ক্লান্তির ঢাকায় আসছে ফাঁকার শান্তি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আসছে পবিত্র ঈদ উল ফিতর। ব্যস্ত ঢাকায় বেজেছে ছুটির ঘণ্টা। ‘নাড়ীর টানে ফিরবো বাড়ি’ তাই ভিড় জমেছে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন আর লঞ্চঘাটে। আগামী ৪ জুন থেকে সরকারি ছুটির ঘোষণা হলেও শুক্রবার ও শনিবারের বন্ধে আগে থেকেই বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন বেশিরভাগ রাজধানীবাসী।

এদিকে দীর্ঘদিনের কর্মব্যস্ত ঢাকা ফাঁকা হতে শুরু করায় শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ঢাকাবাসী। একমাত্র ঈদ উপলক্ষে প্রিয় ঢাকাকে ফাঁকা পেলেই যেন একধরনের আনন্দ লক্ষ্য করা যায় ঢাকার মানুষদের মধ্যে। এই নিয়ে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে ট্রলও করে থাকেন।

এবার ঈদে টানা ৯ দিনের ছুটি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও পরে এই প্রত্যাশা ভেঙে যায় চাকরিজীবীদের। ঈদের ছুটির আগে-পরে সাপ্তাহিক ছুটি, লাইলাতুল কদরের ছুটির মধ্যে শুধু ৩ জুনই একটি কর্মদিবস। এদিন ছুটি হলে টানা ৯ দিনের ছুটি হতো ঈদে।

তবে ঈদযাত্রা দীর্ঘ করতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই আগামী সোমবার (৩ জুন) ছুটি নিয়েছেন। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। পবিত্র লাইলাতুল কদরের বন্ধ রবিবার। মাঝখানে সোমবার অফিস-আদালত খোলা থাকলেও মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার ঈদের ছুটি। পরের দুই দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। অর্থাৎ সোমবার একদিনের ছুটি নিলে ৯ দিনের দীর্ঘ ছুটি ভোগ করতে পারবেন তারা।

তাই সোমবার (৩ জুন) অফিস-আদালত খোলা থাকলেও ঈদযাত্রা দীর্ঘ করার জন্য ওইদিন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই ছুটি নিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৩০ মে) বিকাল থেকেই বাস-ট্রেন-লঞ্চে ঘরমুখো মানুষের ভিড় ছিল ব্যাপক। অফিস শেষে অসংখ্য মানুষ বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আগেভাগেই বাড়ি রওনা হয়েছেন তারা। তবে রাজধানীর তীব্র যানজট ভোগান্তিতে ফেলে তাদের।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঈদযাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে পৃথক কন্ট্রোল রুম খুলেছে। এসব কন্ট্রোল রুমে সার্বক্ষণিক কর্মকর্তা রাখা হয়েছে।

এছাড়া ঈদের স্পেশাল ট্রেন সার্ভিস শুক্রবার থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে। এসব ট্রেনের ২০ শতাংশ যাত্রী দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট পাবেন।

গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে ভোর থেকেই যাত্রীরা ভিড় করছেন। এখানকার বেশির ভাগ রুটেই টিকিট পাওয়া গেছে। গাড়িও নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়ছে। তবে ঈদে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ করেন যাত্রীরা।

দুপুর ৩টার পর থেকে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর ছিল যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। প্রায় প্রতিটি বাসই নির্ধারিত সময়েরও এক থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে টার্মিনালে আসছে। বাস মালিকরা জানান, তীব্র যানজট থাকায় বাস আসছে দেরিতে। টার্মিনালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে সক্রিয় দেখা গেল। বিআরটিএ’র ভিজিল্যান্স টিমও কাজ করছে।

এছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের অন্যতম মাধ্যম সদরঘাটে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর যাত্রীচাপ ছিল লক্ষণীয়। বিআইডব্লিউটি এর ঢাকা নদী বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, শনি ও রবিবার যাত্রী আরও বাড়তে পারে।

ঈদ উপলক্ষে সড়কে যানজট প্রসঙ্গে শনিবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এবার রাস্তা ভালো, রাস্তার কারণে মহাসড়কে যানজটের কোনো কারণ নেই। বৃষ্টি-বাদল হলে হয়তো কোথাও গাড়ির গতি কিছুটা ধীর হবে, কিন্তু যানজট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা এবার নেই।

ঈদ পর্যন্ত এই স্বস্তিদায়ক যাত্রা অব্যাহত থাকবে এবং ঈদের পরেও মানুষ কর্মস্থলে ফিরে আসবে, কোনো অসুবিধা হবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়কে চাঁদাবাজির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমার কাছে চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ আসেনি। কারও কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এবার রমজান মাস ২৯ দিনে হলে ঈদ হবে ৫ জুন বুধবার আর রমজান ৩০ দিনে শেষ হলে ঈদ হবে ৬ জুন বৃহস্পতিবার। ঈদ যেদিনই হোক এবার ঈদের ছুটি শুরু হবে ৪ জুন।

৫ জুন ঈদ হলে ছুটি থাকবে ৪, ৫ ও ৬ জুন অর্থাৎ মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার। এরপর শুক্র ও শনিবার (৭ ও ৮ জুন) দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগে ২ জুন রবিবার লাইলাতুল কদরের ছুটি। কদরের ছুটির আগে ৩১ মে ও ১ জুন (শুক্র ও শনিবার) দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি। ৩১ মে থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ৯ দিনের মধ্যে শুরু ৩ জুন সোমবার অফিস খোলা।

সারা বছরের যানজট আর ব্যস্ত ঢাকা ফাঁকা হলেই যেন অষ্টম এক আশ্চর্যের রাজ্য মনে হয় ঢাকাকে। এমন পথে চলতে লাগে ভাল দাবি ঢাকার স্থানীয়দের।

স্থানীয়রা বলেন, সারাদেশের মানুষই ঢাকা কেন্দ্রীক। এমন একটি পরিস্থিতিতে ঢাকার রাস্তায় বের হওয়াটাই যেন দিনকে দিন কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতদিন যাচ্ছে ততই যেন বাড়ছে এই ঢাকার জ্যাম। যদি সবসময় ঢাকাটা ঈদের দিনগুলোর মতোই ফাঁকা থাকত?

পুরান ঢাকার এক স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ‘খুব মনে পরে সেই ঢাকাটাকে। আগে বন্ধুবান্ধব মিল্লা আড্ডা দিসি, ঘুইড়া বেরাইসি। কই আমাগো সময় ঢাকা এমন আসিলো না। ওই ঢাকা অহন আর দেহাও যায় না। এত্ত মানুষ ঢেলি ঢেলি ঢাকায় আইলে তো হইবোই এমন।’

তিনি আরও বলেন, মানুষ ঢাকায় না আয়াই বা করব কি? কামাই করতে হইলে তো ঢাকাতেই আইতে হইব। পুরান ঢাকার স্থানীয় এক তরুণ বাসিন্দা বলেন, মনডা চায় ঈদের সময় যহন ঢাকা থেইক্কা মানুষ গুলা যায়গা, সবটিরে ঢাকায় আহা বন্ধ কইরা দেই। কিছু কিছু মানুষের লোভ বেশি। জমি জমা থেইক্কাই ভালা কামাই করতে পারে। তারপরও ওগুলি লোভে পইরা আইবো। কামাই থাকুক না থাকুক ঢাকাতেই পইরা থাকব। অশান্তি সৃষ্টি করব!

ঢাকার আরেক তরুণ বাসিন্দা বলেন, ‘ঈদের মতো ফাঁকা ঢাকা সব সময় চাই। আর ভাল লাগে না যানজটের ঢাকাকে। সারা বছরের যানজট আর ব্যস্ত ঢাকায় দিনকে দিন যেই পরিস্থিতি হচ্ছে, তার থেকে ঈদের ছুটিতে যখন ঢাকা ফাঁকা হয়, মনে হয় এটাই আসল ঢাকা। শহরটার আসল সৌন্দর্য একমাত্র ঈদের ছুটিতেই ভালভাবে উপভোগ করা যায়।’

ঢাকার ব্যস্ততা শেষে যখন রাজধানীটা ফাঁকা হয় ঠিক তখন ট্রাফিক পুলিশরা কিন্তু ব্যস্তই থাকেন। ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তার ভারটাও যে শুধুই তাদের উপর। তাই তো ছুটির দিনগুলোতেও ব্যস্ততায় কাটান ঢাকার এই নিরাপত্তাকর্মীরা। দায়িত্বে থাকা এক ট্রাফিক পুলিশ বলেন, সারা বছর খুব ক্লান্তি লাগে। এতটা ব্যস্ততা আর জ্যাম যে এক মূহুর্তও অবসর পাই না। কিন্তু ফাঁকা ঢাকায় কাজ করতে কিছুটা হলেও শান্তি আছে। মানুষ না থাকলে যানবহনের সংখ্যাও কমে যায়। কাজের চাপটাও কমে।

আরেক ট্রাফিক পুলিশ ইউসুফ হোসেন বলেন, ‘খুব মিস করি! বাড়ি গিয়ে পরিবারের সাথে ঈদ পালন করি না প্রায় ২২ বছর হয়ে গেল। প্রতি বছরই ভাবি যাব। কিন্তু সেই যাওয়া আর হয়ে উঠে না। এবারও হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘চাকরির প্রথম দিকে খুব খারাপ লাগত। কিন্তু এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। রাষ্ট্রের দায়িত্বে নিয়োজিত আছি, এটা ভাবলেই সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।’

এদিকে রাজধানীর ব্যস্ত সিগন্যাল গুলো যেন ধীরে ধীরে খালি হতে শুরু করেছে। কমতে শুরু করেছে যানবাহনের সংখ্যা। যেসব সিগন্যাল গুলোতে স্বাভাবিক দিনে যানবাহনের ভিড় লেগে থাকে, সেসব সিগন্যাল গুলো এখন কিছুটা ফাঁকা মনে হচ্ছে।

ফাঁকা ঢাকায় রিকশায় ঘুরতেও যেন অনেকেই ভালোবাসেন। এই বিষয়ে এক স্থানীয় বলেন, যখনই ঢাকা ফাঁকা হয়, ঘুরতে বের হয়ে পরি। এমন ঢাকা সারা বছরেও যে খুঁজে পাই না। এবারের ঈদেও বের হব। বছরে দুইটা ঈদে ঢাকা ফাঁকা পাই, আর এই দুই ঈদে আমি রিকশায় ঘুরি। কখনও একাই ঘুরি, আবার মাঝে মাঝে আমার ভালোবাসার সহধর্মিনীকে নিয়েও বের হই। দুজন মিলে রিকশায় ঘুরতে ভালই লাগে।

এরই মধ্যে নারীর টানে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড় জমেছে রাজধানীর লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল ও রেল স্টেশনে।

শুক্রবার ভোর থেকেই কমলাপুর রেলস্টেশনে ভিড় করেছেন ঘরমুখো যাত্রীরা। ৩১ মে ট্রেনের অগ্রিম টিকিট যারা সংগ্রহ করেছেন তারা এরই মধ্যে ঢাকা ছেড়েছেন। আজ যাবেন ১ জুন টিকিট ক্রয়ের যাত্রীরা।

শুক্রবার স্টেশনে আসা অনেক যাত্রীরা বলেছেন, অফিস ছুটি না হওয়ায় পরিবারের সদস্যদের আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। ভিড়ের ভয়েই তাদের আগে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া প্রথম দিনেই শিডিউল বিপর্যয়ে পড়ে রেলওয়ে। শিডিউলের এ বিপর্যয়ের জন্য যাত্রীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন রেলমন্ত্রী নুরুন ইসলাম সুজন। শুক্রবার (৩১ মে) সকাল ১০টায় কমলাপুর রেলস্টেশনে ঈদ উপলক্ষে রেলওয়ের সার্বিক কার্যক্রম পরিদর্শন করতে এসে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন।

রেলমন্ত্রী বলেন, ঈদ উপলক্ষে শুক্রবার ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত কমলাপুর থেকে ১৮টি ট্রেন ছেড়ে গেছে। তন্মধ্যে ১৪টি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে গেছে। সুন্দরবন, ধূমকেতু ও রংপুর এক্সপ্রেসসহ উত্তরবঙ্গগামী চারটি ট্রেন ছাড়তে দেরি হচ্ছে। রংপুর এক্সপ্রেস সাত ঘণ্টা দেরিতে ছাড়বে। এজন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করছি।

নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, বাংলাদেশে পরিবহনের সক্ষমতার চেয়ে যাত্রী বেশি। অতিরিক্ত সক্ষমতা ব্যবহার করে যাত্রীদের সেবা দিচ্ছে রেলওয়ে। সার্বিকভাবে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ঈদের পাঁচদিন যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।

দুর্ঘটনা এড়াতে স্টেশনে কোনো মই থাকবে না জানিয়ে রেলমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি ছাদে যায়, তাহলে নিজ দায়িত্বে ঝুঁকি নিয়ে যাবে। এতে কোনো অঘটন ঘটলে রেল মন্ত্রণালয় দায় নেবে না। তিনি ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে বাস টার্মিনালগুলোতেও যাত্রীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ঘরমুখো যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাড়ি ফিরছি। পরিবারের সবার সাথে ঈদ করব। ঈদের আনন্দটা বাবা-মা কে নিয়ে একসাথে সব সময় করে আসছি। ছেলে-মেয়েরাও দাদা-দাদির সাথে ঈদ করতে আনন্দবোধ করে। তাই শতকষ্ট হলেও বাড়িতে গিয়েই সবার সাথে ঈদ করি। অন্যদিকে লঞ্চঘাটেও বাড়ছে ঘরমুখো যাত্রীদের ভিড়। যাত্রীরা অনেকেই বলছেন, দুর্ঘটনা এড়াতে এবার আগে আগেই বাড়ি ফিরছি।

এদিকে কর্মমুখী মানুষের ছুটি না হলেও ছুটির ঘণ্টা বেজেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো ইতোমধ্যেই ফাঁকা হতে শুরু করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, পড়াশুনা করতে বাবা-মা পরিবারকে ছেড়ে ঢাকায় থাকি। খুব কষ্ট তো হয়! এখন বাড়ি যাচ্ছি। খুব ভাল লাগছে। বাবা-মা এর সাথে একসাথে ঈদ করব।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box