গুজব ছড়িয়ে স্বার্থসিদ্ধি!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ভয়ঙ্কর ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মারা হচ্ছে নারীসহ সাধারণ মানুষকে। এই গুজবকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই সন্দেহের বশে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এমন নৃশংস কাজে যুক্ত হচ্ছে এলাকার উঠতি যুবক থেকে শুরু করে শিক্ষিত মানুষরাও। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমন গুজব ছড়িয়ে মানুষ পিটিয়ে হত্যা একটি ফৌজদারি অপরাধ।

সম্প্রতি ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে’ এমন গুজব রটিয়ে দিয়েছে একটি চক্র। চক্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নভাবে পোস্ট ও ছবি ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। অনেকে বিষয়টি বিশ্বাসও করছে। ফলে কোনো নারী বা পুরুষকে সন্দেহ হলেই তাকে আটক করে কখনও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে আবার কখনও তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এ গুজব এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

এ পর্যন্ত গুজবের বলি হয়ে প্রাণ হারিয়েছে সাতজন নিরপরাধ মানুষ। আর পিটিয়ে আহত করা হয়েছে ৩৫ জনকে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি থেকে বাদ যায়নি মমতাময়ী মা, মানসিক নারী, সন্তানের বাবা, যুবক ও বৃদ্ধ। রোববার নওগাঁয় ছয়জন, পাবনায় দুজন, আলমডাঙ্গায় একজন, কুমিল্লায় চারজন ও রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে এক প্রতিবন্ধী নারীকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। পরে পুলিশ তাদের আটক করে রক্ষা করেছে।

শনিবার রাজধানীর বাড্ডায় এক নারীকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একইদিন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে এক যুবককে, সিদ্ধিরগঞ্জে পৃথক দুই স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক যুবক, সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী শাপলা চত্বর এলাকায় এক নারী ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন হযরতপুর ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবক গণপিটুনিতে নিহত হয়। এর আগে ১৮ জুলাই নেত্রকোনা শহরের নিউ টাউনের পুকুরপাড় এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়াও গত ৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে ছেলেধরা সন্দেহে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের চাঁদগেটে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

বাড্ডায় এক মমতাময়ী মাকে পিটিয়ে হত্যা : রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে তাসলিমা বেগম রেনুকে পিটিয় হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন যুবককে শনাক্ত করেছে পুলিশ। শনিবার সকালে ওই ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে পুলিশের বেশ তোড়জোড় শুরু হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে ওই বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলা থেকে ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। পুলিশের বাড্ডা জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আহমেদ হুমায়ূন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও মোবাইলে ধারণকৃত কিছু ফুটেজ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

আলমডাঙ্গায় গণপিটুনি থেকে এক নারীকে রক্ষা : আলমডাঙ্গায় গণপিটুনির হাত থেকে পুলিশের কারণে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন করিবন নেছা নামে এক নারী। তিনি রাজধানীর নবাবগঞ্জের কামরাঙ্গীরচরের পান্না হোসেনের স্ত্রী। রোববার বিকালে আলমডাঙ্গা স্টেশন এলাকার লোকজন তাকে এক শিশুসহ আটক করে।

কুমিল্লায় চারজনকে গণপিটুনি : কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার পৃথক দুটি স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে রোবাবর সকালে গণপিটুনিতে চারজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতরা হলেনÑ ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের বেজোড়া গ্রামের রতœা বেগম (৫০) তার স্বামী আবুল কালাম ও একই গ্রামের জয়নাল আবেদিনের ছেলে আনোয়ার হোসেন (২৮)।

গোদাগাড়ীতে প্রতিবন্ধী নারীকে গণপিটুনি : রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক প্রতিবন্ধী নারীকে গণপিটুনি দিয়েছে এলাকাবাসী। শনিবার দুপুরে পৌর এলাকার শ্রীমন্তপুরে শিবা বেওয়া (৫৫) নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধী নারী এই গণপিটুনির শিকার হন।

নওগাঁও ছয়জনকে গণপিটুনি পর আটক : ছেলেধরা সন্দেহে নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ছয় জেলেসহ সাতজনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা। রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার কুসম্বা ইউনিয়নের বুড়িদহ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পাবনায় ২ নারীকে পুলিশে সোপর্দ : পাবনায় পৃথক দুটি ঘটনায় ছেলেধরা সন্দেহে দুই নারীকে পুলিশ সোপর্দ করেছে স্থানীয়রা। পাবনার সদর উপজেলার ভাড়ালা ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকা থেকে সোনিয়া খাতুন (২৮) ও ভাঙ্গুড়ায় উপজেলার খুশিয়ারা (৩০) নামে এক গৃহবধূকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।

সাভারে গণপিটুনিতে হত্যা মামলা : সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক নারীকে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ৮০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছে পুলিশ।

এদিকে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে এ পর্যন্ত যতগুলো নিহতের ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেকটি ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

মনোবিদরা যা বলছেন : গুজব ছড়িয়ে কোনো মানুষকে গণপিটুনি দেওয়া ও তাকে হত্যার বিষয়টিকে মব সাইকোলজি বলে মনে করেন মনোরোগবিদ মেহতাব খানম। এই মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, একটি সমাজে যখন নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় ঠিক সে সময়ে তাদের মনে এক ধরনের মানসিক অবসাদ বাসা বাঁধে। তাতে তারা ভুগতে থাকেন। আর সেই থেকেই সহিংসতা দেখা দেয়।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা যা বলছেন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারহানা রহমান বলেন, দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নেই। তারা মনে করে এই লোকটাকে ছেড়ে দিলে পরে তাকে আর আইনের আওতায় এনে সাজা দেওয়া সম্ভব হবেনা। এজন্য তারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments