ক্লাসিক জুটি অমিতাভ-রেখা, সম্পর্কের নানা অধ্যায়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

এবারের অক্টোবরে অমিতাভের বয়স হবে ৭৭, আর রেখার ৬৫। তবুও ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সেরা রোমান্টিক জুটি তারা। পর্দায় অমিতাভ-রেখার অসাধারণ রসায়ন তাদের বাস্তবের প্রেমের সম্পর্কের প্রতিফলন ছিল বলেই মনে করা হয়। জন্মদিনও তাদের পাশাপাশি। অমিতাভ বচ্চন জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর আর রেখার জন্মদিন ১৯৫৪ সালের ১০ অক্টোবর।

সত্তরের দশকে একাধিক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিয়ে সফল তারকা জুটি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেন অমিতাভ-রেখা। পর্দার পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও তাঁদের প্রেমের খবর চাউর হলে হইচই পড়ে যায় বলিউডে। বিবাহিত অমিতাভের সঙ্গে রেখার রহস্যময় প্রেমের খবর নিয়ে তোলপাড় ওঠে বলিউডকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে।

দো আনজানে’ (১৯৭৬) দিয়ে তাদের রুপালি পর্দার রসায়ন শুরু, আর ‘সিলসিলা’ (১৯৮২) দিয়ে শেষ। মাঝখানের এই ছয়টি বছর এই জুটি একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন দর্শকদের। এরই মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এই জুটির মধ্যে স্রেফ সহকর্মীসুলভ সম্পর্ক নয়, তারও বেশি কিছু রয়েছে। ফলে তাদের সিনেমা নিয়ে যতটা না আলোচনা হয়েছে তার চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে তাদের প্রেমকাহিনি।

‘দো আনজানে’ সিনেমাটি করার সময় দু’জনের মধ্যে ভিন্ন সম্পর্কের শুরু। যদিও তখন জয়া ভাদুরি অমিতাভের স্ত্রী। জনশ্রুতি রয়েছে, ‘আলাপ’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় রেখার বান্ধবীর একটি বাংলোয় নিয়মিত দেখা হতো দু’জনার। এছাড়া ‘কুলি’ সিনেমার শুটিং চলাকালে মারাত্মক আহত হয়ে অমিতাভ হাসপাতালে ভর্তি হলে রেখা নাকি সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। সারাদিন নাকি সেখানেই বসে ছিলেন। চিকিৎসকদের বলেছিলেন যত রক্ত লাগে আমার শরীর থেকে নিন, অমিতাভকে সুস্থ করে তুলুন। তবে এসব বিষয়ে অমিতাভ বা রেখা দুজনই বরাবরই নীরব থেকেছেন। মিডিয়া বরং বিভিন্ন সময় নিজস্ব প্রণোদনায় তাদের নিয়ে মুখোরোচক গল্প ছেপে বাজার গরম করেছে।

অমিতাভ- রেখার প্রেম কাহিনিতে বিচ্ছেদের সুর বেজে ওঠে নব্বই দশকের গোড়ার দিকে যা সিনেমাপ্রেমী মানুষের কাছে আজও আলোচনার বিষয়। ১৯৮১ সালে মুক্তি পায় যশ চোপড়া পরিচালিত অমিতাভ, রেখা ও জয়া অভিনীত ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সুপারহিট ছবি ‘সিলসিলা’। ত্রিভুজ প্রেমের এ সিনেমায় অমিতাভ-রেখার সম্পর্কের যে রসায়ন দেখা গেছে, তা যে আসলে দুজনের মধ্যেকার গভীর প্রেমেরই বাস্তব প্রতিফলন তা ভক্তদের দৃষ্টি এড়ায়নি। এরপর থেকে আর কোনো সিনেমাতেই একসঙ্গে দেখা যায়নি এই জুটিকে। এমন কী হয়েছিল যে, এই দুই জুটির বিচ্ছেদ ঘটে গেল এক ঝটকায়, তা আজও একরহস্য।

কেবল পেশাগত জীবনেই নয়, ব্যক্তিজীবনেও বিশাল দূরত্ব তৈরি করেছিলেন অমিতাভ-রেখা। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মুখোমুখি হলেও বরাবরই একে অন্যকে এড়িয়ে চলেছেন তাঁরা। অবশেষে ২০১৪ সালে স্ক্রিন পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে অতীতের দ্বন্দ্ব মেটান অমিতাভ-রেখা। দীর্ঘ ৩৩ বছরের শীতল যুদ্ধ আর নীরবতার ইতি টানেন এই ক্লাসিক জুটি। এ অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে রেখার সঙ্গে উষ্ণ কুশলবিনিময় করেন অমিতাভ। রেখার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন অমিতাভের স্ত্রী জয়া বচ্চনও।

বলিউডের ক্লাসিক রোমান্টিক জুটি অমিতাভ-রেখার সেরা পাঁচ ছবিতে চোখ রাখা যাক।

সিলসিলা

অমিতাভ-রেখা অভিনীত ছবির কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়বে ‘সিলসিলা’র নাম। ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটিতে শেষ বারের মতো একসঙ্গে অভিনয় করেন এই জুটি। এতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন, রেখা, জয়া বচ্চন ও সঞ্জীব কুমার। পরকীয়া প্রেমভিত্তিক ছবিটিতে অমিতাভ-রেখার বাস্তব জীবনের ছায়া পড়েছিল বলে রটনা রয়েছে। ছবির কাহিনিতে দেখা যায়, লেখক অমিত (অমিতাভ) ও চাঁদনি (রেখা) পরস্পরকে ভালোবাসে। কিন্তু দুর্ঘটনায় ভাই (শশী কাপুর) শেখরের মৃত্যু হলে ভাইয়ের সন্তানসম্ভবা প্রেমিকা শোভাকে (জয়া বচ্চন) বিয়ে করেন অমিত। শোকাহত চাঁদনি পারিবারিক পছন্দে বিয়ে করেন ডা. আনন্দকে(সঞ্জীব কুমার)। আবার দেখা হয় অমিত ও চাঁদনির, চাপা পড়া প্রেম আবার জেগে ওঠে। তাদের দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। ইয়াশ চোপড়া পরিচালিত এই রোমান্টিক ছবিতে অমিতাভ বেশ কয়েকটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন। ছবির গানগুলো দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। ছবিতে অমিতাভ-রেখার প্রেমের দৃশ্যগুলো ছিল অনবদ্য। বেশ কয়েকটি ঘনিষ্ট দৃশ্যেও দেখা যায় তাদের। কাহিনি, পরিচালনা, সংলাপ ও অভিনয়গুণে ‘সিলসিলা’ বলিউডের ক্ল্যাসিক হিসেবে গণ্য।

দো আনজানে

১৯৭৬ সালে ‘দো আনজানে’ ছবিটি মুক্তির পরই মুম্বাইয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এই জুটির মধ্যে স্রেফ সহকর্মীসুলভ সম্পর্ক নয়, তারও বেশি কিছু রয়েছে। মধ্যবিত্ত স্বামী, উচ্চাভিলাষী স্ত্রী এবং বন্ধুবেশী শত্রুর নাটকীয় কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয় ‘দো আনজানে’। অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন, রেখা, প্রেম চোপড়া এবং উৎপল দত্ত। ছবিটির কাহিনীকার ছিলেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক নীহাররঞ্জন গুপ্ত। দুলাল গুহ পরিচালিত ছবিটির পটভূমি ছিল কলকাতা। বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালকের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত। বাণিজ্যিকভাবে দারুণ সফল হয় ছবিটি। অমিতাভ-রেখা জুটির দুর্দান্ত অভিনয় ছবিটির প্রধান সম্পদ। ‘দো-আনজানে’র সাফল্য এই জুটিকে নিয়ে পরবর্তীতে ছবি নির্মাণে উৎসাহিত করেছিল নির্মাতাদের। আর এই ছবিতে কাজ করার সময়ই বাস্তব জীবনে তাদের রোমান্স শুরু হয় বলে শোনা যায়।

খুন-পাসিনা

অমিতাভ-রেখা জুটি অভিনীত ‘খুন-পাসিনা’ মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালে। এটি ছিল ব্লক-বাস্টার হিট ছবি। রাকেশ কুমার পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন, রেখা, বিনোদ খান্না, নিরুপা রয় ও কাদের খান।

মারদাঙ্গা ছবি হলেও অমিতাভ-রেখার দারুণ কিছু প্রেমের দৃশ্য রয়েছে এ ছবিতে। ‘খুন-পাসিনা’তে তাদের পর্দা রসায়ন এতই জমজমাট ছিল যে সে সময়কার ফিল্মি পত্রিকাগুলো এই জুটির বাস্তব রোমান্স নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে।

পরে সিমি গারেওয়াল উপস্থাপিত এক টক শোতে রেখা স্বীকার করেন যে, সত্তরের দশকে বিভিন্ন ছবিতে জুটি বেঁধে অভিনয়ের সময় তিনি অমিতাভের প্রেমে পড়েন একতরফাভাবে। কারণ সারা ভারত সেসময় অমিতাভের প্রেমে মগ্ন। সহশিল্পী হিসেবে সেই কিংবদন্তিকে কাছ থেকে দেখেও প্রেমে না পড়াটাই বরং অস্বাভাবিক হতো বলে মন্তব্য করেন রেখা। ‘খুন-পাসিনা’তে এই জুটির বাণিজ্যিক সাফল্য তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াকে আরও দৃঢ় করে।

মিস্টার নটবরলাল

কমেডি থ্রিলার ‘মিস্টার নটবরলাল’ ছবিতে অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন, রেখা, অজিত ও আমজাদ খান। ছবির পরিচালক ছিলেন রাকেশ কুমার। এখানে গ্রামের সাধারণ নারী হিসেবে দারুণ অভিনয় করেন রেখা। অমিতাভ-রেখার পর্দা-প্রেম এখানেও চমৎকার। এই সিনেমায় প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেন অমিতাভ যা দর্শকপ্রিয়তা পায় দারুণভাবে। গ্রাম্য প্রেমিকার ভূমিকায় রেখার হাস্যরসাত্মক অভিনয় ছিল দুর্দান্ত। ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছিল। বাস্তবেও এই জুটির রোমান্স তখন ছিল তুঙ্গে। সেসময় বিভিন্ন ফিল্মি পত্রিকার দৌলতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তারা একসঙ্গে ছুটি কাটাতে সুইজারল্যান্ড গেছেন। সেখানে তারা গোপনে বিয়ে করেছেন বলেও গুজব ছড়ায়।

মুকাদ্দার কা সিকান্দার

১৯৭৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’ ছিল সে বছরের সেরা আয়কারী ছবি। সুপার ডুপার হিট এ ছবিতে অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্না, রাখি, রেখা ও আমজাদ খান। ছবির কাহিনী ছিল বেশ জটিল। বলা যায় একটি চতুর্ভুজ প্রেমকাহিনির সঙ্গে মারদাঙ্গার মিশেল। ছবিটিতে দেখা যায় সিকান্দার(অমিতাভ) ভালোবাসে কামনাকে(রাখি)। সিকান্দারকে ভালোবাসে নর্তকি জোহরা (রেখা)। কামনা এবং ভিশাল (বিনোদ খান্না) পরস্পরকে ভালবাসে। বন্ধু ভিশালকে সুখী করার জন্য নিজের প্রেমকে বলিদান দিয়ে দুজনের বিয়ের ব্যবস্থা করে সিকান্দার এবং জোহরার কাছে পেতে চায় আশ্রয়। কিন্তু নর্তকির সঙ্গে সম্পর্ক গড়লে সিকান্দার ও তার পরিবারের সামাজিক সম্মান ক্ষুন্ন হতে পারে এবং সিকান্দারের বোনের বিয়েতে সমস্যা হবে এই আশংকায় তাকে ফিরিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে জোহরা। জোহরার প্রেমপ্রার্থী ও উন্মাদ খুনি দিলাওয়ারের (আমজাদ খান) হাতে মৃত্যু হয় সিকান্দারের। জোহরা ও সিকান্দারের (রেখা-অমিতাভের) বিয়োগান্তক প্রেমের দৃশ্যায়ন ছিল দুর্দান্ত। ছবির গানগুলো দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। ‘সালামে ইশক’ গানের সঙ্গে রেখার নাচ অসামান্য ছিল। প্রকাশ মেহরা পরিচালিত ‘মুকাদ্দার কা সিকান্দার’ অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিয়ারের অন্যতম জনপ্রিয় ছবি। রেখার অভিনয়ও এখানে ছিল অসাধারণ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments