গুজবের বাড়ি কোথায়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

গুজবে আক্রান্ত গোটা দেশ। এক গুজব শেষ না হতেই আরেক গুজব এসে হাজির হচ্ছে। পদ্মা সেতু তৈরিতে কাটা মাথার প্রয়োজন বলে ছড়ানো গুজবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে অহেতুক আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১২ জনের। আর এমনই আতঙ্ক ও গুজবের নিচে চাপা পড়ে গেছে ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি। গুজবের জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী বিএনপি একে অপরকে দুষছে। তাদের বক্তব্য-পাল্টাবক্তব্যে জানাই যাচ্ছে না এসব গুজবের বাড়ি কোথায়।

জানা গেছে, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার অধিকাংশই নারী, মানসিক ভারসাম্যহীন ও নিরীহ মানুষ। গণপিটুনির ঘটনাগুলো এতটাই নির্মম ও বর্বরোচিত যে, সাধারণ বিবেকবান মানুষ রীতিমতো আঁতকে উঠছেন। গুজবের শুরু থেকেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তরফ থেকে বারবার বলা হয়েছে, এসব তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই।

এমন বার্তা ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে- কাউকে কোনো কারণে সন্দেহ হলে কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে সন্দেহভাজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ তা মানেনি। গুজবকে সত্য মনে করে জড়িয়ে পড়েছেন গণপিটুনির ঘটনায়। হত্যা করেছেন নিরীহ মানুষকে।

পুলিশ ইতোমধ্যে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ ৬০টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ১০টি ওয়েব পোর্টাল ও ২৫টি ইউটিউব লিঙ্ক বন্ধ করে দিয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে শতাধিক ব্যক্তিকে। সেই সঙ্গে পুলিশ জানিয়েছে, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের কেউই ছেলেধরা ছিলেন না।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘একটি মহল দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য আন্দোলনসহ নানা উপায় অবলম্বন করে ব্যর্থ হয়ে এখন গুজব ছড়াচ্ছে। তারা দেশের বাইরে থেকেও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে। গুজবের ঘটনায় এ পর্যন্ত যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের যোগসূত্র পেয়েছি।’ আইজিপি বলেন, ‘প্রথম যে ফেসবুক পোস্টটি পুলিশের নজরে এসেছে, সেটার মূল খুঁজতে গিয়ে ‘দুবাইভিত্তিক একজনের’ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, যিনি সরকারবিরোধী রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।’

শনিবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সরাসরি বিএনপির প্রতি আঙ্গুল তুলে বলেছেন, বিএনপির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হচ্ছে ‘গুজবের ফ্যাক্টরি’।

এর আগে আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও গুজবের পিছনে বিএনপি-জামায়াতের হাত রয়েছে বলে ইঙ্গিত করেছিলেন। তখন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, সরকার তাদের ব্যর্থতা আড়াল করতে এসব কথা বলছে।

পদ্মা সেতুর জন্য কাটা মাথা দরকার এমন গুজবের রেষ শেষ হতে না হতেই সারা দেশে তিন দিন বিদ্যুৎ থাকবে না, পানি থাকবে না, এমন গুজবও রটেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। এসব গুজব সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

নিকট অতীতে বেশ কয়েকটি গুজবের ঘটনায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার নজির রয়েছে দেশে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে-এমন গুজব রটিয়ে সারা দেশের পরিস্থিতি টালমাটাল করে তোলা হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী এ গুজবের পিছনে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। ধর্মান্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষে ছড়ানো হয়েছিল উদ্ভট গুজব। সে গুজবের সূত্র ধরে সাঈদীর মুক্তির দাবিতে সারা দেশে জামায়াত-শিবির ও উগ্র গোষ্ঠী ভয়াবহ তাণ্ডবে মেতে উঠে।

গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন, বোমাবাজি, ককটেলবাজি, লুটপাটসহ নানা সহিংস কাণ্ড ঘটায়। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সে ঘটনায় সারা দেশে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ১৩ জন।

এর আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে এক বৌদ্ধ যুবক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কোরআনের অবমাননা করেছে বলে গুজব রটিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে রাতারাতি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল রামুর একাধিক বৌদ্ধপল্লী। পুড়িয়ে ছাই করা হয়েছিল শত বছরের পুরনো বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির।

একইভাবে ২০১৬ সালের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ফেসবুকে ছবি দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ ও গুজবকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার হিন্দু মন্দির ও বসতিতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটানো হয়। পরে জানা যায়, রসরাজ নামের যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে ইসলাম ধর্মের অবমাননার অভিযোগ তোলা হয় সেই রসরাজ ফেসবুকই চালাতে পারতেন না। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে রংপুরে একই কৌশলে টিটু রায় নামের আরেক যুবকের নামে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি তৈরি করে হামলা চালানো হয় রংপুরের ঠাকুরপাড়া গ্রামে। যেখানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয় হিন্দু বসতিতে।

বিএনপি অফিস গুজব ‘ফ্যাক্টরি’ : ওবায়দুল কাদের
সারা দেশে ‘ছেলেধরা’ গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য সরাসরি বিএনপিকে দায়ী করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বিএনপির নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হচ্ছে গুজবের ফ্যাক্টরি। সেখান থেকে বসে বসে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে একদিকে অপ্রপচার করছে, অন্যদিকে নানা গুজব রটাচ্ছে। গুজব থেকে গণপিটুনি, এই গুজবের পেছনেও এই দলটির হাত রয়েছে।

শনিবার ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের রজতজয়ন্তীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আন্দোলন ও নির্বাচনে ব্যর্থ, বিএনপি তাদের নেত্রীর (খালেদা জিয়া) জন্য হা-হুতাশ করছে। তার শারীরিক অবস্থা যতটা না খারাপ, তার চেয়ে বেশি অপপ্রচার করছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস একটা গুজবের ফ্যাক্টরি। সেখান থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নানা অপপ্রচার ও গুজব রটানো হচ্ছে। সরকারের কাছে এসব বিষয়ে তথ্য রয়েছে। আমরা জানি, তারা কী করছে, কোথায় বসে ষড়যন্ত্র হচ্ছে? দেশে হচ্ছে, বিদেশে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে বিএনপির অপপ্রচারের কারণে এখন দেশের মানুষ তাদের বিশ্বাস করছে না। তারা বলে খালেদার স্বাস্থ্যের অবনতি আর অবনতি। অথচ ডাক্তাররা বলেন, তিনি ভালো আছেন। এখন কোনো সত্য কথা বললেও দলটিকে বিশ^াস করে না দেশবাসী।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দেশের অভ্যন্তরে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। তারা এখনো দেশে-বিদেশে নানামুখী চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এদের প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

সরকার সক্রিয়ভাবে ডেঙ্গু ও বন্যার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে বলেও জানান ওবায়দুল কাদের। সমাবেশ শেষে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি ধানমন্ডি ২৭ নম্বর হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিনের কেক কাটেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

ডেঙ্গু দমনে ব্যর্থ হয়ে গুজব বলছে সরকার : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ডেঙ্গু দমনে ব্যর্থ হয়ে ছেলেধরা গুজবের মতো এ রোগকে গুজব বলছে সরকার। ডেঙ্গুতে মানুষ মরছে আর সরকারি দলের নেতারা বলছেন, এটা নাকি বিএনপির যড়ষন্ত্র।
শনিবার দুপরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় পাটিকাপাড়া ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সময় তিনি এ কথা বলেন।

‘ছেলেধরা’ গুজব প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশে আইনের শাসন নেই বলে মানুষকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। যে দেশে সন্তানের সামনে মাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় সে দেশে আইনের শাসন আছে বলে মনে হয় না। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে গেলে ছেলেধরা আতঙ্ক থাকবেই। প্রশাসন শুধু বিএনপি নিধনেই ব্যস্ত। সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। তাই দেশে ছেলেধরা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তিনি বলেন, বন্যার্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ সংকট দেখা দিলেও সরকারের মন্ত্রী ও এমপিদের দেখা নেই। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে না দাঁড়িয়ে লুটপাটে ব্যস্ত।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকারের হামলা, মামলা আর নির্যাতনে বিএনপি আজ প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছে। সরকার পরিকল্পিতভাবে বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের দমন করতে জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে। তারপরও বিএনপি মানুষের জন্য রাজনীতি করে যাচ্ছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে ফখরুল বলেন, ভোট ৩০ ডিসেম্বর হওয়ার কথা থাকলেও ভোট হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর রাতে। তাই এ সংসদ ভেঙে দিয়ে আবারও নির্বাচন দিতে হবে।

এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু প্রমুখ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments