকান মালিক সাইফুজ্জামান বলেন, অন-লাইনে কেনাকাটা এখনও একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাছাড়া এখনও ঘরে বসে কেনাকাটা করার থেকে বাজারে গিয়ে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করার লোকের সংখ্যা অনেক বেশি।

ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, এখন আমাদের দেশে ই-কমার্সে বার্ষিক এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার বড় অংশই দুই ঈদের সময়ে। আর ঈদ উল ফিতরের সময় এই কেনাকাটার চাপ থাকে সব থেকে বেশি। আমরা আশা করছি এবারের ঈদে লেনদেন অন্যান্য সময়ের থেকে ৫০ শতাংশ বেড়ে যাবে। আমাদের সংগঠনে ৯৫০টিরও বেশি সদস্য প্রতিষ্ঠান আছে যারা এখন প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার অর্ডার গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করছেন। অন্যান্য সময়ে এর পরিমাণ ২০ হাজারের কিছু বেশি থাকে। ই-কমার্সগুলোও গ্রাহকদের সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং ই-কমার্স বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দুই-তিন বছরে রাজধানী ও এর আশপাশসহ বড় শহরগুলোর কেনাকাটার চরিত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে চিরাচরিত বাজারগুলোতে ভিড় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। তারা বলছেন, ১৬ থেকে ৫৫ বছরের পুরুষ ক্রেতাদের বেশিরভাগই অনলাইনে জিনিস কিনতে পছন্দ করছেন। ঠিক তেমনই ১৬ থেকে ৪৯ বছরের নারীদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে অনলাইনে জিনিসপত্র কেনা। বিশেষ করে সেই নারীরা যাদের পেশাগত কারণে প্রতিদিন বাইরে বেরোতে হয়, খুব দ্রুত হারে বাড়ছে এ পরিমাণও। তারা আরও বলছেন, টেকনোলজির ব্যবহারের ফলে অনলাইনে বেশ কিছুটা কম দামে জিনিস দেয়া সম্ভব, যা কোনোভাবেই সাধারণ দোকানে দেয়া সম্ভব নয়। শুধু পোশাক নয় অন্যান্য জিনিস কেনার ক্ষেত্রেও তাই বাড়ছে অনলাইনের চাহিদা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box