খেলাধুলাতেও বৈষম্য

আলোকিত সকাল ডেস্ক

নানা উপেক্ষার শিকার উত্তরবঙ্গের মানুষ খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও দেশের অন্য যে কোনো অঞ্চল থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে। উত্তরের দুই বিভাগীয় শহর রাজশাহী ও রংপুরে নেই কোনো আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়াম। ১৬ জেলার মধ্যে কেবল বগুড়াতে রয়েছে একটি আন্তর্জাতিকমানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘ এক যুগ ধরে সেখানেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে না কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ।

অনেক দিন ধরে খেলা না হওয়ায় অযত্ন আর অবহেলায় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের দেয়ালসহ বিভিন্ন অংশ ধসে পড়েছে। ইনডোর ক্রিকেট ফ্যাসিলিটি ভবনের বেশকিছু অংশের কাচও ভেঙে গেছে। রং করা হয়নি অনেক দিন ধরেই। ফ্ল্যাডলাইট থেকে শুরু করে নানা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়েছে উত্তরের আশার প্রদীপ এ স্টেডিয়ামটি।

বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাত্র ৮ মাস সময় নিয়ে ২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম। প্রায় ১৮ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ স্টেডিয়ামের গ্যালারি, প্রেসবক্স, প্যাভিলিয়ন গ্যালারি, ভিআইপি গ্যালারিসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে। রয়েছে চার তারকা হোটেল, পর্যটন মোটেল ও একাধিক মানসম্পন্ন আবাসিক হোটেলসহ ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থাও।

এখানকার সার্বিক পরিস্থিতি বিচারে ২০০৬ সালের ৩০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বগুড়া শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করে। ওই বছরেই দুটি এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও একটি টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এ মাঠেই ২০০৬ সালে তিনটি ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে দলকে হারিয়ে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত পাঁচটি এক দিনের আন্তর্জাতিক খেলার মধ্যে বাংলাদেশ চারটিতে জেতায় করায় দেশের লাকি গ্রাউন্ডে পরিণত হয় এটি।

দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষের বাস উত্তরের দুই বিভাগে। এই দুই বিভাগ ইতিহাস-ঐতিহ্যে, কৃষ্টি-কালচারে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। সেই সঙ্গে এই বিভাগ দুটির জনগণ যথেষ্ট ক্রীড়ামোদী হিসেবেও পরিচিত। তাদের এই পরিচিতির কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটের টি-২০ লিগ বিপিএলে এ অঞ্চলের নামে রয়েছে দুটি দল। একটি রংপুর রাইডার্স অন্যটি রাজশাহী কিংস। ইতোমধ্যে রংপুর রাইডার্স বিপিএলের ৫ম আসরে ঢাকা ডাইনামাইটসকে হারিয়ে শিরোপা জিততেও সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রংপুরের মানুষের খেলাধুলার প্রতি বিশেষ করে ক্রিকেটের প্রতি যে ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ সমর্থন সেটিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এমনকি এবারের বিপিএলের তিন পর্বের একটি পর্বও রাখা হয়নি রাজশাহী কিংবা রংপুর বিভাগের কোনো স্টেডিয়ামে। তিনটি পর্ব যথাক্রমে- ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে রাখা হয়েছে। তাই যারা রংপুর রাইডার্সকে নিজেদের অংশ বলে মনে করেছেন কিংবা রাজশাহী কিংসকে নিজেদের দল বলে মনেপ্রাণে ধারণ করেছেন তারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে খেলা দেখতে বাধ্য হয়েছেন। কিংবা টিভি সেটে বসেই তাদের নিজ বিভাগের খেলা দেখে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

জানা গেছে, এবারের বিপিএলে হোম ভেন্যু আর দর্শকের সুবিধার কথা চিন্তা করে রংপুর বিভাগীয় স্টেডিয়ামকে রংপুর রাইডার্সের হোম ভেন্যু করার পরিকল্পনা করে মালিকপক্ষ বসুন্ধরা গ্রুপ। বর্তমানে স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ১২ হাজার। এটি বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সুবিধাসম্পন্ন স্টেডিয়াম বানানোর পরিকল্পনা করে প্রতিষ্ঠানটি। এ নিয়ে তারা রসিক মেয়র মেয়র মোস্তফার সঙ্গে কথাও বলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অনুমতি। অজ্ঞাত কারণে সেটি আর হয়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিকমানের খেলা দেখার সম্ভাবনা অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়েছে রংপুরবাসীর।

এ প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, বিসিবির কাউন্সিলর ও এফবিসিসিআই পরিচালক মাসুদুর রহমান মিলন বলেন, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়ার ছেলেমেয়েরা খেলাধুলায় অত্যন্ত সাফল্যের নিদর্শন দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ও নারী ক্রিকেট দলের দুজন অপরিহার্য খেলোয়াড় মুশফিকুর রহীম ও খাদিজাতুল কোবরা বগুড়ার সন্তান।

এ ছাড়া বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে বগুড়াসহ এ অঞ্চলের খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স অনেক ভালো। কিন্তু সেই হিসেবে উত্তরবঙ্গে নেই কোনো ভালমানের জেলা স্টেডিয়াম। শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়ে সেটিকে কব্জা করে রাখা হয়েছে। আমাদের দাবি হয় শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে পুনরায় আন্তর্জাতিক ম্যাচ চালু করা হোক। অন্যথায় এটিকে জেলা স্টেডিয়াম হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হোক।

শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার জামিলুর রহমান জামিল বলেন, স্টেডিয়াম সংস্কার ও সেখানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পুনরায় চালু করার কথা বিসিবিকে জানিয়েছি। কিন্তু বিসিবি আমাদের জানিয়েছে আইসিসির নতুন নিয়ম অনুযায়ী নাকি বিমানবন্দর না থাকলে সেখানে আন্তর্জাতিক ভেন্যুর মর্যাদা বাতিল করা হবে। তাই এ স্টেডিয়ামকে বাতিল হিসেবে লিস্টেড করা হয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এখানে ছোট পরিসরে একটি বিমাববন্দর নির্মাণ করা যেত। তিনি বলেন, রাজশাহী ও সৈয়দপুরে তো বিমানবন্দর রয়েছে কিন্তু সেখানেও তো আন্তর্জাতিক ভেন্যু করা হচ্ছে না। আসলে উত্তরবঙ্গের জনগণের প্রতি কারও আগ্রহ নেই, তাই আজকের এই পরিস্থিতি।

উত্তরের মানুষের ফুটবল খেলার প্রতিও যে প্রবল টান রয়েছে তার প্রমাণ পাওয়ায় যায় গত বছর সেপ্টেম্বরে যখন নীলফামারী শেখ কামাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করা হলে। শেখ কামাল স্টেডিয়ামের সাধারণ ও ভিআইপি আসনের সব টিকিট ছাড়ার পরপরই বিক্রি হয়ে যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের প্রিমিয়ার লিগে বসুন্ধরা কিংস তাদের হোম ভেন্যু হিসেবে বেছে নেয় নীলফামারারী শেখ কামাল স্টেডিয়ামকে। প্রিমিয়ার লিগের সবকটি খেলায় কানায় কানায় পূর্ণ দর্শক ফুটবলের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে আশাজাগানিয়া ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিকমানের খেলোয়াড়রা এ মাঠে স্বাভাবিক খেলা চালাতে পারেননি। কারণ হিসেবে তারা মাঠের নাজুক অবস্থাকে দুষছেন। তবুও নীলফামারীবাসী আশায় দিন গুনছেন আবার এখানে বসবে আন্তর্জাতিক কোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট।

রংপুর জেলা প্রশাসক এনামুল হাবিব জানান, রংপুর বিভাগীয় স্টেডিয়াম এবং ক্রিকেট পার্ক যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। আমরা এখানে একটি ভালোমানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম করার জন্য বিসিবির কাছে শিগগিরই দাবি জানাবো।

রাজশাহীর শহীদ কামারুজ্জামান স্টেডিয়ামেরও একই অবস্থা। ঘরোয়া ক্রিকেট লিগের বাইরে সেখানে আয়োজন করা হয় না কোনো আন্তর্জাতিক খেলা। ফলে উত্তরের মানুষ আন্তর্জাতিকমানের যে কোনো খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া- নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁয়ের ক্রীড়ামোদী মানুষ ন্যূনতম জাতীয় লিগের কোনো খেলাও নিজেদের মাঠে বসে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে দেশের অবহেলিত উত্তরবঙ্গ যে আসলেই খেলাধুলা ও বিনোদনের মতো বিষয়গুলোতেও নানাভাবে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তা স্পষ্ট।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box