চট্টগ্রাম পাহাড়ে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে গত ১২ বছরে সাড়ে তিন শতাধিক লোকের মৃত্যুর পরও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ করা যাচ্ছে না। ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রামে পাহাড়ের ঢালে এখনো বাস করছে শত শত পরিবার। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড় ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানির ঘটনার পর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। যদিও এর একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় থামছে না মৃত্যুর মিছিল। বর্ষার আগে জেলা প্রশাসন তাদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও ভূমিদস্যুদের প্রভাবে তা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুম। প্রতিবছরই পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটে। বছরের এ সময়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তায় কাটে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের। চারদিকে পাহাড়। আর এসব পাহাড়ের নিচে নিম্নআয়ের মানুষের বাস। দূর থেকে দেখলে মনে হবে মৃত্যুকূপ। বর্ষাকাল এলে প্রতি বছর প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। বর্ষা মৌসুমে মিটিং, মাইকিং ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতির কিছু লোককে সরিয়ে নিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখার উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের হিসাবে চট্টগ্রামে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড়ে ৮৩৫ পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

গত ১৬ এপ্রিল কমিটির পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির এক সভায় পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঠেকাতে এক মাসের মধ্যে এসব পাহাড় অবৈধ বসতিমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিককে প্রধান করে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি কমিটিও করা হয়। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে দ্রুত অভিযান শুরু করা না গেলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে প্রাণহানির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন বলেন, শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ করা সম্ভব নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে যেন আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে এ পরিকল্পনা নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। দুর্যোগকালীন সময়কে বিবেচনায় রেখে আমরা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করি। কিন্তু এক্ষেত্রে পাহাড়গুলোর মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে। পাহাড় ধসের দায় পাহাড় মালিকরা এড়াতে পারেন না। পাহাড়ের মূল মালিকরা যথাযথভাবে উচ্ছেদ করতে আগ্রহী না হন বা ব্যবস্থা না নিলে পাহাড়গুলো থেকে পুরোপুরিভাবে ঝুঁঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, সভার সিদ্ধান্তের পর নগরীর লালখান বাজার মতিঝর্ণা, পোড়া কলোনি, উত্তর পাহাড়তলীর লেকভিউ আবাসিক এলাকা এবং আমবাগান এলাকার এ কে খানের পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে সাড়ে তিনশর মতো পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানে ওই সব এলাকার ৪১টি বিদ্যুতের অবৈধ মিটার ও একটি ট্রান্সফরমার বিচ্ছিন্ন করা হয়। এছাড়া ওইসব এলাকা থেকে অবৈধভাবে নেওয়া গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। রোজার কারণে মানবিক দিক বিবেচনায় উচ্ছেদ অভিযান কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ ছিল। দ্রুতই বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে বাকি বসতি উচ্ছেদে অভিযান শুরু হবে বলে মন্তব্য করেন এ কর্মকর্তা।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ২০০৭ সালের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানাভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পাহাড়ে বসবাসকারী এক হাজার পরিবারকে অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে প্রাণহানি থেকে রক্ষা হতো।

তিনি আরও বলেন, এবার পাহাড়ে বসতিদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এরপরও পাহাড়ধসে যদি মৃত্যু হয়, মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মোয়াজ্জম হোসাইন বলেন, পাহাড় কেটে খাঁজে খাঁজে বসতি গড়ে তোলার কারণেই পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পাহাড় কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

পাহাড় ধসের প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে গঠিত শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত কার্যত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর কিছুদিন এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তোড়জোড় দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে যত দিন গড়াতে থাকে ততই ফাইলের ওপর বাড়তে থাকে ধুলার স্তর। পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী পুনর্বাসন না করায় এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন অনেকে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি পাহাড়ে ৮৩৫টি পরিবার বসবাস করছে। এসব পাহাড়ের মধ্যে ১০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়ে ৫৩১ পরিবার এবং বাকি সাতটি সরকারি পাহাড়ে ৩০৪ পরিবার বসবাস করছে। সরকারি পাহাড়গুলোর মালিক সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, চট্টগ্রাম ওয়াসা, গণপূর্ত ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

বিভিন্ন সময়ে পাহাড় ধসে মৃত্যুবরণ করেছেন শত শত পাহাড়বাসী। সর্বশেষ গত বছরের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার ফিরোজ শাহ কলোনিতে মা-মেয়েসহ চারজন নিহত হন পাহাড় ধসের কারণে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box