গ্রামেও কাটা মাথা আতঙ্ক॥ মারমুখী ভঙ্গিতে স্থানীয়রা

দেশের অন্যতম বড় নির্মাণ প্রকল্প পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে এমন একটি অপপ্রচার ও গুজব শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যেকোনো গ্রামে অপরিচিত মানুষ দেখলে অনেকটা মারমুখী ভঙ্গিতেই স্থানীয় বাসিন্দারা পরিচয় জিজ্ঞেস করছেন। যথাযথ পরিচয় দেওয়ার পরও গ্রামের মানুষজন ঠিক আশ্বস্ত হতে পারছেন না। স্থানীয় কেউ যতক্ষণ না অপরিচিত ব্যক্তিকে তার পরিচিত বলে আশ্বস্ত করছে, ততক্ষণ সন্দেহ কাটছে না এলাকাবাসীর। সরেজমিনে গ্রামে গিয়ে এই পরিস্থিতি দেখা যায়।

বেশ কয়েকদিন ধরেই সারাদেশে গুজব ছড়িছে পড়েছে যে পদ্মা সেতু নির্মাণে এক লাখেরও বেশি মানুষের মাথা প্রয়োজন। আর সে গুজব থেকেই গ্রামের মানুষদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অপরিচিত কাউকে দেখলে ছেলেধরা বলে সন্দেহ করছেন।

গত ৯ জুলাই পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলামের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ পরিচালনায় মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি কুচক্রী মহল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অপপ্রচার চালাচ্ছে তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এটি একটি গুজব। এর কোনো সত্যতা নেই। এমন অপপ্রচার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করা যাচ্ছে।

এছাড়া শিশু অপহরণ গুজব ঠেকাতে বিশেষ অভিযান চালানো কথা জানিয়েছে পুলিশ কর্তৃপক্ষ। তবে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পরও যে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটেনি, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে ছেলেধরা সন্দেহে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক গণপিটুনির ঘটনায়।

বিষয়টি নিয়ে সুলতানা করিম নামে গ্রামের সচেতন এক অভিভাবকের কাছে জানতে চাইলাম, কেন তাদের এই সন্দেহ?

তিনি বলেন, টিভিতে এক সংবাদে দেখলাম, নেত্রকোনায় একটা এলাকায় একটা লোকের ব্যাগের মধ্যে শিশুর মাথা পাওয়া গেছে। লোকটাকে পিটিয়ে ওখানেই মেরে ফেলা হয়েছে। এসব দেখে আমাদের ভয় হয়। বাচ্চাদের একা ছাড়তে পারি না।

‘কাটা মাথা’ আতঙ্ক এখন শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে। নিজের শিশু সন্তান হারিয়ে যাওয়ার ভয় এখন মানুষের মধ্যে জেঁকে বসেছে। গ্রামের সাধারণ কোন কিছুতেই তারা বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন না যে এটা একেবারেই একটা গুজব। নেত্রকোনায় এক ব্যক্তির ব্যাগে শিশুর কাটা মাথা পাওয়া যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মূলত এই ধারণা মানুষের মাঝে অনেকটা বদ্ধমূল হয়েছে যে ‘কাটা মাথার’ বিষয়টি কোন গুজব নয়।

‘ছেলেধরা’ ও ‘কাটা মাথার’ বিষয়টি কেন এটা বিশ্বাস করছেন- প্রশ্নের উত্তরে সুলতানা করিম বলেন, ‘টিভির সংবাদ সবাই বিশ্বাস করে। সংবাদে সত্যিটাই দেখানো হয় বা বলা হয়।’
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘ছেলেধরা’ ও ‘কাটা মাথা’ গুজব গ্রামাঞ্চলে এতটাই ছড়িয়েছে যে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যন্ত কমে গেছে।
এ ব্যাপারে কথা হয় আয়েশা আক্তার নামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই খবর এখন ফেসবুকে ও খবরে সব জায়গায় ছড়াছড়ি চলছে যে ছেলেধরা বাচ্চাদের ধরে মাথা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে বাচ্চারা ভয়ে কম আসছে। অভিভাবকরাও ভয়ে স্কুলে পাঠাচ্ছে না।’

সবচেয়ে ভয়াবহ খবর হলো, এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছে যে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে থেকে একটি করে শিশু চাওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়েশা আক্তার বলেন, ‘অনেকে জানতে চায় যে, আপনার বিদ্যালয়ে কি এ রকম কোন তথ্য দিয়েছে যে একটা বাচ্চা দেওয়া লাগবে? আমরা বলি যে এ ধরনের কোন তথ্য নাই। এই কথাটা সম্পূর্ণই গুজব।’ কিন্তু স্কুলের শিক্ষকদের কথায়ও আস্থা পাচ্ছেন না অভিভাবকেরা।

“আসলে ‘কাটা মাথার’ বিষয়ট এতোই ছড়িয়ে গেছে যে, শিক্ষকদের কথাও সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। তারা বলে, সব জায়গায় কি এত মিথ্যা কথা হয়?,” বলেন আয়েশা আক্তার।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের মতো এখন প্রত্যন্ত গ্রামেও অনেক অভিভাবক শিশু সন্তানদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া করছেন।
সামছ পাটওয়ারী নামে একজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘এখন বাচ্চাদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া লাগে এবং বাচ্চাদের স্কুল থেকে গিয়ে আনা লাগে। আমরা ছেলে ধরা নিয়ে খুব আতঙ্কের মধ্যে আছি।’

দেশে গুজব যেভাবে ছড়ালো : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন না গ্রামের এমন কয়েকজনের পুরুষের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, গ্রামের হাট-বাজারে অনেকেই ‘ছেলেধরা’ ও ‘কাটা মাথা’ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছেন, আর সেখান থেকেই তারা বিষয়টি শুনেছেন।

এছাড়া অনেকে আবার লোকমুখে এমনও শুনেছেন যে দূরের কোন গ্রামে এক শিশু হারিয়ে গেছে। যদিও বিষয়টি গ্রামের লোকজন কখনো সত্য-মিথ্যা যাচাই করেননি, তবে এভাবেই গুজবের ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে।

অন্যদিকে গ্রাম্য অনেক নারী ‘মাথা কাটার’ বিষয়টি শুনেছেন হয়তো তাদের বিভিন্ন আত্মী য়-স্বজনের কাছে, নয়তো বিদ্যালয়ের অন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে। ‘ছেলেধরা’ ও ‘কাটা মাথা’ গুজবের বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে অবশ্য এখন তথ্য জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে পদ্মাসেতুতে মাথা লাগার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

গত ৯ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ১৪ দিনে গণপিটুনিতে দেশে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহতের সংখ্যা আরও বেশি। এসব ঘটনার শিকার হওয়া প্রায় সবাই নিরীহ নিরপরাধ মানুষ। দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘ছেলেধরা’ গুজবে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।

এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘মানুষ যাতে আইন নিজের হাতে তুলে না নেয় সেজন্য জনসচেতনতা তৈরি করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ও টিভিসিসহ নানা ভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো শুরু হয়েছে এবং আরও ব্যাপকতর করা হচ্ছে।’ আরও ব্যাপক হারে প্রচারণার জন্য চলতি মাসের ৩১ তারিখে তথ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এক সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

গতকাল (২৪ জুলাই) পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল সুপরিকল্পিতভাবে দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রথম পোস্টটি করা হয় দুবাই থেকে। দুবাইয়ের এক ব্যক্তি এই পোস্টটি করেন। গুজব ও গণপিটুনির ঘটনায় ৩১টি মামলায় এ পর্যন্ত ১০৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, মাথাকাটার গুজব ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত ৬০টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও ২৫টি ইউটিউব লিংক এবং ১০টি ওয়েব পোর্টাল বন্ধ করা হয়েছে। এই সমস্ত ফেসবুক ও ইউটিউব লিংকের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছিল। যতগুলো ঘটনা ঘটেছে সবই গুজব। যারা নিহত হয়েছে কেউই ছেলেধরা ছিল না।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০৩টি মামলা হয়েছে। আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩১ জনকে বলে জানান আইজিপি।

Facebook Comments