গণপরিবহনে সন্ত্রাস থামছে না

আলোকিত সকাল ডেস্ক

যাত্রীর ওপর অব্যাহত সন্ত্রাস গণপরিবহনে চলমান নৈরাজ্যে যুক্ত করেছে আতঙ্কের নতুন এক মাত্রা। একের পর এক বাস থেকে যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চাকায় পিষে হত্যা, ধর্ষণের পর খুন, যানবাহনের মধ্যে সংঘবদ্ধ ছিনতাই, এমনকি মাত্র দশ হাজার টাকার চুক্তিতে চলন্ত বাসে পরিকল্পিতভাবে এক নারীহত্যার ঘটনা মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, মহাখালী টার্মিনাল থেকে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে চলাচল করা বাসগুলোতেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে সবচেয়ে বেশি।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতির কারণে কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক নেতার অনুগত ক্যাডাররাই গণপরিবহনে চালক-হেলপার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। আর চুক্তিভিত্তিক যান চলাচল বন্ধের কথা বার বার বলা হলেও বাস্তবে তা আরও জেঁকে বসেছে। এর ফলে পরিবহনে মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের সুস্থ বিকাশ ঘটার বদলে গডফাদার-ক্যাডার ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের মূল কারণ এই চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতি ও গডফাদার-ক্যাডার ব্যবস্থা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, প্রভাবশালী মালিক-শ্রমিক নেতাদের মদদ না থাকলে গণপরিবহনের চালক-হেলপারদের পক্ষে এ ধরনের হত্যা, ধর্ষণ ও সন্ত্রাস ক্রমাগত ঘটানো সম্ভব নয়। সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে বাস থেকে ফেলে হত্যার পর হত্যাকারীদের বাঁচাতে মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘট ডাকার ঘটনা প্রমাণ করে এসবের পেছনে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের মদদ রয়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ সমকালকে বলেন, কোনো যাত্রীকে বাস থেকে ফেলে খুনের ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা হবে। এসব ক্ষেত্রে মালিক সমিতি কোনোভাবেই চালক-হেলপারদের পক্ষে দায়িত্ব নেবে না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী সমকালকে বলেন, ৭০ লাখ শ্রমিকের মধ্যে দুই-চার হাজার খারাপ থাকতেই পারে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, শ্রমিক সংগঠনই তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছে। কারও ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য তাকে রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, গণপরিবহনে গডফাদার বা মাফিয়া বলে কিছু নেই। তিনি জানান, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চালকদের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে পেশাগত ও সামাজিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছে। এর সুফল পেতে এক থেকে দু’বছর সময় লাগবে।

কয়েকটি নৃশংস ঘটনা :সমকালের অনুসন্ধানে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই বাস থেকে ধাক্কা মেরে পিষে যাত্রী হত্যার ঘটনা ঘটেছে আটটি। এ ছাড়া ঘটেছে একটি ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। ২০১৮ সালে ছিনতাইয়ের পর এবং যাত্রীর সঙ্গে কথা

কাটাকাটির ঘটনায় বাস থেকে ফেলে হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৪টি।

সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে গত ৯ জুন রোববার। এ দিন মহাখালী টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের জেলাগুলোতে চলাচলকারী আলম এশিয়া পরিবহনের একটি বাসে ভাড়া নিয়ে তর্কের জের ধরে গাজীপুরের বাঘেরবাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসযাত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রথমে বাস থেকে ফেলে দেয় হেলপার। পরে তার ওপর বাস চালিয়ে তাকে হত্যা করে চালক।

একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গত ২০ মে। মহাখালী টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহগামী বাস সৌখিন পরিবহনের চালক আরেকটি বাসের সঙ্গে বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা শুরু করলে প্রতিবাদ করেন যাত্রী সাদিকুর। পরে তাকে ত্রিশাল এলাকায় হেলপার বাস থেকে ফেলে দেয়। এ সময় চালক তাকে পিষে হত্যা করে।

১১ মে মহাখালী টার্মিনাল থেকে শেরপুরে চলাচলকারী খেয়া পরিবহনের বাস থেকে খিলক্ষেত এলাকায় হেলপার ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করে হারুনকে। পরে চালক পুলিশের কাছে স্বীকার করে, হারুন ইফতারের জন্য বাস থামাতে বললে ক্ষিপ্ত হয়ে হেলপার তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।

৭ মে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মহাখালী টার্মিনাল থেকে চলাচল করা স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসের চালক ও হেলপার বাসযাত্রী শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে গণধর্ষণের পর বাসের নিচে ফেলে হত্যা করে। পরে চেষ্টা করে দুর্ঘটনার নাটক সাজানোর।

৪ এপ্রিল যশোরের অভয়নগরে একটি ট্রাক রাস্তার মাঝখানে রেখে যানজট সৃষ্টি করে। শরীয়তপুর থেকে আসা ফেম পরিবহনের সুপারভাইজার আকাশ বাস থেকে নেমে এর প্রতিবাদ করেন। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ট্রাকচালক ও তার সহকারী আকাশকে মারধর করে একটি চলন্ত তেলবাহী ট্যাঙ্কারের সামনে ফেলে দেয়। পিষ্ট হয়ে আকাশ সেখানেই নিহত হন।

২৩ মার্চ সিলেটের শেরপুরে মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জের ধরে উদার পরিবহনের বাসের হেলপার ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওয়াসিম আফনানকে।

৪ মার্চ রাজধানীর হাজারীবাগে সেন্ট্রাল পরিবহনের বাসচালক আরেকটি বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে। এর প্রতিবাদ জানান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাকিব। এ সময় তাকে বাসের চালক ও হেলপার পিটিয়ে গুরুতর আহত করে বাস থেকে ফেলে হত্যার চেষ্টা চালায়। তবে অন্য যাত্রীদের হস্তক্ষেপে কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে যান সাকিব।

১৭ জানুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সদরঘাট থেকে চন্দ্রা রুটে চলাচল করা আজমেরি পরিবহনের বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করা হয় স্কুলছাত্র হযরত ওমরকে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে কুড়িগ্রাম, বরিশাল, যশোর, ঝিনাইদহ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে আরও ১৪ জনকে একইভাবে চলন্ত বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৮ সালের ২১ জুলাই হানিফ পরিবহনের চালক ও হেলপার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র পায়েলকে ধাক্কা দিয়ে আহত করে পরে সেতুর ওপর থেকে নদীতে ফেলে হত্যা করে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলগামী বাসের চালক সালাম ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে বৃদ্ধ আকবর আলীকে বাস থেকে ফেলে দিয়ে তার মেয়ে জরিনা খাতুনকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। এগুলো ছিল ২০১৮ সালের আলোচিত ঘটনা। এ ছাড়া ২৭ আগস্ট চট্টগ্রামের কালীর হাটে সিটি সার্ভিসের বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয় রেজাউল করিম রনিকে।

বর্বরতার নেপথ্যে :বিভিন্ন ঘটনা থেকে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন প্রতিবাদী যাত্রীরা। ভুক্তভোগীরা জানান, যাত্রীরা মূলত দুটি কারণে প্রতিবাদ করে। প্রথমত, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং দ্বিতীয়ত, চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমানে রাজধানীতে সিটি সার্ভিস কিংবা আন্তঃজেলা রুটের কোনো বাসেই সরকার নির্ধারিত ভাড়া বলে কিছু নেই। পরিবহন শ্রমিকরা একেক সময় একেক হারে ভাড়া নির্ধারণ করে যাত্রীদের কাছ থেকে জোর করে আদায় করছে।

যেমন, রাজধানীর আজিমপুর থেকে উত্তরা ও গাজীপুর রুটে চলাচল করা লোকাল বাস বিকাশ ও ভিআইপি পরিবহনে সকালে সর্বনিম্ন ৪০ টাকা হারে ভাড়া নেওয়া হয়। দুপুরে একই দূরত্বে সর্বনিম্ন ২৫ টাকা, আবার বিকেলে সর্বনিম্ন ৪০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। এসব বাসকে সিটিং সার্ভিস বলা হলেও গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে লোক নেওয়া হয় সকাল-বিকাল।

অভিযোগ, কয়েকজন প্রভাবশালী পরিবহন শ্রমিক নেতার হস্তক্ষেপে চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। চালকদের পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে রাখা, ইউনিফর্ম পরানো এবং যাত্রীদের টিকিট দেওয়ার সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না তাদের কারণে। এ ধরনের নেতাদের সুষ্পষ্ট মদদেই পরিবহন শ্রমিকরা সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box