গণপরিবহনে হত্যা-ধর্ষণ বাড়ছে আতঙ্ক

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মাত্র শুরু হয়েছিল তানিয়ার জীবন। পরিবারের স্বপ্নগুলোও বড় হচ্ছিল তাকে ঘিরে। চাকরি করতেন ইবনে সিনা হাসপাতালে। বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে। ঢাকা থেকে রওনা হয়েছিলেন বাড়িতে। বাসে বসে শাহিনুর আক্তার তানিয়া বাবাকে ফোনে বলেছিলেন, এই তো চলে আসছি। না তার আর যাওয়া হয়নি। বাসের ড্রাইভার-হেলপারসহ এক দল নরপিশাচ তাকে হত্যা করেছে ধর্ষণ শেষে।

কিন্তু এই ধরনের ঘটনা আর কত? এর শেষ কোথায়? গণপরিবহনে আর কত নারী ধর্ষণ-হত্যা-হয়রানির শিকার হবেন?
২০১৮ সালে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যান সমিতি প্রকাশিত রিপোর্টে ১৩ মাসে গণপরিবহনে ২১ নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা বলা হয়। বাস, প্রাইভেট কার, অটোরিকশা ও ট্রাকে এসব ঘটনা ঘটে। গণপরিবহনের চালক-হেলপারসহ সহযোগীরা মিলে ৯টি গণধর্ষণ, ৮টি ধর্ষণ ও ৪টি শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব ঘটনায় ৫৫ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

যদিও সংস্থাটির মহাপরিচালক মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, বাস্তবে গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনা আরো বেশি। তিনি বলেন, রুপা গণধর্ষণ-হত্যাসহ আগের ঘটনাগুলোর যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা হতো এবং গণপরিবহনের মালিকরা যদি শ্রমিকদের যথাযথভাবে সচেতন করতে পারতেন তাহলে এ ধরনের ঘটনা কমে আসতো।

গত বছর অ্যাকশন এইডের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের শতকরা ৮৮ জন নারী রাস্তায় চলার পথে যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্যের মুখোমুখি হন। এদের মধ্যে ৮৬ ভাগ গণপরিবহণের চালক ও হেলপারদের দ্বারা হয়রানিমূলক মন্তব্যের শিকার হন।
বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে আইনের কঠোর প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন। সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছেন নারীদেরও। অপরাধ বিজ্ঞানি তৌহিদুল হক বলেন, গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বিঘ্নিত হচ্ছে।

গত বছর বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যম চলন্ত বাসে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার ২০টি ঘটনা পর্যালোচনা করে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ২০১৩ সালে দুটি, ২০১৫ সালে চারটি, ২০১৬ সালে তিনটি, ২০১৭ সালে ছয়টি এবং ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচটি ঘটনা প্রকাশিত হয়। অপরাধ সংঘটনের স্থান বিশ্নেষণে দেখা যায়, ঢাকা জেলায় সবচেয়ে বেশি এ ধরনের অপরাধ হয়েছে।

পরে টাঙ্গাইলে চারটি, ময়মনসিংহে দুটি, চট্টগ্রামে দুটি; বরিশাল, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালীতে একটি করে ঘটনা ঘটেছে। অর্ধেক ঘটনাই মহাসড়কে, ২৫ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে এবং ২৫ শতাংশ রাজধানী বা নগরীর অভ্যন্তরীণ সড়কে। অপরাধ সংঘটনস্থল সাধারণত স্টেশন থেকে দূরে ছিল, যেখানে পথচারী বা টহলরত পুলিশ কম থাকে। ঘটনা মাঝারি পাল্লার বাসে বেশি ঘটেছে। যার পরিমাণ ৩৫ শতাংশ। পরে যথাক্রমে আন্তঃশহরে ৩০ শতাংশ, স্বল্প দূরত্বের লোকাল বাসে ২০ শতাংশ ও দূরপাল্লার সিটিং বাসে ঘটেছে ১৫ শতাংশ। মোট ২১ জন ভিকটিমের মধ্যে ১৩ জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, পাঁচজনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণচেষ্টা এবং তিনজনকে একক ধর্ষণ করা হয়েছিল।

এদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ৫০ শতাংশ ঘটনায় ভিকটিমকে চলন্ত অবস্থায় যানবাহন থেকে ফেলে দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনে প্রায় ৫৫ শতাংশ ঘটনায় দুই-তিনজন, ৩৫ শতাংশ ঘটনায় চার-পাঁচজন এবং ১০ শতাংশ ঘটনায় ছয় বা ততোধিক ব্যক্তি অংশ নিয়েছে ।
অপরাধ সংঘটনকারীদের বয়স অধিকাংশেরই ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। কিছু সংখ্যক ৩৬ বা মধ্যবয়সী। অধিকাংশ ঘটনায় কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবহন কর্মীরা যেমন ড্রাইভার, সুপারভাইজার ও সহযোগীরা জড়িত ছিল। কিছু ঘটনায় অন্য পরিবহনের শ্রমিক বা পেশাগত অপরাধীরা অংশগ্রহণ করেছিল।

রুপা গণধর্ষণ-হত্যার বিচার হয়নি আজো: ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা শেষে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে মেধাবী তরুণী রুপাকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণ করে পরিবহন শ্রমিকরা। পরে চলন্ত বাসেই তাকে হত্যার পর মধুপুর পঁচিশ মাইল এলাকায় বনের মধ্যে ফেলে রেখে যায়। এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ রাতেই অজ্ঞাত পরিচয় মহিলা হিসেবে তার লাশ উদ্ধার করে। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে রূপার লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মধুপুর থানায় হত্যা মামলা করে। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে নিহতের ভাই হাফিজুর রহমান মধুপুর থানায় তাকে শনাক্ত করেন। ২০১৮ সালের ২৮শে আগস্ট এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ময়মনসিংহ-বগুড়া সড়কের ছোঁয়া পরিবহনের ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার আসামিরা প্রত্যেকেই এখন টাঙ্গাইল কারাগারে আটক রয়েছে। দেশ কাঁপানো টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে সিরাজগঞ্জের তাড়াশের আসানবাড়ী গ্রামের কলেজছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রুপাকে গণধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয় গত বছর। রূপাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে চার জনের ফাঁসি ও একজনের সাত বছরের কারাদন্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় দেন।

গণপরিবহনে গণধর্ষণের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের শুভেচ্ছা পরিবহনের চলন্ত বাসে নারী ধর্ষণ, ২০১৫ সালের ১২ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে বাসচালক ও চালকের সহকারী মিলে চলন্ত বাসে পোশাক কর্মী ধর্ষণ। ঢাকায় এক গারো তরুণীকে চলন্ত মাইক্রোবাসে ধর্ষণ। ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি বরিশালে সেবা পরিবহনের একটি বাসে পাঁচ পরিবহন কর্মী মিলে দুই বোনকে ধর্ষণ। ওই বছরের ১লা এপ্রিল টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী থেকে ঢাকাগামী বিনিময় পরিবহনের একটি বাসে ধর্ষণের শিকার এক পোশাক কর্মী। ও ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহের নান্দাইলে বাসে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

কী বলছেন বিশ্লেষকরা: অ্যাকশন এইডের ব্যবস্থাপক ও নারী অধিকারকর্মী কাশফিয়া ফিরোজ মানবজমিনকে বলেন, প্রথমত আমাদের নিদৃষ্ট কোনো ট্রান্সপোর্ট গাইডলাইন নেই। আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে জেন্ডার রেসপনসিবলের ওপর ট্রান্সপোর্টেশন গাইডলাইন থাকতে হবে। ট্রান্সপোর্ট অথরিটি এই ইস্যুটিকে কিভাবে চিহিৃত করছে সেটাও দেখার বিষয়। এই ধরণের ঘটনায় প্রচলিত আইনে সাজা হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা চাই ইস্যুটি সুনিদৃষ্ট করে চিহৃত করা হোক। যেটা আমরা এখন পর্যন্ত দেখিনি।

এছাড়া বিভিন্ন পরিবহনকে লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে মনিটরিং এর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো একটা পরিবহনে এমন ঘটনা ঘটার পর হুট করে তার লাইসেন্স বাতিল করে দিলাম। এটা না করে বরং লাইসেন্স দেয়ার সময়ই এ বিষয়ে মালিক পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। যে আমার কোম্পানি এই শর্তগুলো মেনে নিয়ে আমরা লাইসেন্সটা নিচ্ছি। পরিবহণ সেক্টরে যে ড্রাইভার এবং হেলপার আছে তাদের জন্য অবশ্যই একটা ওরিয়েন্টেশন ও ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। এটা হতে পারে জেন্ডার ইস্যুতে ট্রেনিং। কিংবা তাদের পরিবহনে যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে তাদের করনীয় কি। এক্ষেত্রে একটি হটলাইন নাম্বার প্রত্যেকটি পাবলিক বাসের মধ্যে দেয়া যেতে পারে। এধরনে ঘটনা মনিটর করতে পাবলিক বাসে সিসি টিভি লাগানো যেতে পারে।

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক লিগাল ম্যানেজার অ্যাডভোকেট সোহেল রানা বলেন, মানিকগঞ্জে সর্বপ্রথম যে গণপরিবহনে গার্মেন্ট কর্মী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে সেই মামলার পরিচালনার কাজে আমি সরাসরি যুক্ত ছিলাম। উক্ত মামলায় আসামিদের সাজা দেয়া হয়েছে। এক বাক্যে বলতে গেলে এটাতো অন্যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্যায়টি হচ্ছে গাড়ির মালিকরা যাদেরকে গাড়ি চালাতে দেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে না জেনেই গাড়ি চালাতে দেয়া। তারা নারী এবং শিশুর প্রতি কতটা সহনশীল। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন। এগুলো সম্পর্কে যথাযথ ধারণা থাকা উচিৎ।

একটি পাবলিক পরিবহন এমন একজন মানুষকে চালাতে দেয়া হলো যে কিনা একজন নারী ও শিশুর প্রতি সহনশীল নয়। অপরাধির সামনে দৃষ্টান্ত মূলক কোনো শাস্তি না থাকায় ঘটনাটি বারবার ঘটছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা জামিন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং ভিক্টিমদের হুমকি দেয়। ভয়ভীতি দেখায়। ফলে অধিকাংশ মামলাই আলোর মুখ দেখেনা। এ ধরনের ঘটনায় দু-একটি বিচার হলে সেটা কিন্তু প্রকৃত দৃষ্টান্ত না। বিচার হতে হবে কঠিনভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।

অপরাধ বিজ্ঞানি তৌহিদুল হক বলেন, গণপরিহনে নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বিঘ্নিত হচ্ছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন রকম। কিন্তু সামগ্রিকভাবে নারীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। নারী সম্মান হারাচ্ছে। মূলত তিনটি কারণে দেশে পরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উথাপিত হয়। প্রথম, যে সকল ঘটনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি বা নজর পাচ্ছেনা সেই ঘটনাগুলোই কিন্তু হারিয়ে যায়। অনেকগুলো ঘটনার মধ্যে সম্প্রতি নুসরাতের ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি ও সতর্কতার কারনে এই পর্যন্ত এসেছে।

কাজেই আমরা দেখছি যে ঘটনা সরকার প্রধানের দৃষ্টি এরিয়ে যায় সেই ঘটনাগুলো একসময় হারিয়ে যায়। শুধুমাত্র চালক বা হেলপারের ব্যক্তিগত সাহসে এ ধরনের ঘটনা সাধারণত ঘটেনা। এই ঘটনার পেছনে বড় কোনো শক্তি কাজ করে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারনে তারা অনৈতিক অনেক বিষয় দেখে থাকে।

ফলে তার বিপরীত লিঙ্গ দেখলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। এই হীন ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে তারা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে। তৃতীয়ত, আমাদের সামাজিক লিডার বলতে শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, পুরোহিত ও সমাজের সচেতন ব্যক্তিরা এক সময় এসব ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু এখন সবাই আত্মকেন্দ্রীক আচরণ করছে। ফলে সামাজিক আচরণের পরিবর্তে এক ধরনের ব্যক্তিস্বার্থের বিষয় কাজ করে।

এ থেকে পরিত্রানের উপায় হচ্ছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা। এছাড়া জাতীয় বাজেটে সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সর্বশেষ যেটা মনে রাখতে হবে, সব কিছুতে রাজনীতিকরণ না করে যদি আমরা সামাজিকভাবে দেখি তাহলে একটি ইতিবাচক ফল আশা করা যেতে পারে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments