গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী বেলাই বিল

শামীম শিকদার

গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরের কানাইয়া এলাকায় অবস্থিত উন্নত ভূমির যেসব বিল রয়েছে তার মধ্যে বেলাই বিল হচ্ছে অন্যতম। চেলাই নদীর পাশ ঘেঁষেই এ বিল। ৪০০ বছর পূর্বেও বেলাই বিলে কোন গ্রামের অস্তিত্ব ছিল না। খরস্রোতা চেলাই নদীর কারণে বিলটিও খরস্রোতা স্রোতস্বিনীরূপে বিরাজমান ছিল। কিংবদন্তি আছে, ভাওয়ালের ঐ সময়ের ভূস্বামী ঘটেশ্বর ঘোষ ৮০টি খাল কেটে চেলাই নদীর জল নিঃশেষ করে ফেলেন। তারপরই এটি প্রকাণ্ড বিলে পরিণত হয়।

বর্তমানে বিলটি আট বর্গমাইল এলাকায় নিয়ে বিস্তার হলেও একসময় এটি আরও বড় ছিল। বাড়িয়া, ব্রাহ্মণ-গাঁও, বক্তার-পুর ও বাম-চিনি মৌজা গ্রাম নিয়ে বেলাই বিলের অবস্থান। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিলের চারপাশে গ্রামের বিস্তার হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে জেলেরা বিলের চারপাশে মাছ ধরার জন্য ডাঙ্গি খনন করে। আর শুষ্ক মৌসুমে বিলটি হয়ে ওঠে এক-ফসলি জমি। তাতে চাষ হয় বোরো ধান। বিভিন্ন কারণে এই বিলটির নাব্যতা কমে গেছে, একই সাথে বালু নদীর নাব্যতাও কমে এসেছে। বিশাল এই বিলটির কোনো কোনো স্থানে প্রায় সারাবছরই পানি থাকে, তবে বর্ষায় এর রূপ বেড়ে যায় অনেকাংশে।

বামচিনি মৌজা গ্রামটি বেলাই বিলের একটি দ্বীপ-গ্রাম। এর বিশেষত্ব এক মৌজায় এক বাড়ি। গাজীপুরে এই বামচিনি মৌজা ছাড়া এমন নজির দেশের অন্য কোথাও আছে বলে জানা নেই। প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং শিল্পায়নের দূষণ মুক্ত কিন্তু ঢাকার খুব কাছেই এরকম একটি জায়গা এক দিনের মাঝে ঘুরে আসার জন্য চমৎকার একটি গন্তব্য হতে পারে।
এখানে ইঞ্জিন চালিত আর ডিঙ্গি নৌকা দুটোই পাওয়া যায়। তাড়া থাকলে ইঞ্জিন নৌকা, আর হাতে সময় থাকলে হাতে বাওয়া ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে নিতে পারেন। মাঝির সাথে কথা বলে নিজেই সেই নৌকা বেয়ে দেখতে পারেন, ভিন্ন একটা অভিজ্ঞতা হবে সন্দেহ নেই। নৌকা সারাদিনের জন্য ভাড়া করে নিতে পারেন। বিকেলে এই বিলের চারপাশে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি হয়। সঠিক সময়ে গেলে চারপাশে পাবেন শাপলার ছড়াছড়ি। এলাকাটি এখনও জনপ্রিয় টুরিস্ট আকর্ষণ হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তাই সবকিছু এখনও প্রাকৃতিক রয়েছে, মানুষগুলোও ঠিক তাই। সারাদিনের জন্য গেলে সাথে করে খাবার নিয়ে যাওয়াটা ভাল হবে।

পড়ন্ত বেলায় কানাইয়া বাজারের কাছে তৈরি হওয়া নতুন সেঁতুর ওপর দাঁড়িয়ে এর সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। শাপলা-শালুকে ভরা বেলাই বিল। সাদা ও নীল শাপলার ছড়াছড়ি। নারীদের শস্য ঝাড়াইয়ের দৃশ্যও চোখে পড়বে। বিলে বুকে স্বচ্ছ টলটলে পানি। এখানকার গ্রামের মাটি লাল। লাল মাটিতে লাউ খুব ভালো জন্মায়। আর রয়েছে সারি সারি তালগাছ যা নৌকায় বসেদূরের তালগাছ দেখতে বেশ সুন্দর দেখায়।

বর্ষাকাল বেলাই ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। কানাইয়া বাজারে চা-বিস্কুট ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সুতরাং বহনযোগ্য খাবার সঙ্গে নিন। নিজস্ব গাড়িতে টঙ্গী-পুবাইল হয়ে কানাইয়া যেতে সময় বাঁচবে, সঙ্গে যুক্ত হবে মনোরম পথসৌন্দর্য। এক দিনের জন্য দারণ বেড়ানোর জায়গা হচ্ছে বেলাই বিল।

যেভাবে যাবেনঃ

গুলিস্তান থেকে বাসে গাজীপুর বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে রিকশা বা টেম্পোতে কানাইয়া বাজার। কানাইয়া বাজার ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। দরদাম করে উঠে পড়ুন। চাইলে নিজস্ব বাহনেও যেতে পারেন দলবেঁধে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box