ঘটনায় ঘটনায় বিশ্বকাপ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিশ্বকাপ তো এক নস্টালজিয়ার নাম। ফুটবল বা ক্রিকেট, সেটি যে বিশ্বকাপই হোক! চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসে, অজস্র নস্টালজিয়াকে সঙ্গী করে। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ মানেই তো রেকর্ডের ফুলঝুড়ি, অদ্ভুতুড়ে ঘটনার সমারোহ। ইতিহাসের পাতা উল্টে এমন পাঁচটি ঘটনা নিয়েই আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদন

১৯৮৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের জয়টা ছিল অভাবনীয়ই। জয়ের আশাটা পুরোপুরি মিইয়ে গিয়েছিল প্রথমে ব্যাটিং করে ভারত ১৮৩ রানে গুটিয়ে যাওয়ায়। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে স্বয়ং ভারত অধিনায়ক কপিল দেবের স্ত্রীও সেদিন খেলা দেখা বাদ দিয়ে হতাশা বুকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন শপিং করতে! কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় ভারত। এ ঘটনার পর নাকি কপিলের স্ত্রী রোমি ভাটিয়া অনেক দিন খেলা দেখতেন না। তিনি খেলা না দেখলে যদি ভারত ম্যাচ জেতে, তাহলে তো খেলা না দেখাই ভালো।

কপিল দেবের এমন ভুল

১৯৮৭ বিশ্বকাপের ঘটনা এটি। মাদ্রাজে (এখন চেন্নাই) ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে মনিন্দর সিংয়ের একটি বল উড়িয়ে মারেন অস্ট্রেলিয়ার ডিন জোনস। সেটি সীমানা পার হলেও চার হয়েছে নাকি ছয়—এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সে বিতর্ক কোনো সমাধান দিতে পারছিল না। পরে সিদ্ধান্ত হয় মধ্যাহ্নবিরতির সময় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।
ইনিংসের বিরতির সময় ভারতীয় অধিনায়ক কপিল দেবকে জিজ্ঞেস করা হয় যদি ছক্কা দেওয়া হয়, তাহলে তাঁর কোনো আপত্তি আছে কিনা। তিনি যদি জোনসকে ছক্কা দেন, তাহলে রান বাড়বে, না হলে আগেরটাই থাকবে। কপিল মহানুভবতার পরিচয় দিলেন। ছক্কাই দিয়ে দিলেন। ২ রান যোগ হয়ে অস্ট্রেলিয়ার মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৭১। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ভারত সে ম্যাচ হেরে যায় মাত্র ১ রানে!

নন্দনকাননে আগুন

নিজেদের মাটিতে আরেকটি বিশ্বকাপ। শিরোপা জয়ই লক্ষ্য ছিল ভারতের। কিন্তু ১৯৯৬ বিশ্বকাপে সেমিতেই থেমে গিয়েছিল মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের ভারতের দৌড়। অবশ্য সে ম্যাচে জয়-পরাজয় ছাপিয়ে কলঙ্কিত এক ঘটনায় বিমূঢ় হয়েছিল ক্রিকেট দুনিয়া। কলকাতার বিখ্যাত ইডেন গার্ডেনের গ্যালারিতে সেদিন লেগেছিল দর্শকদের অসহিষ্ণুতার আগুন!

সে ম্যাচে ভারতের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। সে সময় দুর্দান্ত ফর্মে থাকা শ্রীলঙ্কার দুই ওপেনার রমেশ কালুভিতারানা আর সনৎ জয়াসুরিয়াকে দ্রুতই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জাভাগাল শ্রীনাথ। ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া লঙ্কানদের পথ দেখান অরবিন্দ ডি সিলভা ও রোশান মহানামা। যদিও সংগ্রহটা ২৫১-এর বেশি নিতে পারেনি তারা। ইডেনের লাখো দর্শকের সামনে টেন্ডুলকার-আজহারউদ্দিন-সিঁধু-মাঞ্জরেকাররা ২৫১ রান খুব সহজেই টপকে যাবেন, এমন প্রত্যাশাই ছিল সকলের। ভারতের রান তাড়ার শুরুটা দারুণ হয়েছিল। শচীন টেন্ডুলকার উইকেটের চারদিকে মেরে লক্ষ্যটাকে সহজ বানিয়ে ফেলছিলেন। ভারতের এগিয়ে যাওয়ার এমন একটা সময় ‘লিটল মাস্টার’ ফিরলেন দলীয় ৯০ রানে, স্টাম্পড হয়ে। ভারতের ভাগ্য বিপর্যয়ের শুরুটা এখান থেকেই। ১ উইকেটে ৯৮ থেকে দলটা একপর্যায়ে পরিণত হয় ৮ উইকেটে ১২০-এ।

এমন ব্যাটিং পারফরম্যান্স হতেই পারে। কিন্তু ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেননি ইডেনের দর্শকেরা। শুরু হয় বোতল ছোঁড়া, গ্যালারিতে লাগিয়ে দেওয়া হয় আগুন। এমন একটা পরিস্থিতিতে খেলা চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ দেখেননি ম্যাচ রেফারি ক্লাইভ লয়েড। শ্রীলঙ্কাকে জয়ী ঘোষণা করেই ম্যাচ শেষ করে দেন লয়েড। ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে দর্শক হাঙ্গামার কবলে পড়া একমাত্র ম্যাচ এটিই।

প্রসাদের মধুর প্রতিশোধ

১৯৯৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ ছিল বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে। এ ম্যাচে ভারত পাকিস্তানকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে যায়। ম্যাচটিতে উত্তেজনা ছড়ায় পাকিস্তানি ওপেনার আমির সোহেল ও ভারতীয় পেসার ভেঙ্কটেশ প্রসাদের ‘বাহাস’। বাহাসে হেরে গেলেও মধুর প্রতিশোধটা কিন্তু প্রসাদ ঠিকই নিয়েছিলেন।

ঘটনাটি পাকিস্তানের ইনিংসের শুরুর দিকে। ভারতের বড় সংগ্রহ তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের দুই ওপেনার আমির সোহেল ও সাঈদ আনোয়ার তখন দুর্দান্ত। শ্রীনাথ-প্রসাদদের বলগুলো পেরিয়ে যাচ্ছে সীমানা। এমন সময় প্রসাদের বলে একটি বাউন্ডারি হাঁকান সোহেল। উত্তেজনায় টগবগ করতে সোহেল প্রসাদকে কভারের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে স্লেজ করেন। ব্যাপারটা মাথা নিচু করে হজম করলেও ঠিক পরের বলেই সোহেলকে বোল্ড করেন প্রসাদ। মধুর প্রতিশোধের এমন দুর্দান্ত উদাহরণ আর পাবেন?

জাভেদ মিঁয়াদাদের হনুমান নৃত্য

১৯৯২ বিশ্বকাপে সিডনিতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। ভারত প্রথমে ব্যাটিং করে খুব বেশি তুলতে পারেনি। ২১৬ রানেই থামে তাদের ইনিংস। মোটামুটি সহজ লক্ষ্যমাত্রা পেয়েও পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানরা শুরুটা খুব ভালো করতে পারেননি।
নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকা পাকিস্তানকে ভরসা জোগাচ্ছিলেন আমির সোহেল ও জাভেদ মিয়াঁদাদ। কিন্তু উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে ব্যাটসম্যানদের বিরক্ত করছিলেন ভারতীয় উইকেটরক্ষক কিরণ মোরে। মিয়াঁদাদই বেশি বিরক্ত হচ্ছিলেন। প্যাডে লাগলেই এলবিডব্লুর আবেদন, কট বিহাইন্ডের আবেদন; চেঁচিয়েই যাচ্ছিলেন মোরে।
এমন সময় অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে পিচে। মোরের আবেদনে বিরক্ত হয়ে মোরেকে ব্যঙ্গ করতেই হনুমানের মতো লাফাতে থাকেন মিয়াঁদাদ। বিশ্বকাপের ‘আইকনিক’ দৃশ্যগুলোর একটি হচ্ছে মিয়াঁদাদের সেই লাফ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments