চট্টগ্রামে বেড়েছে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চট্টগ্রাম নগরীসহ আশপাশের এলাকায় বেড়েছে অজ্ঞান ও মলম পার্টির দৌরাত্ম্য। যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন, লঞ্চ, ফেরি, ফেরিঘাট, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন কোথাও যেন নিরাপদ নয় লোকজন। তবে এক্ষেত্রে ঈদকে সামনে রেখে তাদের তৎপরতা বাড়ে। সম্প্রতি নগরীতে অভিযান চালিয়ে পার্টির চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো চুন্নু, মো. জসিম, নুর ইসলাম ও মো. আকবর। তাদের সবার বাড়ি ভোলা জেলার লালমোহন এলাকায়। পুলিশের তথ্য মতে, গত ১০ বছরে এদের প্রতারণার খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে ৯০০ লোক। এদের মধ্য অসুস্থ হয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে বলেও তথ্য আছে। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম বলেন, কিছু দিন ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে অনেকে নিঃস্ব হচ্ছেন। এমন খবর পাওয়া মাত্রই একটি বিশেষ টিম নগরীসহ আশপাশের এলাকার কাজ করছে। এমন একটি গ্রুপের চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে তথ্যও পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) নোবেল চাকমা জানান, অজ্ঞান পার্টির চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অজ্ঞান করার বিভিন্ন ওষুধ, ওষুধ মেশানো জুস ও মলম উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি নগরীতে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় সিএমপি কমিশনারের নির্দেশে একটি টিম গঠন করা হয়। গত পাঁচ দিন ধরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রথমে টাইগারপাস মোড় থেকে শুক্রবার রাতে চুন্নুকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, স্টেশন রোড এলাকা থেকে এ চক্রের বাকি দুই সদস্য জসিম ও নুর ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অজ্ঞান করে ছিনতাইয়ের ধারণাটি এ চক্রই প্রথম চট্টগ্রামে দেখায়। তাদের হাত ধরেই পরবর্তীতে অজ্ঞান পার্টির আরো চক্র তৈরি হয়। তারা যাত্রীবেশে গাড়িতে উঠে। যাত্রীর ধরন বুঝে প্রথমে টার্গেট করে। তারপর পরিচয় হয়ে যাত্রীর অবস্থা বুঝে নেয়। এরপর টার্গেট কনফার্ম হলে অন্য সদস্যদের চোখে ইশারা বা মোবাইলের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়। টার্গেট করা যাত্রীর কাছে বিশ্বাস জমানোর জন্য নিজেরা ব্যাগ থেকে বের করে বিস্কুট, চিপস এসব খায়। পরে যাত্রীকে খাওয়ায়। ব্যাগ থেকে জুস বের করে প্রথমে নিজে অর্ধেক খেয়ে ফেলে। পরে যাত্রীকে দেওয়ার সময় কৌশলে জুসে ওষুধ মিশিয়ে দেয়। সেই যাত্রীর সবকিছু নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে তারা।

গ্রেফতারকৃত আসামিরা জানায়, বাসের যাত্রী সেজে অথবা বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে তারা মানুষকে আকৃষ্ট করে অজ্ঞান করার ওষুধ মিশ্রিত খাবার খাওয়ায় এবং রাস্তায় খাবারের পসরা বসিয়ে বিশেষ করে আখের রস, ডাব, হালুয়া ইত্যাদি ও সিএনজিতে যাত্রী বেশে অন্য যাত্রীদের ওঠানো কিংবা পান ও জুস খাইয়ে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়।

সহজ-সরল মানুষ শুধু নয়, বুদ্ধিবৃত্তি কাজের সঙ্গে জড়িত মেধাবীরাও অজ্ঞান পার্টির শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানোর পাশাপাশি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয় নিজের অজান্তেই। অভিযোগ রয়েছে, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা গ্রেফতার হলেও তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে ফাঁকফোকর থাকায় আদালত থেকে অতি সহজে ছাড়া পায়।

সচেতন মহল মনে করেন এ ধরনের অপরাধী যাতে সহজে ছাড়া না পায় তা নিশ্চিত করতে আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করা দরকার। এছাড়া অজ্ঞান পার্টির কার্যকলাপ সম্পর্কে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে অবহিত করতে হবে, প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ বিষয়ে অজ্ঞান পার্টির কৌশল প্রচার করতে হবে। পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টির কার্যকলাপ সম্পর্কে জনগণকেও সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। খাওয়ার আগে খাদ্যদ্রব্যর গুণগত মান যাচাই করতে হবে, কোনো খাবারের প্যাকেট বা পানীয়ের বোতল আগেই খোলা হয়েছে কি না তা খাওয়ার আগে লক্ষ করতে হবে।

নোবেল চাকমা জানান, যাদের গ্রেফতার করেছি তারা ‘ভোলাইয়া গ্রুপ’ নামে পরিচিত। তারা চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন রুট, ঢাকা, কক্সবাজার, নোয়াখালী, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুরসহ বিভিন্ন রুটের বাসে যাত্রীদের অজ্ঞান করে টাকা ও মালপত্র ছিনিয়ে নেয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments