গেরুয়া সেনার কাণ্ডারী মোদী-শাহ জুটি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার প্রথম দিনেই বাজিমাত করেছে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ। এরইমধ্যে শুভেচ্ছা আর অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তার যোগ্য সহযোদ্ধা, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। তবে এসবের মাঝে একটি বিষয় এখন মুখে মুখে চর্চিত। কিসে বিজেপির এই বিশাল জয়ের মন্ত্র? অবশেষে জানা গেল বিজেপির সাফল্যের মূলমন্ত্র মোদী-শাহ রসায়নে। ভারতের রাজনীতিতে এরা দু’জন যেন বিখ্যাত সোলে সিনেমার জয়-বীরু বা ক্রিকেট মাঠের শচীন-শেহবাগ ।

মোদী-শাহের এমন অসাধারণ জুটি ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের পরই লাইমলাইটে আসে ৷ ২০১৪ সালে বিজেপির অভূতপূর্ব সাফল্যই অমিত শাহের প্রতি মোদীর ভরসা বাড়িয়ে তোলে ৷ মোদী-শাহ জুটির ইতিহাস জানতে হলে রাজনীতির পাতায় কিছুটা সময় পিছিয়ে দিতে হবে ।
বা থেকে- ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা এল কে আদভানি – ছবি: ফাইল ফটো

২০১৩ সালের জুন মাস, শাহ তখন সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড, মোদীর পরে দলে দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ৷বানারসে ভোটের কাজে গিয়েছিলেন অমিত শাহ ৷আসলে আরএসএস-এর তরফে শাহের কাঁধে একটা বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ৷ ২০১৪ নির্বাচনে বিজেপির তরফে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মনোনীত নরেন্দ্র মোদীর জন্য উপযুক্ত নির্বাচনী কেন্দ্র খুঁজে বের করার উদ্দেশে উত্তরপ্রদেশে ইলেকশন ট্যুরে বেরিয়েছিলেন শাহ ৷ এমন আসন চাই যেখান থেকে মোদীর জয় নিশ্চিত ৷শাহের স্ট্র্যাটেজিক মস্তিষ্কের সোজাসাপ্টা থিওরি ছিল, উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পতাকা ওড়াতে হলে আগে পূর্বাঞ্চলে জিততে হবে ৷ বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ জানতেন, হিন্দুবাদকে হাতিয়ার করে সুবক্তা মোদী ঠিক বেনারসের মন জয় করে ফেলবে ৷
বা থেকে- প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ – ছবি: ফাইল ফটো

একদিকে উত্তরপ্রদেশে জয়ের ডঙ্কা, অন্যদিকে মোদীর ‘বিকাশ পুরুষ’-এর ভাবমূর্তি নুইয়ে পড়া দলকেও নতুন করে উজ্জীবিত করবে ৷নিজের স্ট্র্যাটেজি দিয়ে গুজরাটে তিন তিনবার কংগ্রেসকে আটকে দলের কাছে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা ততদিনে অমিত শাহের প্রমাণ করা হয়ে গিয়েছে ৷পার্টি ছাড়াও নিজের ছায়াসঙ্গী অমিত শাহের সিদ্ধান্তের উপর মোদীরও ছিল পূর্ণ আস্থা ৷ বানারস বা বারাণসীর ওই কেন্দ্রে থেকে বহুদিন ধরে বিজেপি প্রার্থী ছিলেন প্রবীণ নেতা ৮০ বছরের মুরলী মনোহর যোশী ৷ ২০১৪ নির্বাচনেও ওই আসন থেকেই লড়তে চাইছিলেন যোশি ৷ কিন্তু শাহের পরিকল্পনা ছিল মোদী বারাণসী থেকে জিতেই প্রধানমন্ত্রী হবেন ৷তাই তিনি যোশির ইচ্ছেকে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে সাফ জানিয়ে দেন বারাণসী থেকে প্রার্থী হবেন নরেন্দ্র মোদীই, আর যোশি চাইলে কানপুর কেন্দ্র থেকে লড়তে পারেন ৷ শাহের এমন সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন মুরলি মনোহর যোশি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাই হল যা অমিত শাহ চেয়েছিলেন ৷
সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের বিজয় মঞ্চে মোদী-শাহ জুটি – ছবি: নিউজ১৮

• মোদী আর শাহের এই সম্পর্কের শুরু কোথায়:

এই জুটি আজকের নয়, ৩০ বছরের পুরনো বন্ধন ৷ ১৯৮২ সালে সঙ্ঘের এক শাখায় দুজনের দেখা ৷ তখন অমিত শাহের বয়স ১৭ ৷ আর সেসময় নরেন্দ্র মোদী সঙ্ঘের প্রচারক রূপে কাজ করতেন ৷ সঙ্ঘচালক বালাসাহেব দেবড়া যখন মোদীকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন, তখন শাহই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যাকে মোদী এই কথা জানিয়েছিলেন ৷ যোগ্য বন্ধুর মতোই অমিত শাহও মোদীকে রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন ৷শাহ জানতেন মোদীর মাধ্যমেই তিনি নিজের রাজনৈতিক আকাঙ্খা পূর্ণ করতে পারবেন ৷

• অমিত শাহের উপর মোদী এত ভরসা কেন করেন:

মোদীর জন্য খুব কঠিন সময় ছিল, যখন ‘সাহাবুদ্দিন মামলায়’ অমিত শাহ জেলে গিয়েছিলেন ৷সেই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদী শাহকে জেল থেকে ছাড়াবার জন্য সমস্ত রকম চেষ্টা করেছিলেন ৷জেলে থাকলেও এই সমস্ত খবরই অমিত শাহের কাছে পৌঁছছিল ৷মোদীর টেনশন কমাতে শাহ জেল থেকে মেসেজ পাঠান, ‘যতই চেষ্টা করুক কংগ্রেস, অমিত শাহকে ভাঙতে পারবে না ৷’

আসলে ‘সাহাবুদ্দিন’ মামলাই ছিল মোদী ও শাহের বন্ধুত্বের অগ্নিপরীক্ষা ৷দুজনেই এই খেলার অভিজ্ঞ ও তুখোড় খেলোয়াড় ৷ এই সময়েই শাহ-মোদীর কাছে একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ততার চরম প্রমাণ দেন ৷ অন্যদিকে, মোদি এই সময়ের মধ্যেই শাহের অভাব অনুভব করে তাঁর ভবিষ্যত ভূমিকা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন ৷

সাহাবুদ্দিন মামলায় প্রায় তিন মাস জেলে কাটিয়েছিলেন অমিত শাহ ৷সেসময় উনি প্রচুর বই পড়েন ৷মনের জোর বাড়াতে মোদির পরামর্শে বিবেকানন্দও পড়েন শাহ ৷গুরুর প্রতি একজন শিষ্য কিভাবে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন তা বোঝাতেই মোদির এমন পরামর্শ ৷রামকৃষ্ণ পরমহংসের পায়ে যেমন করে নিজেকে অর্পণ করেছিলেন বিবেকানন্দ ৷ঠিক সেই দীক্ষাই যেন ধারন করেন অমিত শাহ।
দিকদর্শনে বা কাজের প্রয়োজনে, একই মতাদর্শ ধারণ করেন মোদী-শাহ – ছবি: ফাইল ফটো

• শাহ কেন উত্তরপ্রদেশকে নিজের কর্মভূমি বানিয়েছিলেন:

সাহাবুদ্দিন মামলায় বাজেভাবে ফেঁসে গিয়েছিলেন অমিত শাহ ৷ জামিনের আর্জি নিয়ে শীর্ষ আদালতে আবেদন করেন তিনি ৷সুপ্রিম কোর্ট জামিন মঞ্জুর করলেও সঙ্গে শর্ত চাপিয়ে দেয়৷অমিত শাহের গুজরাট যাওয়ার উপর জারি হয় নিষেধাজ্ঞা ৷সু্প্রিম কোর্টের এই নির্দেশে বড়সড় ধাক্কা খান মোদী-শাহ ৷দুজনেই বুঝতে পেরেছিলেন এই সিদ্ধান্তের প্রভাব রাজ্যের কাজকর্মে পড়বে ৷কিন্তুর মোদীর দূরদৃষ্টিতে বদলে যায় সবকিছু ৷কোর্টের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে তাঁকে আর্শীবাদে বদলে দেন তিনি ৷অমিত শাহ নিজের কর্মভূমি গুজরাট থেকে বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারছিলেন না ৷এমন সময় মোদী শাহকে পরামর্শ দেন পুরনো কর্মভূমির দুঃখ ভুলে উত্তরপ্রদেশের দিকে নজর ঘোরাতে ৷মোদির কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে কাজ শুরু করে দেন শাহ ৷নরেন্দ্র মোদি এটা ভালভাবেই জানতেন বিজেপিকে দিল্লি পৌঁছতে হলে উত্তরপ্রদেশের রাস্তা ধরেই যেতে হবে ৷

• কী করে বিজেপির প্রধান হলেন অমিত শাহ:

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দেশ জুড়ে পদ্ম ঝড়ের পরই মোদির শপথ নেওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল ৷প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই নিজের সবথেকে বিশ্বাসভাজন অমিত শাহকে বিজেপির অধ্যক্ষ পদে বসিয়ে দেন নরেন্দ্র মোদি ৷শাহকে এত গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সিদ্ধান্তে একের পর এক প্রশ্ন উঠতে থাকে ৷সাহাবুদ্দিনের ভুয়ো এনকাউন্টারের মামলা ছাড়াও অমিত শাহের বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর একটি মেয়ের উপরে গোয়েন্দাগিরি করারও অভিযোগ ওঠে ৷একের পর এক ধামাচাপা পড়া মামলা তুলে এনে শাহের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে ৷নির্বাচনী ময়দানে অমিত শাহ হলেন মুকুটহীন বাদশা ৷গুজরাটে মোদীর ১২ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় শাহ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন ৷
অমিত মিত্রতার উদাহরণ নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ জুটি – ছবি: ফাইল ফটো

মোদী ও শাহের সম্পর্কে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা বলেন, শাহ মোদীকে একটা বড় ব্র্যান্ড হিসেবে দেখেন এবং নিজেকে তাঁর বিজ্ঞাপনদাতা-প্রচারক মনে করেন ৷লোককে নিজের কথা দিয়ে কিভাবে প্রভাবিত করতে হয় তা মোদী খুব ভালভাবেই জানেন ৷অন্যদিকে, শাহকে বরাবরই অনুগত সৈনিকের মতো মোদির ছায়াসঙ্গী হিসেবে চলতে দেখা গিয়েছে ৷কিন্তু ২০১৪ সালের পর এদের সম্পর্কে দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয় ৷এখন মোদী লক্ষ্য দেন ও তা পূরণের দায়িত্ব পড়ে অমিত শাহের উপর ৷মোদী-শাহের সম্পর্ক তাদের সম্বোধনেই স্পষ্ট ৷অমিত শাহ মোদীকে সাহেব বলে ডাকেন ৷ গুজরাটেও শাহ ক্রিকেট বোর্ডের অধ্যক্ষ পদের নির্বাচনে জিতেছিলেন কিন্তু মোদীর জন্য সেই পদ ছেড়ে দেন ৷শাহকে অনেকেই মজা করে মোদীর নাইট চেয়ারম্যান বলেন, যে দরকার পড়লে মোদীর জন্য প্রাণত্যাগও করতে পারে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments