গুজব থেকে গণপিটুনি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

পদ্মা সেতুকে ঘিরে কিছুদিন ধরেই সারাদেশে ছেলেধরা আতঙ্কে ভুগছে মানুষ। ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতিও কমে গেছে। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের একা বিদ্যালয়ে ছাড়তে ভয় পাচ্ছেন। ছেলেধরা সন্দেহে গত কয়েকদিনে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে গণপিটুনির শিকার হয়ে কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। তাই এর প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। সরকারি-বেসরকারিভাবেও কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। প্রতিদিনই মাইকিং করে যাচ্ছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবারও বগুড়া, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নড়াইল, সুনামগঞ্জ, নরসিংদী, ঝিনাইদহ, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসচেতনতামূলক পথসভা, মানববন্ধন, মাইকিং, আলোচনা সভা, সমাবেশ ও লিফলেট বিতরণ করা হয়। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সাহস দিয়ে এ প্রচার চলে। এসব কর্মসূচি থেকে সবাইকে ছেলেধরা গুজবে কান দিয়ে গণপিটুনি না দিতে এবং কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের একটাই চাওয়া- দ্রুত থামুক ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনির এই নৈরাজ্য।

বগুড়া ব্যুরো জানায়, ছেলেধরা গুজবে হুজুকে পড়ে কাউকে গণপিটুনি না দেওয়ার জন্য বগুড়ায় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। জনতার উদ্দেশে বলা হচ্ছে, কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশে সোপর্দ করুন। গতকাল থেকে শহর ও গ্রামাঞ্চলে এই মাইকিং শুরু হয়। বগুড়ায় এক সপ্তাহে পাঁচটি পৃথক ঘটনায় আটজন গণপিটুনির শিকার হয়েছে। পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা ফেসবুকে এ বিষয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ‘গুজবে কান দেবে না, সবই মিথ্যা কথা, তোমরা কি ভয় পাও?’ শিক্ষার্থীরা বলল- ‘না’। সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জড়ো করে গতকাল এভাবেই বলছিলেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়াতুন নবী, সদর থানার ওসি শহীদুর রহমানসহ পুলিশ কর্মকর্তারা।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানা পুলিশের আয়োজনে উপজেলার সব উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়েছে। গতকাল উপজেলার পাগলা সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে এ সভা হয়।

ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, ইন্দুরকানীতে ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমছে। আতঙ্ক দূর করার জন্য ইন্দুরকানী থানার ওসি হাবীবুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করেছেন।

কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি জানান, কালীগঞ্জ থানা পুলিশের উদ্যোগে স্কুলে স্কুলে সমাবেশ, শহরে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। থানার ওসি ইউনুচ আলীর উপস্থিতিতে কালীগঞ্জের সরকারি নলডাঙ্গা ভূষণস্কুল ও সলিমুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ে এ সমাবেশ করে পুলিশ। এ ছাড়াও পুলিশের উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।

লোহাগড়া (নড়াইল) প্রতিনিধি জানান, লোহাগড়ায় মাইকিং করা হয়েছে। লোহাগড়া থানা পুলিশের উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ মাইকিং করা হয়।

পলাশ (নরসিংদী) প্রতিনিধি জানান, উপজেলা অডিটরিয়ামে উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত জনসচেতনামূলক সভায় উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির সদস্যরা অংশ নেন। প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সৈয়দ জাবেদ হোসেন। সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা ইয়াসমিন।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, জগন্নাথপুর থানা পুলিশ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রচার চালিয়েছে। গতকাল জগন্নাথপুর পৌর শহরের স্বরূপ চন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, আব্দুল খালিক উচ্চ বিদ্যালয়, আব্দুস সোমহান উচ্চ বিদ্যালয়, আটপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গুজবে কান না দেওয়ার জন্য প্রচারণা চালানো হয়। এ ছাড়াও ‘গুজব ছড়াবেন না, আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’- এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন হাটবাজারে মাইকিং করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

গতকাল কয়েকটি বিদ্যালয় প্রচারে অংশ নেওয়া জগন্নাথপুর থানার এসআই হাবিবুর রহমান বলেন, গুজবের আতঙ্কে যাতে শিক্ষার্থীরা ভয় না পায়, সে জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা করছি আমরা। জগন্নাথপুর থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে জগন্নাথপুর থানা পুলিশের ৯টি টিম জগন্নাথপুরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রচারণায় অংশ নেয় বলে তিনি জানিয়েছেন। জগন্নাথপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালিক বলেন, ৬০০ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গতকাল উপস্থিতি ছিল ৩০০ জন। বন্যা আর ছেলেধরা গুজবে হয়তো উপস্থিতি কম হতে পারে।

কালিয়া (নড়াইল) প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার দিনভর উপজেলাজুড়ে মাইকিং করা হয়েছে। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এলাকবাসীকে সতর্ক করেছে দুই থানা পুলিশ।

নড়াইল প্রতিনিধি জানান, জেলা পুলিশের আয়োজনে মঙ্গলবার নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে আলোচনা সভা হয়। উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা জানান, গুজব সৃষ্টিকারী, ধর্ষক, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু পরিষদের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২নং ফটকের সামনে মানববন্ধন হয়। উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সাধারণ সম্পাদক খায়রুল কবির সুমন, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিয়ার রহমান প্রমুখ। এ ছাড়া ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশের পথসভাসহ অন্যান্য কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments