‘ছেলেধরা-গলাকাটা’ আতঙ্ক, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব পুঁজি করে গুজব ছড়াচ্ছে একটি চক্র

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গুজব ঠেকানো এখন চ্যালেঞ্জ। গুজবেই ছেলেধরা সন্দেহে প্রায় প্রতিদিন এক বা একাধিক মানুষকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। এক সপ্তাহে অন্তত ১০ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার (২০ জুলাই) ছেলেধরা সন্দেহে ঢাকার বাড্ডায় অজ্ঞাত এক নারী, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে দুই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই দিন ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনিতে অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হয়।

সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে মানসিক প্রতিবন্ধী, পাগল, ভবঘুরে এবং সহজ-সরল নারীরা। পুলিশ গুজব ছড়ানোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। গুজব ছড়ানো একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এআইজি মো. সোহেল রানা বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ বলে গুজবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গুজব ছড়িয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের শামিল এবং গণপিটুনি দিয়ে মৃত্যু ঘটানো ফৌজদারি অপরাধ। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে গণপিটুনি না দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিন।

ফরিদপুর জেলার সদর থানার মমিন খারহাটের সাজেদা বেগম জানান, গলাকাটা এসেছে বলে তিনি লোকমুখে শুনেছেন। ভয়ে তাই রাতে ঘর থেকেই বের হন না। তার প্রতিবেশীরাও ঘর থেকে রাতে বের হন না। ছেলেমেয়েদের বাইরে কোথায়ও যেতেই দেন না। গলাকাটার ঘটনা সরাসরি দেখেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখেননি, কিন্তু তিনি অনেকের কাছেই শুনেছেন। শুনেই ভয়ে রাতে ঘর থেকে বের হন না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছেলেধরা গুজবে সবচেয়ে বেশি বিপদের মধ্যে রয়েছে মানসিক প্রতিবন্ধী, পাগল, ভবঘুরে এবং নারীরা। মানসিক প্রতিবন্ধী দেখলেই ছেলেধরা সন্দেহে গণধোলাই দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ছিন্নমূল, বাস্তুহারা, পাগল প্রকৃতির মানুষ দেখলেই তাদের ওপর চড়াও হয়ে ব্যাপক মারধর শুরু করছে স্থানীয় লোকজন। মানসিক প্রতিবন্ধী ও নারীরা আতঙ্কে নিজের পরিচয় সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছে না। ফলে মানসিক প্রতিবন্ধীরা ছেলেধরা সন্দেহে সবচেয়ে বেশি গণপিটুনিতে হত্যা ও মারধরের শিকার হচ্ছে। বিভ্রান্তিতে পড়ে অতি উৎসাহী এক ধরনের মানুষ এ ধরনের অপরাধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। শনিবার অন্তত ৮ জন মানসিক প্রতিবন্ধী, পাগল এবং নারীকে গণপিটুনি দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বাড্ডায় নারী নিহত : রাজধানী ঢাকার উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাত পরিচয়ের (৪০) এক নারী নিহত হয়েছেন। শনিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে কাঁচাবাজার সড়কে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, উত্তর বাড্ডায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা পাশাপাশি অবস্থিত। শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনজন বোরকা পরিহিত নারী ওই এলাকায় যান। তারা স্কুলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। বাধার মুখে দুজন পালিয়ে গেলেও আরেকজন গণপিটুনির শিকার হন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

কেরানীগঞ্জে যুবক নিহত : কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঢাকার কেরানীগঞ্জে ছেলেধরা গলাকাটা সন্দেহে গণপিটুনিতে ১ জন নিহত ও অপর ১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ওই ব্যক্তিকে গুরুতর আহত অবস্থায় মালঞ্চস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়ছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তাদের নাম পরিচয় এখনও পুলিশ জানতে পারেনি। তাদের উভয়ের বয়স হবে আনুমানিক ২৮ ও ৩০ বছরের মধ্যে। কেরানীগঞ্জ কলাতিয়া পুলিশ ফাঁড়ির এসআই চুন্নু মিয়া জানান, শুক্রবার রাতে হযরতপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে অপরিচিত ওই দুই যুবক উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করছিল। এ সময় তাদের গতিবিধি স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হলে এলাকাবাসী ছেলেধরা গলাকাটা সন্দেহে তাদের গণপিটুনি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সকালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন মারা যায়।

নারায়ণগঞ্জে যুবক নিহত : নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক দুই স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও এক নারী। শনিবার সকাল পৌনে ৯টায় ও বেলা পৌনে ১১টায় সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পূর্বপাড়া ও পাইনাদি শাপলা চত্বর এলাকায় এ দুই ঘটনা ঘটে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক সাখাওয়াত জানান, ৬-৭ বছরের এক মেয়ে শিশুর হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল ওই যুবক। এ সময় শিশুটি কান্নাকাটি শুরু করলে দুই যুবকের সন্দেহ হয়। তারা ওই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করলে শিশুটি নিজের বলে দাবি করে ওই যুবক।

এরই মধ্যে শিশুটির বাবা ঘটনাস্থলে গেলে শিশুটি তার বাবার কাছে চলে যায়। এ ঘটনায় উপস্থিত লোকজন ওই যুবককে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জের খানপুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়। নিহতের নাম সিরাজ। তার বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জের ৫নং ওয়ার্ড এলাকাতে।

অন্যদিকে, শহরের শাপলা চত্বর এলাকায় ২২ থেকে ২৫ বছরের এক নারী খেলনা ও খাবার দিয়ে এক শিশুকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের সন্দেহ হলে তারা শিশুটি কার জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে এলাকাবাসী তাকে গণপিটুনি দেওয়া শুরু করে। খবর পেয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যায়। তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক শাহীদুল ইসলাম।

আস/এসআইসু

Facebook Comments