কড়া নাড়ছে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার মৌসুম

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজধানীবাসীর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক মশা। সারা বছর কমবেশি মশার উপদ্রব থাকলেও বর্ষা মৌসুমে তা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ। কোনো কোনো বছরে এসব রোগের প্রাদুর্ভাব এতই বেড়ে যায় যে সেটা অনেকটা মহামারীর পর্যায়ে পৌঁছে। ২০১৭ সালে ঢাকার কয়েক লাখ বাসিন্দা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হন। আর গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

মশার উপদ্রব ও মশাবাহিত রোগে ব্যাপক হারে আক্রান্তের ঘটনা ফি বছরেই ঘটছে। কিন্তু মশক নিধন ও নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা সে তুলনায় নেই বললেই চলে। শুধু বর্ষাকালে তাও আবার ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব যখন ঘটে তখনই মশা নিধনে তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু সারা বছরই চোখে পড়ে না তৎপরতা। এ বছরও টানা গরমের পর বর্ষা মৌসুম আসন্ন। কড়া নাড়ছে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার মৌসুম। এরই মধ্যে এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবরও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাড়া নেই মশক নিবারণী দফতরের।

মশক নিধনে খোদ সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ‘ঢাকা মশক নিবারণী দফতর’ নামে। রাজধানীতে মশা মারতে এ দফতরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এ তিন প্রতিষ্ঠানই নানা কর্মসূচি হাতে নেয়। ঢাকা মশক নিবারণী দফতরের তথ্য অনুযায়ী দুভাবে মশক নিধনের কথা জানা যায়। সকালবেলা ড্রেনে ওষুধ ছিটিয়ে মশার লার্ভা ধ্বংস ও সন্ধ্যার আগে ফগ মেশিন দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে উড়ন্ত মশা নিধন।

মশা নিধনের এ কার্যক্রম অনেকটা ‘মশা মারতে কামান দাগানোর মতো’ ব্যাপার যেন। এত সাড়ম্বর আয়োজনের পরও মশা থেকে রেহাই পাচ্ছে কি এ নগরীর মানুষ? স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন নাঈম থাকেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ভাড়া বাসায়। কয়েকদিন হলো মশার কামড়ে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

আকরাম হোসেন খোলা কাগজকে বলেন, রাত বাড়লে বাড়তে থাকে মশার উপদ্রব। কয়েলেও তাড়ানো যাচ্ছে না মশা। তিনি বলেন, এ বছর এখন পর্যন্ত মশক নিধনে সিটি করপোরেশন কিংবা ঢাকা মশক নিবারণী দফতরের কোনো তৎপরতা দেখিনি। ধানমন্ডি রায়ের বাজার এলাকার গৃহিণী সেবা রানী দাস। তিনিও জানালেন, ‘দিন নেই, রাত নেই আমার মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। রাত হলে মশার হাত থেকে বাঁচতে আমরা ধূপ জ্বালিয়ে রাখি’।

মশার কামড়ে ঢাকাবাসীর আহাজারি চললেও ঢাকা মশক নিবারণী দফতরের কোনো তৎপরতা নেই। সরেজমিন পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরের উল্টো পাশে প্রতিষ্ঠানটির অফিসে গিয়ে কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। অফিসের দু-একটি কক্ষ খোলা থাকলেও, অধিকাংশ তালা মারা। দোতলা ভবনের আশপাশে অনেক খালি ড্রাম পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব ড্রামে মশা মারার ওষুধ থাকে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী। দফতরের হিসাবরক্ষক জামাল উদ্দিন এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা মারার জন্য যে ওষুধ কিনে, সেগুলো এখানে মওজুদ রাখা হয়। ব্যবহার শেষে ড্রামগুলো এখানে রাখা হয়। তারাই পরে খালি ড্রামগুলো সরিয়ে নেয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মশা নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটির তেমন কোনো কর্মসূচি বা গবেষণা কার্যক্রম নেই। দফতরের কাঠামো অনুসারে ৩৯৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে ২৭৭ জন। বর্তমানে প্রায় ১১৯টি পদ শূন্য রয়েছে। কর্মীদের মধ্যে ক্রু, সুপারভাইজার, কয়েকজন ইনসেক্ট কালেক্টর (আইসি) রয়েছে। তাদের অধিকাংশই দফতরের অধীনে কাজ করেন না, দুই সিটি করপোরেশনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। তবে সিটি করপোরেশনের অধীনে কাজ করলেও কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে এ দফতর।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব অ. ন. ম ফয়জুল হক দফতরের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অফিসে খোঁজ নিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে টেলিফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দফতরের প্রশাসনিক কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা দেওয়া ছাড়া, দফতরের কর্মসূচি সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। ‘দফতরের কাজ নিয়ে বলতে পারবেন দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।’ তবে একাধিকবার কল করেও দুই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, ১৯৪৮ সালে যখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মশক নিবারণী দফতরটি প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এ প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ ছিল সহকারী পরিচালক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন চিকিৎসক এ পদে দায়িত্ব পালন করতেন। পরে ১৯৮০ সালে দফতরটিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া হয়। তবে মশক নিধনের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, মশকের বংশবিস্তার রোধ ও এর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইডিং এবং ফগিং এর নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ, ডেঙ্গু মশার উপদ্রব থেকে নগরবাসীকে রক্ষাকল্পে বাড়িতে-বাড়িতে গিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করাসহ নানা কর্মসূচি চলমান রয়েছে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালযয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাতের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর এ সময় যে পরিমাণ ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল, এ বছর তা এখনো দেখা দেয়নি। তবে পুরোপুরি বর্ষা শুরু হলে মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, মশাবাহিত রোগ থেকে দূরে থাকতে, বাড়িঘর সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যেন পানি না জমে থাকে। কারণ অপরিচ্ছন পরিবেশে জমে থাকা পানিতে এ মশা জন্ম নেয়। মশার আনাগোনা থাকলে, অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। আর মশক নিধনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box